.
অধ্যায়-৬
রাজকীয় জাকজমকে অভ্যস্ত হলেও নেপোলিয়নের রাজদরবারের বিলাসবাহুল্য ও আড়ম্বর দেখে বলাশেভ অবাক হয়ে গেল।
কেঁৎ দ্য তুরেন তাকে বড় অভ্যর্থনা-কক্ষে নিয়ে বসাল। সেখানে অনেক সেনাপতি, অভ্যর্থনাকারী ও পোল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় লোকজন তাদের কয়েকজনকে বলাশে রুশ ম্রাটের দরবারেও দেখেছে–আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। দুরক জানাল, অশ্বারোহণে যাবার আগেই নেপোলিয়ন রুশ সেনাপতিকে অভ্যর্থনা জানাবে।
কয়েক মিনিট পরে একজন অভ্যর্থনাকারী এসে বিনীতভাবে অভিবাদন করে বলাশেভকে বলল তাকে অনুসরণ করতে।
বলাশেভ ছোট অভ্যর্থনা-ঘরে গেল, সে ঘরের একটা দরজা দিয়ে সেই পড়ার ঘরটাতে যাওয়া যায় যেখান থেকে রুশ সম্রাট তাকে এই দৌত্যকর্মে পাঠিয়েছিল। দুএক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেই কেটে গেল। দরজার ওপারে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল, দরজার দুটো পাল্লাই খুলে দেওয়া হল, সব চুপচাপ, তারপরেই শোনা গেল সদর্প দৃঢ় পদক্ষেপ নেপোলিয়ন আসছে।
সবেমাত্র অশ্বারোহণের সাজসজ্জা শেষ হয়েছে, নীল রঙের ইউনিফর্মের বুকটা ভোলা, তার নিচেকার সাদা ওয়েস্টকোটটা এত লম্বা যে বর্তুলাকার পেটটি তাতে ঢাকা পড়েছে, সাদা চামড়ার ব্রিচেস বেঁটে পায়ের মোটা উরুর উপর চেপে বসেছে, পায়ে হেসিয়ান বুট। ছোট ছোট চুল সবে বুরুশ করা হয়েছে, কিন্তু চওড়া কপালের মাঝখানে একগুচ্ছ চুল ঝুলে আছে। ইউনিফর্মের কালো কলারের উপর দিয়ে মোটা সাদা গলাটা ঠেলে উঠেছে, গায়ে ইউ-ডি-কলোনের গন্ধ। উঁচু চিবুকসহ যৌবন-সুলভ মুখে রাজকীয় অভ্যর্থনার অনুকম্পামিশ্রিত গাম্ভীর্যের প্রকাশ।
প্রতিটি পদক্ষেপে শরীরটাকে ঈষৎ দুলিয়ে মাথাটাকে সামান্য পিছনে ঠেলে দিয়ে দ্রুতপায়ে সে ঘরে ঢুকল। বেঁটে, মোটা শরীর, চওড়া কাঁধ, বুক ও পেট সামনে প্রসারিত, সবকিছু মিলিয়ে আরামে থাকা চল্লিশ বছরের মানুষের চিত্তাকর্ষক, মহিমান্বিত চেহারা। আরো বোঝা গেল, আজ তার মেজাজ খুব ভালো আছে।
বলাশেভের আনত সশ্রদ্ধ অভিবাদনের উত্তরে নেপোলিয়ন মাথাটা নেড়ে তার কাছে এসেই এমনভাবে কথা বলতে শুরু করল যাতে বোঝা যায় যে তার প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান, আর নিজের বক্তব্যকে গুছিয়ে বলার কোনো প্রয়োজন তার হয় না, কারণ সে জানে যে সঠিক কথাটাই সে বলবে, আর সেটা বেশ ভালোভাবেই বলবে।
সে বলল, শুভদিন সেনাপতি। সম্রাট আলেক্সান্দারের কাছ থেকে যে চিঠি আপনি এনেছেন সেটা আমি পেয়েছি, আর আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ায় খুব খুশি হয়েছি। বড় বড় চোখ মেলে বলাশেভের মুখের দিকে একবার তাকিয়েই তার দৃষ্টি তাকে ছাড়িয়ে দূরে চলে গেল।
পরিষ্কার বোঝা গেল, বলাশেভের ব্যক্তিত্বের প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই, তার একমাত্র আগ্রহ নিজের মনকে নিয়ে। নিজের বাইরের কোনোকিছুরই কোনো অর্থ তার কাছে নেই, কারণ তার মতে পৃথিবীর সবকিছুই সম্পূর্ণভাবে তার ইচ্ছার উপরেই নির্ভর করে।
সে বলতে লাগল, আমি যুদ্ধ চাই না, কখনো চাইনি, কিন্তু যুদ্ধ আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন কি এখনো (শব্দটার উপর বিশেষ জোর দিয়ে) আপনার যেকোন কৈফিয়ৎ মেনে নিতে আমি প্রস্তুত।
তারপরেই রুশ সরকারের প্রতি তার অসন্তুষ্টির কারণ গুলি সংক্ষেপে ও বিষদভাবে বুঝিয়ে বলতে লাগল। যেরকম শান্ত গলায় মৈত্রীসূচক সুরে ফরাসি সম্রাট কথাগুলি বলল তাতে বলাশেভের দৃঢ় ধারণা হল যে সে শান্তি চায়, এবং আলোচনায় বসতে রাজি আছে।
কথা শেষ করে নেপোলিয়ন যখন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রুশ দূতের দিকে তাকাল তখন বলাশেভ অনেক আগে থেকে তৈরি করা ভাষণটি বলতে শুরু করল : মহাশয়, আমার মনিব সম্রাট… কিন্তু তার উপর ঝুঁকে-পড়া সম্রাটের চোখের দিকে তাকিয়েই সব কেমন গোলমাল হয়ে গেল। বলাশেভের ইউনিফর্ম ও তরবারির দিকে তাকিয়ে প্রায় অদৃশ্য হাসি হেসে সে যেন বলছে : আপনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন–শান্ত হোন!
বলাশেভের সম্বিত ফিরে এল, সে আবার বলতে শুরু করল। কুরাকিনের পাসপোর্টের দাবিকে সম্রাট আলেক্সান্দার যুদ্ধের যথেষ্ট কারণ বলে মনে করে না, সম্রাটের সম্মতি ছাড়াই কুরাকিন নিজের থেকেই কাজটা করেছে, সম্রাট আলেক্সান্দার যুদ্ধ চায় না, আর ইংলন্ডের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
এখন পর্যন্ত নেই! নেপোলিয়ন বাধা দিয়ে বলল, কিন্তু পাছে তার রাগ ধরা পড়ে তাই ভুরু কুঁচকে মাথাটা ঈষৎ নেড়ে ইঙ্গিতে বলাশেভকে তার কথা চালিয়ে যেতে বলল।
তাকে যা বলবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সেসব কথা শেষ করে বলাশেভ আরো জানাল, সম্রাট আলেক্সান্দার শান্তি চায়, কিন্তু কোনোরকম আলোচনায় বসবার আগে তার একটি শর্ত আছে…এখানে বলাশেভ ইতস্তত করল : সেই কথাগুলি তার মনে পড়ে গেল যেগুলি সম্রাট আলেক্সান্দার তার এই চিঠিতে লেখেনি, কিন্তু সলকিতভকে পাঠানো অনুলিপিত অন্তর্ভুক্ত করেছে, এবং বলাশেভকে বলে দিয়েছে নেপোলিয়নের সামনে সেগুলির পুনরাবৃত্তি করতে। কথাগুলি বলাশেভের মনে আছে : যতদিন পর্যন্ত একটিও সশস্ত্র শত্রু রাশিয়ার মাটিতে থাকবে, কিন্তু কিছু জটিল মনোভাব তাকে বাধা দিল। ইচ্ছা থাকলেও সে কথাগুলি সে বলতে পারল না। ক্রমেই বিচলিত হয়ে বলল : শর্তটি এই যে ফরাসি বাহিনী নিয়েমেনের ওপারে সরে যাবে।
