এতক্ষণে সূর্য উঠেছে, উজ্জ্বল বনভূমির উপর তার কিরণরাশি ছড়িয়ে পড়েছে।
সরাইখানাটা পেরিয়ে একটা পাহাড়ের উপর উঠতেই তারা সামনে দেখতে পেল, একদল অশ্বারোহী তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। দলের আগে কালো ঘোড়ায় চেপে আসছে একটি দীর্ঘদেহ মানুষ, তার টুপিতে পালক গোঁজা, কালো কোঁকড়া চুল কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে। পরনে একটা লাল আবরণী, পা দুটি ফরাসি কায়দায় সামনের দিকে বাড়ানো। লোকটি কদমে বলাশেভের দিকে এগিয়ে এল, জুন মাসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে তার পালক উড়ছে, মণিমুক্তো ও সোনালি ফিতে ঝলমল করছে।
ব্রেসলেট, পালক, নেকলেস ও জরির পোশাক পরা অশ্বারোহী থেকে মাত্র দুই ঘোড়ার দূরত্বে থাকতেই ফরাসি কর্নেল জুলনার বলাশেভের কানে কানে বলল : নেপলসের রাজা! আসলে লোকটি মুরাৎ, এখন সকলে বলে নেপলসের রাজা! কেন যে তাকে নেপলসের রাজা বলা হয় সেটা বুদ্ধির অতীত হলেও সে কিন্তু নিজেও কথাটা বিশ্বাস করে এবং বেশ একটা গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে চলাফেরা করে। সে যে সত্যি নেপলসের রাজা এ বিষয়ে সে এতই নিশ্চিত যে সে শহর থেকে চলে আসার আগে একদিন যখন স্ত্রীকে নিয়ে রাজপথে হাঁটছিল তখন কয়েকজন ইতালিয় তাকে দেখেই বলে উঠল : Viva il ra (রাজা দীর্ঘজীবি হোন!), আর সেও স্ত্রীর দিকে ফিরে বিষ হাসি হেসে বলল : বেচারিরা! ওরা জানে না যে কালই আমি ওদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি!
যদিও সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত যে সে নেপলসের রাজা, এবং তার চলে যাওয়ার জন্য প্রজাবৃন্দের দুঃখকে করুণার চোখেই দেখত, তবু পরবর্তীকালে যখন সামরিক চাকরিতে ফিরে যাবার হুকুম এল, বিশেষ করে ডানজিগ-এ নেপোলিয়নের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎকারের সময় মহামান্য ভগ্নিপতিটি যখন তাকে বলল : আমি তোমাকে রাজা করে পাঠিয়েছিলাম যাতে তুমি আমার মতো করে রাজ্য শাসন করে, তেমার মতো করে নয়!–তখন সে আমাদের সঙ্গেই তার পরিচিত কাজে ফিরে গেল এবং যথাসম্ভব দামী ও চিত্র-বিচিত্র পোশাকে সজ্জিত হয়ে মনের সুখে পোলান্ডের রাজপথে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল-কেন যাচ্ছে বা কোথায় যাচ্ছে তা না জেনেই।
রুশ সেনাপতিকে দেখেই সে রাজকীয় ভঙ্গিতে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে দিল, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল ফরাসি কর্নেলের দিকে। কর্নেল বলাশেভের নামটি উচ্চারণ করতে না পারলেও তা আগমনের উদ্দেশ্যটি সসম্মানে হিজ ম্যাজেস্ট্রিকে জানিয়ে দিল।
রাজা বলল, দ্য বল-মাচেভ! আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে মোহিত হলাম সেনাপতি! তার ভঙ্গিতে রাজকীয় করুণা প্রদর্শনের ভাবটাই ফুটে বেরুল।
কিন্তু রাজা যেই উচ্চৈস্বরে তাড়াতাড়ি কথা বলতে শুরু করল, তখনই তার রাজকীয় মর্যাদাটি বিদায় নিল, সেদিকে খেয়াল না করেই সে তার পরিচিত স্বাভাবিক ভালোমানুষী কণ্ঠস্বরে ফিরে গেল। বলল : দেখুন সেনাপতি, দেখে তো ব্যাপারটাকে যুদ্ধ বলেই মনে হচ্ছে।
বলাশেভ জবাব দিল, ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি, আমার প্রভু সম্রাট যুদ্ধ চান না, আর যেহেতু আপনার প্রভু মনে করেন…।
মঁসিয় দ্য বলাশেভ-এর কথা শুনতে শুনতে মুরাৎ-এর মুখ নির্বোধ তুষ্টিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু রাজকীয় দায়িত্ব বলেও তো একটা কথা আছে। তার মনে হল, রাজা হিসেবে আলেক্সান্দারের দূতের সঙ্গে রাজকীয় বিচার নিয়ে আলোচনা করা তার কর্তব্য। ঘোড়া থেকে নেমে বলাশেভের হাত ধরে নিজের দলবল রেখে কিছুটা দূরে এগিয়ে নিয়ে পায়চারি করতে করতে বেশ ভারিকি চালে কথাবার্তা বলতে লাগল। সে জানাল, প্রুশিয়া থেকে সৈন্য অপসারণের যে দাবি করা হয়েছে তাতে সম্রাট নেপোলিয়ন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, বিশেষ করে সেই দাবি যখন সাধারণভাবে জানাজানি হয়ে গেছে এবং তার ফলে ফ্রান্সের মর্যাদায় আঘাত লেগেছে।
বলাশেভ উত্তরে জানাল, এই দাবির মধ্যে তো ক্ষুব্ধ হবার মতো কিছু নেই, কারণ…কিন্তু মুরাৎ তাকে বাধা দিল।
সদয় ও নির্বোধ হাসি হেসে সে অপ্রত্যাশিতভাবে বলে উঠল, তাহলে কি আপনি সম্রাট আলেক্সান্দারকে আক্রমণকারী বলে মনে করেন না?
বলাশেভ কি কারণে নেপেলিয়নকেই যুদ্ধের সূচনাকারী বলে মনে করে সেইকথাই সে বুঝিয়ে বলল।
মুরাৎ আবার তাকে বাধা দিয়ে বলল, দেখুন প্রিয় সেনাপতি, সর্বান্তঃকরণে আমি চাই যে দুই সম্রাটের মধ্যে একটা মিটমাট হয়ে যাক, এবং আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেটা শেষ হয়ে যাক!
তারপর সে গ্র্যান্ড ডিউক ও তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজখবর নিল, নেপলসে থাকাকালে তার সঙ্গে আমোদ আহাদে যে দিনগুলি কেটেছিল তার স্মৃতিরোমন্থন করল। তারপরই যেন সহসা তার রাজকীয় মর্যাদার কথা স্মরণ করে মুরাৎ খুব গম্ভীর হয়ে গেল, এবং রাজ্যাভিষেকের সময় যেভাবে দাঁড়িয়েছিল সেই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ডান হাতটা নেড়ে বলতে লাগল :
আপনাকে আর আটকে রাখব না সেনাপতি। আপনাদের উদ্দেশ্যের সাফল্য কামনা করি, এই কথা বলেই কাজ-করা লাল আবরণী, উঁচু পালক ও ঝকমকে অলংকারসহ সে সশ্রদ্ধভাবে দূরে অপেক্ষমান দলের লোকদের কাছে ফিরে গেল।
অচিরেই তাকে স্বয়ং নেপোলিয়নের কাছে হাজির করা হবে, মুরাতের কথাবার্তা থেকে এটাই ধরে নিয়ে বলাশেভ ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। কিন্তু তার পরিবর্তে পরবর্তী গ্রামে নাভুৎ-এর পদাতিক বাহিনীর শান্ত্রীরা তাকে আটক করল এবং জনৈক অ্যাডজুটান্ট এসে তাকে মার্শাল দাভুৎ-এর গ্রামে নিয়ে চলল।
