প্রিন্স যে অসন্তোষের চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে সেটা যেন দেখতেই পায় নি এমন ভাব দেখিয়ে প্রিন্সেস বলল, আহা প্রিন্স, কি দুঃখের মধ্যে আবার আমাদের দেখা হল। আমার প্রিয় রোগী কেমন আছেন?
প্রিন্স ভাসিলি বিব্রত হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মহিলা ও বরিসকে দেখতে লাগল। বরিস বিনীতভাবে অভিবাদন করল। প্রত্যাভিবাদন না জানিয়েই প্রিন্স ভাসিলি আন্না মিখায়লভনার দিকে ঘুরে মাথা ও ঠোঁটের ভঙ্গিতেই জানিয়ে দিল যে রোগীর আশা খুব কম।
আন্না মিখায়লভনা বলে উঠল, এও কি সম্ভব? আহা, কী দুঃখের কথা! ভাবতেও ভয় হয়…এই আমার ছেলে। ও নিজেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছে।
বরিস আর একবার সবিনয়ে অভিবাদন করল।
বিশ্বাস করুন প্রিন্স, আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন একটি মায়ের হৃদয় তা কোনোদিন ভুলবে না।
লেসের চুনট ঠিক করতে করতে প্রিন্স ভাসিলি বলল, প্রিয় আন্না মিখায়লভনা, আপনার একটা কাজ করে দিতে পেরে আমি খুশি হয়েছি। তারপর শক্ত গলায় বরিসকে বলল, ভালোভাবে কাজ করতে চেষ্টা করবে, নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবে।…আমি খুশি হয়েছি…তুমি কি ছুটিতে এসেছ? তার গলায়, নির্বিকার ঔদাসিন্য।
আমি এখন নতুন রেজিমেন্টে যোগ দেবার নির্দেশের অপেক্ষায় আমি ইয়োর এক্সেলেন্সি, বরিস জবাব দিল; তার কথায় বিরক্তিও প্রকাশ পেল না, আবার আলোচনা শুরু করবার আগ্রহও দেখা গেল না; কিন্তু এত শান্ত ও সশ্রদ্ধভাবে সে কথা বলল যে প্রিন্স তাকে বেশ ভালো করে দেখতে লাগল।
তুমি কি মায়ের কাছেই থাক?
পুনরায় ইয়োর এক্সেলেন্সি কথাটা যোগ করে বরিস জবাব দিল, আমি কাউন্টেস রস্তভের বাড়িতে আছি।
মানে, ইলিয়া রস্তভের বাড়িতে, যিনি নাতালি শিনশিনাকে বিয়ে করেছেন?
একই একঘেয়ে গলায় প্রিন্স ভাসিলি বলল, আমি জানি, আমি জানি। নাতালি যে কী করে সেই আস্ত ভালুকটাকে বিয়ে করতে মনস্থ করল তা তো আমি বুঝতে পারলাম না! শুনেছি সে একটা অদ্ভুত বোকা লোক, আবার জুয়াড়িও বটে।
কিন্তু বড় দয়ালু মানুষ প্রিন্স, বিষণ্ণ হাসি হেসে আন্না মিখায়লভনা বলল, যেন সেও জানে যে এ নিন্দা কাউন্ট রস্তভের প্রাপ্য, তবু কেউ যেন বেচারি বুড়ো লোকটার প্রতি অতিরিক্ত কঠোর না হয়। একটু থেমে মুখে আবার দুঃখের ভাব এনে সে বলল, ডাক্তাররা কি বলছে?
তারা বিশেষ কোনো আশাই দিচ্ছে না, প্রিন্স জবাব দিল।
তাইতো আমার ও বরিসের প্রতি যে দয়া তিনি করেছেন সেজন্য চাচাকে ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছিলাম। বরিস তো তাঁরই ধর্মছেলে।
প্রিন্স ভাসিলি চিন্তিতভাবে ভুরু কুঁচকালো। আন্না মিখায়লভনা বুঝতে পারল তাকে কাউন্ট বেজুখভের সম্পত্তির একজন দাবিদার ভেবে প্রিন্স ভয় পেয়ে গেছে; তাই তাকে সান্তনা দেবার জন্য তাড়াতাড়ি বলে উঠল, চাচার প্রতি ভক্তি ও অনুরাগবশতই আমি এসেছি; তাঁর চরিত্র তো আমার জানা : মহৎ, ন্যায়নিষ্ঠ…কিন্তু আপনি তো জানেন একমাত্র প্রিন্সেসরা ছাড়া তাঁর কাছে আর কেউ থাকে না…তারা তো এখনো ছোট… মাথাটা নিচু করে সে অনুচ্চ কণ্ঠে বলতে লাগল, তিনি কি শেষ কাজগুলো করেছেন প্রিন্স? সেই শেষ মুহূর্তগুলি কত না অমূল্য! তাতে খারাপ কিছু হবে না, তাই তিনি যখন এতই অসুস্থ তখন তাকে প্রস্তুত করে রাখা তো একান্তই দরকার। দেখুন প্রিন্স, এই কথাগুলি কীভাবে বলতে হয় তা আমরা মেয়েরাই জানি। আমার পক্ষে যত কষ্টকরই হোক তবু তাঁর সঙ্গে আমাকে দেখা করতেই হবে। কষ্ট সইতে আমি অভ্যস্ত।
স্পষ্টতই প্রিন্স তাকে বুঝতে পেরেছে; আর আন্না পাভলভনার বাড়ির মতোই এখানেও বুঝতে পেরেছে যে আন্না মিখায়লভনাকে এড়িয়ে যাওয়া শক্ত।
সে বলল, তাঁর সঙ্গে দেখা করাটা কি তার পক্ষে খুব বেশি কষ্টকর হবে না? বরং সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাক। ডাক্তাররা একটা সংকটের আশংকা করছে।
কিন্তু প্রিন্স, এ রকম অবস্থায় তো অপেক্ষা করা চলে না। ভেবে দেখুন, তার আত্মার কল্যাণ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। আহা, সেটা বড়ই দুঃখের কথা : একজন খৃস্টানের অবশ্য করণীয়…।
ভিতরকার একটা ঘরের দরজা খুলে কাউন্টের ভাইঝি ঘরে ঢুকল; তার মুখটা কঠিন দেখাচ্ছে। তার খাটো পায়ের তুলনায় শরীরটা অস্বাভাবিক রকমের লম্বা। প্রিন্স ভাসিলি তার দিকে ফিরল।
এই যে, তিনি কেমন আছেন?
একই রকম; কিন্তু এইসব গোলমালের মধ্যে কি করে আশা করেন… আন্না মিখায়লভনার দিকে তাকিয়ে প্রিন্সেস বলল।
কাউন্টের ভাইঝির দিকে একটু এগিয়ে খুশির হাসি হেসে আন্না মিখায়লভনা বলল, আহা! আমি তো তোমাকে ঠিক চিনি না। আমি এসে পড়েছি, আমার চাচার সেবার ব্যাপারে তোমাকে সাহায্য করতে আমি সর্বদাই প্রস্তুত। তোমরা যে কী অবস্থার ভিতর দিয়ে চলেছ সেটা আমি বুঝি।
প্রিন্সেস কোনো জবাব দিল না, একটু হাসল না পর্যন্ত; তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে চলে গেল। আন্না মিখায়লভনা হাতের দস্তানা খুলল, বিজিত মর্যাদাকে দখল নেবার জন্য একটা হাতল-চেয়ারে বসে প্রিন্স ভাসিলিকে পাশের আসনে বসেত বলল।
হেসে ছেলেকে বলল, বরিস, আমার চাচা কাউন্টকে দেখতে আমি ভিতরে যাচ্ছি; ইতিমধ্যে তুমি গিয়ে পিয়েরের সঙ্গে দেখা কর; তাকে রস্তভদের আমন্ত্রণটা জানাতে ভুলো না যেন। তারা তাকে ডিনারে ডেকেছেন। প্রিন্সের দিকে ঘুরে বলল, মনে হচ্ছে, পিয়ের আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে না, কি বলেন?
