শেষের কথাগুলি বলার সময় বলাশেভের বিমূঢ়ভাবে নেপোলিয়নের নজর এড়াল না : তার মুখটা বেঁকে গেল, আর বাঁ পায়ের গুলিটা তালে তালে কাঁপতে লাগল। যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে না সরে সে আরো জোর গলায় আরো দ্রুত কথা বলতে লাগল। কথার ফাঁকে ফাঁকে বলাশেভ চোখ নামিয়ে দেখতে পেল, নেপোলিয়নের গলা যত নড়ছে তার বাঁ পাটা তত বেশি কাঁপছে।
সে বলতে লাগল, শান্তি প্রতিষ্ঠার বাসনা সম্রাট আলেক্সান্দারের চাইতে আমার কম নয়। শান্তির জন্য গত আঠারো মাস ধরে আমি কি সবকিছু করিনি? কৈফিয়তের জন্য আমি আঠারো মাস অপেক্ষা করেছি। কিন্তু আলোচনা শুরু করার জন্য আমার কাছে কি দাবি করা হল?
বলাশেভ জবাব দিল, আপনার বাহিনীকে নিয়েমেনের ওপারে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে মহাশয়।
নিয়েমেন? নেপোলিয়ন কথাটার পুনরাবৃত্তি করল। তাহলে এখন আপনারা চাইছেন আমাকে নিয়েমেন থেকে সরে আসতে হবে–শুধু নিয়েমেন? বলাশেভের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে নেপোলিয়ন কথাটা আরো একবার বলল।
বলাশেভ সসম্মানে মাথা নোয়াল।
চার মাস আগেকার পোমেরানিয়া থেকে সরে আসার দাবির পরিবর্তে এখন দাবি করা হচ্ছে শুধুমাত্র নিয়েমেন থেকে সৈন্য প্রত্যাহার। নেপোলিয়ন দ্রুত মুখ ফিরিয়ে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল।
আপনি বলছেন, আলোচনা শুরু করার আগে আমাকে নিয়েমেন ছেড়ে আসতে হবে-এটাই আপনাদের দাবি, কিন্তু দুমাস আগে ঠিক এইভাবেই দাবি করা হয়েছিল যে আমাকে ভিক্ষুলা ও ওডার থেকে সরে আসতে হবে, তথাপি আপনারা আলোচনা চালাতে ইচ্ছুক।
নেপোলিয়ন নিঃশব্দে ঘরে এককোণ থেকে অপর কোণে চলে গেল, আবার এসে বলাশেভের সামনে থামল। বলাশেভ লক্ষ্য করল, তার বা পাটা আগের চাইতেও দ্রুততর গতিতে কাঁপছে, তার মুখটা পাথরের মতো কঠিন হয়ে উঠেছে। এইভাবে বাঁ পা কাঁপার ব্যাপারটা নেপোলিয়নও জানত। পরবর্তীকালে সে নিজেই বলেছে, বা পায়ের গুলি কাঁপাটা আমার একটা বড় লক্ষণ।
ভিশ্চলা এবং ওডার থেকে পশ্চাদপসরণের দাবি বাদেনের প্রিন্সের কাছে করা চলতে পারে, আমার কাছে নয়! প্রায় আর্তনাদ করার মতো এমনভাবে নেপোলিয়ন কথাগুলি বলল যে সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। আপনারা আমাকে পিটার্সবুর্গ এবং মস্কো দিয়ে দিলেও এমন শর্ত আমি মানতে পারতাম না। আপনারা বলছেন, এ যুদ্ধ আমি শুরু করেছি। কিন্তু কে প্রথম সৈন্যদলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। সম্রাট আলেক্সান্দার, আমি নই! আর আমি যখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছি, যখন ইংলন্ডের সঙ্গে আপনারা বন্ধুত্ব করেছেন, যখন আপনাদের অবস্থা খুব খারাপ, তখন আপনারা আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। আলোচনার প্রস্তাব! ইংলন্ডের সঙ্গে আপনাদের মৈত্রীর উদ্দেশ্য কি? ইংলন্ড আপনাদের কি দিয়েছে? নেপোলিয়ন দ্রুতবেগে কথা বলে চলল। স্পষ্টতই সন্ধির সুবিধা এবং তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবার কোনো চেষ্টাই সে করছে না, সে শুধু চাইছে নিজের নির্দোষিতা ও শক্তি এবং আলেক্সান্দারের ভ্রান্তি ও চাতুরি প্রমাণ করতে।
গোড়ার দিকে তার কথার মধ্যে নিজের সুবিধাজনক অবস্থা প্রমাণ করা এবং তৎসত্ত্বেও সন্ধির আলোচনার ইচ্ছাই প্রকাশ পেয়েছিল, কিন্তু একবার কথা বলতে শুরু করে সে যত বেশি কথা বলছে ততই কথার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।
এখন তার বক্তব্যের একমাত্র মর্মার্থ নিজেকে বড় করা এবং আলেক্সান্দারকে অপমান করা–অথচ সাক্ষাৎকারের শুরুতে এ ইচ্ছা তার মোটেই ছিল না।
শুনেছি আপনারা তুরস্কের সঙ্গে সন্ধি করেছেন?
বলাশেভ সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল।
বলতে শুরু করল, সন্ধি হয়েছে…
কিন্তু নেপোলিয়ন তাকে কথা বলতে দিল না। সব কথা সে নিজেই বলতে চাইছে। এমন একধরনের উচ্ছ্বাস ও অনিয়ন্ত্রিত আঘাত দিয়ে সে কথা বলতে লাগল যা উচ্ছন্নে যাওয়া মানুষকেই সাজে।
হ্যাঁ, আমি জানি মলদাভিয়া ও ওয়ালাচিয়া না পেয়েই আপনারা সন্ধি করেছেন, যেমন ফিনল্যান্ড দিয়েছি, তেমনই ও দুটো প্রদেশও আপনার সম্রাটকে আমি দিয়ে দিতাম! হ্যাঁ, আমি কথা দিয়েছিলাম, এবং মলদাভিয়া ও ওয়ালাচিয়া সম্রাট আলেক্সান্দারকে অবশ্যই দিতাম। কিন্তু এখন অমন দুটি ভালো প্রদেশ তিনি পেলেন না। অথচ ওই দুটি প্রদেশকে তাঁর সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে মাত্র একটি শাসনকালেই রাশিয়ার সীমাকে বোথনিয়া উপসাগর থেকে দানিয়ুবের মোহনা পর্যন্ত প্রসারিত করতে পারতেন। মহীয়সী ক্যাথারিনও এর চাইতে বেশি কিছু করতে পারতেন না। কথা বলতে বলতে ক্রমেই অধিকতর উত্তেজিত হয়ে নেপোলিয়ন ঘরময় পায়চারি করতে করতে সেই কথাগুলিই বলাশেভকে শোনাতে লাগল যা সে তিলজিত-এ সম্রাট আলেক্সান্দারবে শুনিয়েছিল। আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে এসবই তার হত! আঃ, সে কী চমৎকার রাজত্ব! কথাটা বারকয়েব উচ্চারণ করে একটু পকেট থেকে সোনার নস্যিদানি বের করল, এবং সেটাকে নাকের কাছে তুলে ধরে সজোরে শ্বাস টানল।
সম্রাট আলেক্সান্দারের রাজত্বকাল কী চমৎকারই না হতে পারত।
করুণার দৃষ্টিতে সে বলাশেভের দিকে তাকাল, কিন্তু যেমনই বলাশেভ কিছু বলতে চেষ্টা করল সঙ্গে সঙ্গেই সে তাকে আবার থামিয়ে দিল।
বিচলিতভাবে দুই কাঁধ ঝাঁপিয়ে প্রশ্ন করল, এমন কি তিনি চাইতে পারতেন যা আমার বন্ধুত্বের সূত্রে পেতে পারতেন না? কিন্তু না, আমার শত্রুদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে থাকাটাই তিনি পছন্দ করলেন। তারা কারা? স্তিন, আর্মফে, বেনিংসেন ও উইজিন-জেবোদদের দল! স্তিন তো নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত একটা বিশ্বাসঘাতক, আর্মফেল্ট, একটা লম্পট ও ষড়যন্ত্রকারী, উইজিন জেরোদ তো পলাতক ফরাসি প্রজা, বেনিংসেন তবু খানিকটা সৈনিকের মতো মানুষ, কিন্তু তাহলেও কোনো কাজের নয়, ১৮০৭ সালে সে তো কিছুই করতে পারে নি, আবার তাকে দেখে তো সম্রাট আলেক্সান্দারের মনে ভয়ঙ্কর স্মৃতি জেগে ওঠা উচিত।…যদি ধরেইনি যে তারা উপযুক্ত লোক, তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে,কিন্তু না, মোটেই তারা তা নয়! যুদ্ধ বা শান্তি কোনোটারই উপযুক্ত তারা নয়! বার্কলে তাদের মধ্যে সবচাইতে সক্ষম লোক একথা বলা হয়, কিন্তু তার প্রাথমিক গতিবিধি দেখে আমি সেকথা বলতে পারি না। আর এরা, এইসব সভাসদরাই বা কি করছে? ফুয়েল এক কথা বলে তো আর্মফেল্ট বলে আর, বেনিংসেন শুধু ভাবে, আর বার্কলেকে কোন কাজ করতে বললে সে যে কি করবে তাই স্থির করতে পারে না, ফলে সময় চলে যায়, ফল কিছুই হয় না। একমাত্র ব্যাগ্রেশনই সামরিক লোক। সে বোকা, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা আছে, দ্রুত দেখার ক্ষমতা আছে, স্থিরসঙ্কল্প আছে…আর এই ভূতদের ভিড়ে আপনাদের তরুণ সম্রাট কোন ভূমিকায় অভিনয় করছেন তারা তো তাকেই অসুবিধায় ফেলেছে, যা কিছু ঘটছে তার সব দায়িত্ব তার কাঁধেই চাপিয়ে দিচ্ছে। সেনাপতি না হয়ে রাজার কখনো সেনাদলের সঙ্গে থাকা উচিত নয়! যেন সম্রাটকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই নেপোলিয়ন কথাগুলি উচ্চারণ করল। রণক্ষেত্রে সেনাপতি হবার বাসনা যে আলেক্সান্দারের খুবই ছিল সেটা সে জানত।
