.
অধ্যায়-৫
আলেক্সান্দারের যেমন আরাকচিত, নেপোলিয়নের তেমনই দাভুৎ-আরাকচিত-এর মতো ভীরু না হলেও তারই মতো সঠিক, তারই মতো নিষ্ঠুর, এবং তারই মতো নিষ্ঠুরতা ছাড়া সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অন্য কোনো ভাষা জানে না।
প্রকৃতির জীব-রাজ্যে যেমন নেকড়ের প্রয়োজন আছে, তেমনই রাষ্ট্র-দেহেও এ ধরনের লোকের প্রয়োজন আছে, তাদের উপস্থিতি ও ঘনিষ্ঠতা রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে যতই বেমানান হোক, তারা চিরকাল আছে, চিরকাল থাকবে এবং চিরকাল তাদের কাজ করে যাবে। আলেক্সার নিজে উদার, মহৎ ও শান্ত চরিত্রের লোক হওয়া সত্ত্বেও যে নিষ্ঠুর আরাকচিভ নিজের হাতে একজন গোলন্দাজের গোঁফ ছিঁড়ে ফেলতে পারে, স্নায়ুর দুর্বলতার জন্য যে লোক কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে পারে না, সে শিক্ষিতও নয় সভাসদও নয়, সেই লোক কেমন করে আলেক্সান্দারের পাশে দাঁড়িয়ে এতবড় ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে, তার ব্যাখ্যা একমাত্র এই অনিবার্যতার মধ্যেই পাওয়া যায়।
বলাশেভ দেখল, একটি চাষীর কুঁড়ে ঘরে পিপের উপর বসে দাভুৎ কি যেন লিখছে–সে তখন হিসাবপত্র পরীক্ষা করছে। তার জন্য আরো ভালো বাসা পাওয়া যেতে পারত। কিন্তু মার্শাল দাভুৎ তাদেরই একজন যারা গম্ভীর হয়ে থাকার যৌক্তিকতাস্বরূপ ইচ্ছা করেই অত্যন্ত শোচনীয় পরিবেশে বাস করতে চায়। সেই একই কারণে তারা সর্বদাই কর্মব্যস্ত ও তাড়াহুড়ার মধ্যে থাকে। তার মুখের ভাব যেন সবসময়ই বলতে চায় : দেখতেই তো পাচ্ছ, একটা পিপের উপর বসে এই নোংরা চালার মধ্যে কাজ করছি, এর পরেও জীবনের ভালো দিকের কথা আমি কেমন করে ভাবব? রুশ সেনাপতি ঘরে ঢুকলে সে ইচ্ছা করেই আরো বেশি করে কাজের মধ্যে ডুবে গেল, চশমার ভিতর দিয়ে চোখ তুলে বলাশেভের মুখের দিকে তাকাল, সকাল বেলাকার সৌন্দর্যে আর মুরাৎ-এর সঙ্গে কথাবার্তায় তার মুখে একটা সজীবতা ফুটে উঠেছে, তা দেখে দাভুৎ না উঠে দাঁড়াল, না নড়েচড়ে বসল, বরং ভুরু দুটো আরো বেশি করে কুঁচকে বিদ্বেষবশেই আরো বেশি করে নাকটা সিটকাল।
যখন বলাশেভের মুখ দেখে বুঝল যে এই অভ্যর্থনায় সে অসন্তুষ্ট হয়েছে তখন মাথা তুলে দাভুৎ ঠাণ্ডা গলায় জানতে চাইল সে কি চায়।
সে যে সম্রাট আলেক্সান্দারের অ্যাডজুটান্ট-জেনারেল এবং তার দূর হিসেবেই নেপোলিয়নের কাছে এসেছে, একথা জানে না বলেই দাভুৎ তাকে এভাবে অভ্যর্থনা করেছে মনে করে বলাশেভ তাড়াতাড়ি তাকে নিজ পদমর্যাদা ও কার্যভারের কথা জানিয়ে দিল। কিন্তু ফল হল তার প্রত্যাশার বিপরীত, তার কথা শুনে দাভুৎ আরো রূঢ় ও রুক্ষ হয়ে উঠল।
বলল, আপনার কাগজপত্র কোথায়? সেগুলি আমাকে দিন। আমি সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে দেব।
বলাশেভ জবাবে বলল, তার উপর নির্দেশ আছে সেগুলি সম্রাটকে হাতে-হাতে দিতে হবে।
দাভুৎ বলল, আপনার সম্রাটের নির্দেশ আপনাদের সৈন্যদের উপর চলে, কিন্তু এখানে আপনাকে যা বলা হবে তাই আপনাকে করতে হবে।
এবং সে যে বিচারবিহীন শক্তির উপর কতখানি নির্ভরশীল রুশ সেনাপতিকে সে বিষয়ে আরো বেশি করে সচেতন করে তুলবার জন্যই যেন কর্তব্যরত অফিসারকে ডেকে আনবার জন্য দাভুৎ একজন অ্যাডজুটান্টকে পাঠিয়ে দিল।
সম্রাটের চিঠি সম্বলিত প্যাকেটটা বের করে বলাশেভ সেটা টেবিলের উপর রাখল (দুটো পিপে পাশাপাশি রেখে তার উপর কজাসমেত একটা দরজার পাল্লা পেতে টেবিলটা বানানো হয়েছে)। দাভুৎ প্যাকেটটা নিয়ে লেখাটা পড়ল। বলাশেভ আপত্তি জানিয়ে বলল, আমাকে শ্রদ্ধা করা বা না করার পূর্ণ স্বাধীনতা আপনার আছে, কিন্তু দয়া করে এটুকু জেনে রাখুন যে আমি হিজ ম্যাজেস্ট্রি রুশ সম্রাটের অ্যাডজুটান্ট-জেনারেল…
দাভুৎ নিঃশব্দে তার মুখের দিকে তাকাল, সেখানে উত্তেজিত ও বিব্রত হবার লক্ষণ দেখে যেন খুশিই হল।
আপনার উপযুক্ত ব্যবহারই করা হবে, বলে দাভুৎ প্যাকেটটা পকেটে পুরে চালাঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
এক মিনিট পরে মার্শালের অ্যাডজুটান্ট দ্য কাস্ত্রে এসে বলাশেভের জন্য নির্দিষ্ট বাসায় তাকে নিয়ে গেল।
সেদিন পিপের উপর পাতা সেই একই টেবিল সে মার্শালের সঙ্গে খানা খেল।
পরদিন খুব ভোরেই দাভুৎ ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল, হুকুমের সুরে বলাশেভকে কাছে ডেকে বলল সে যেন এখানেই থাকে, হুকুম এলে যেন মাল-গাড়ির সঙ্গে চলে যায়, এবং মঁসিয় দ কাস্ত্রে ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে যেন কথা না বলে।
চারদিন ধরে নির্জনতা, অবসাদ ও নিজের অক্ষমতা ও তুচ্ছতার চেতনার ভিতর দিয়ে কাটিয়ে, এবং মার্শালের মালপত্র ও ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে গোটা জেলাটা চষে ফেলে তবে বলাশেভ ভিলনাতে গিয়ে পোঁছল–আর পৌঁছল ঠিক সেই ফটক দিয়ে চারদিন আগে সে যে ফটকটা পার হয়ে গিয়েছিল।
পরদিন রাজকীয় অভ্যর্থনাকারী কোৎ দ্য তুরেন বলাশেভকে জানাল, সম্রাট নেপোলিয়ন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি হয়েছে।
যে বাড়িতে বলাশেভকে এনে রাখা হয়েছিল চারদিন আগে সে বাড়ির সামনে মোতায়েন ছিল প্রিয় ব্রাঝেনস্ক রেজিমেন্টের শান্ত্রীরা, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বুক-খোলা নীল ইউনিফর্ম-পরা লোমের টুপি মাথার দুজন ফরাসি গোলন্দাজ, হুজার ও উহলানদের একটি পথপ্রদর্শক দল, এবং এড-ডি-কং-এর চাকর ও সেনাপতিদের একটি বাছাই দল, সকলেই নেপোলিয়নের আগমনের প্রতীক্ষায় তার জিন-কাটা ঘোড়া ও ক্রীতদাস রুস্তানকে ঘিরে গোল হয়ে ফটকে দাঁড়িয়ে আছে। ভিলনার যে বাড়িটা থেকে আলেক্সান্দার বলাশেভকে দৌত্যকর্মে পাঠিয়েছিল ঠিক সেই বাড়িতেই নেপোলিয়ন তাকে অভ্যর্থনা জানাল।
