পরদিন নিম্নলিখিত চিঠিখানি নেপোলিয়নকে পাঠানো হল :
মঁসিয় প্রিয় ভাই,
গতকাল জানতে পারলাম, ইয়োর ম্যাজেস্ট্রির সঙ্গে আমার যেকথা হয়েছিল একান্ত আনুগত্যের সঙ্গে আমি তা রক্ষা করে চলা সত্ত্বেও, আপনার সৈন্যরা রুশ সীমান্ত অতিক্রম করেছে, আর এইমাত্র পিটার্সবুর্গ থেকে আমি যে চিঠিটা পেয়েছি তাতে কাউন্ট লরিস্তন এই সীমান্ত লংঘনের কারণ হিসেবে আমাকে জানিয়েছে, প্রিন্স কুরাকিন যেদিন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছিলেন তখন থেকেই ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি নিজেকে আমার সঙ্গে যুদ্ধরত বলে মনে করে এসেছেন। দুক দ্য বাসানো যেসব কারণে তাকে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করেছিল তার মধ্যে এমনকিছু ছিল না যাতে আমি মনে করতে পারি যে সেটাকে আক্রমণের একটা অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। বস্তুত সেই রাষ্ট্রদূত নিজেই একথা জানিয়েছেন যে ওটা দাবি করার কোনো অধিকার তার ছিল না, এবং খবরটা জানা মাত্রই আমি তাকে বলে দিয়েছিলাম যে আমিও এটা সমর্থন করি না, আর তাই তাকে স্বস্থানে থাকারই নির্দেশ দিয়েছিলাম। এরকম একটা ভুল বোঝাবুঝির জন্য আমার লোকজনের রক্তপাতের বাসনা যদি ইয়োর ম্যাজেস্ট্রির না থাকে, এবং আপনি যদি রুশ অঞ্চল থেকে আপনার সেনাদলকে সরিয়ে নিতে রাজি থাকেন, তাহলে আমি ধরে নেব যে যা ঘটেছে তা মোটেই ঘটেনি, এবং আমাদের মধ্যে একটা সমঝোতা গড়ে তোলা এখনো সম্ভব হবে। অন্যথায়, ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি, আমার দিক থেকে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা না থাকা সত্ত্বেও যে আক্রমণ আপনি শুরু করেছেন তাকে প্রতিহত করতে আমি বাধ্য হব। আর একটি যুদ্ধের বিপদ থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব ইয়োর ম্যাজেস্ট্রির উপরেই নির্ভর করছে।
(স্বাক্ষর) আলেক্সান্দার।
.
অধ্যায়-৪
১৪ই জুন সকাল দুটোয় বলাশেভকে ডেকে এনে সম্রাট নেপোলিয়নকে লেখা চিঠিটা তাকে পড়ে শোনাল, আদেশ দিল সে যেন নিজেই চিঠিটা নিয়ে গিয়ে ফরাসি সম্রাটের হাতে দেয়। তাকে পাঠাবার সময় সম্রাট আর একবার বলে দিল, যতদিন একটিও সশস্ত্র শত্রু-সৈন্য রাশিয়ার মাটিতে থাকবে ততদিন সে সন্ধি করবে না, তাকে বলে দিল, এই কথাগুলি যেন নেপোলিয়নকে শুনিয়ে দেওয়া হয়। নেপোলিয়নকে লেখা চিঠিতে আলেক্সান্দার এই কথাগুলি লেখেনি, কারণ তার মনে হয়েছে যে মিটমাটের একটা শেষ চেষ্টা যখন করা হচ্ছে তখন এই কথাগুলি লেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, কিন্তু স্রাট বলাশেভকে স্পষ্ট নির্দেশ দিল, সে যেন এই কথাগুলি নেপোলিয়নকে অতি অবশ্য জানিয়ে দেয়।
একজন বিউগলবাদক ও দুজন বসাককে সঙ্গে নিয়ে ১৪ তারিখ শেষ রাতে যাত্রা করে বলাশেষ নিয়েমের নদীর রাশিয়ার দিককার রাইকন্তি গ্রামের ফরাসি আঁটিতে পৌঁছল ভোর-ভোর সময়ে। অশ্বারোহী ফরাসি শান্ত্রীরা সেখানেই তাকে থামিয়ে দিল।
লাল ইউনিফর্ম ও লোমশ টুপি পরিহিত জনৈক সনদবিহীন ফরাসি হুজার-অফিসার চিৎকার করে বলাশেভকে থামতে বলল। বলাশেভ সঙ্গে সঙ্গে না থেমে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলল।
সনদবিহীন অফিসারটির চোখে জকুটি দেখা দিল, অস্ফুটে কিছু গালাগালি ছুঁড়ে দিয়ে তার ঘোড়ার মুখটা বলাশেভের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে তলোয়ারে হাত রেখে রুশ সেনাপতিকে লক্ষ্য করে রুক্ষ গলায় বলে উঠল : সে কি কালা যে যা বলা হচ্ছে তা কানে ঢুকছে না? বলাশেভ নিজের পরিচয় দিল। রুশ সেনাপতির দিকে না তাকিয়ে অফিসারটির সহকর্মীদের সঙ্গে সেনাদলসংক্রান্ত আলোচনা শুরু করে দিল।
উচ্চতম কর্তৃত্ব ও শক্তিতে অধিষ্ঠিত থাকার পরে, মাত্র তিন ঘণ্টা আগেই সম্রাটের সঙ্গে কথাবার্তা বলার পরে, এবং স্বীয় পদমর্যাদার দরুন সাধারণভাবেই শ্রদ্ধা লাভে অভ্যস্ত থাকার পরে, রাশিয়ার মাটিতেই তার প্রতি এই শত্রুভাবাপন্ন, এমন কি শ্রদ্ধাহীন, পশু-শক্তির প্রয়োগ দেখে বলাশেভ খুবই অবাক হয়ে গেল।
মেঘের আড়াল থেকে সবে সূর্য উঠছে, বাতাস তাজা ও শিশিরস্নাত। গ্রাম থেকে একদল গরু-মোষ রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে, জলের বুকে বুদ্বুদের মতো একটার পর একটা ভরত পক্ষী আকাশের বুকে ডাকতে ডাকতে উড়ে চলেছে।
বলাশেভ চারদিকে তাকিয়ে গ্রাম থেকে কোনো অফিসারের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল, রুশ কসাক বিউগলবাদক এবং ফরাসি হুজাররা মাঝেমাঝেই একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে।
সবেমাত্র বিছানা ছেড়ে একজন ফরাসি হুজার-কর্নেল একটা সুন্দর ধূষর ঘোড়ায় চেপে দুইজন হুজারকে সঙ্গে নিয়ে গ্রাম থেকে এসে হাজির হল। অফিসার, সৈনিক ও ঘোড়া সকলকেই বেশ চটপটে ও সুস্থ বলে মনে হল।
যেকোন অভিযানের প্রথমদিকে সৈন্যরা শান্তিকালীন কুচকাওয়াজের মতোই ছিমছাম থাকে, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদের একটা যুদ্ধকালীন গমক দেখা দেয়, চলাফেরায় ও মনোভাবে ফুটে ওঠে একটা সানন্দ উৎসাহের লক্ষণ।
ফরাসি কর্নেল কষ্ট করে একটা হাই চাপল, কিন্তু তার আচরণ ভদ্র, সম্ভবত বলাশেভের পদমর্যাদা সে বুঝতে পেরেছে। তাকে নিয়ে ঘাঁটি পেরিয়ে এগিয়ে গেল, বলল, তার ম্রাটের সামনে উপস্থিত হবার বাসনা অবিলম্বেই হয় তো পূর্ণ করা যাবে, কারণ তার বিশ্বাস সম্রাটের বাসস্থান এখান থেকে বেশি দূরে নয়।
রাইকন্তি গ্রামের ভিতর দিয়ে তারা এগিয়ে চলল। দুপাশ থেকে হুজার, শান্ত্রী ও সৈনিকরা তাদের কর্নেলকে অভিবাদন জানাল, আর রুশ ইউনিফর্মধারীর দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। গ্রামের অপর প্রান্তে তারা পৌঁছে গেল। কর্নেল বলল, সেনাদলের কমান্ডার সেখান থেকে সোয়া মাইল দূরে থাকে, বলাশেভকে সঙ্গে নিয়ে তার গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দেবে।
