নেপোলিয়ন যেদিন নিয়েমেন নদী পার হবার হুকুম জারি করল এবং তার অগ্রবর্তীবাহিনী কসাকদের তাড়িয়ে রুশ সীমান্ত অতিক্রম করল, সেই সন্ধ্যাটা আলেক্সান্দার কাটাল বেনিংসেনের পল্লীভবনে এড-ডি কংদের সঙ্গে খানাপিনায়।
বড়ই চমৎকার ঝলমলে সে উৎসব। উদ্যোক্তারা জানাল, এক জায়গায় এতগুলি সুন্দরীর সমাবেশ কদাচিৎ ঘটে থাকে। ম্রাটের সঙ্গে যেসব রুশ মহিলারা পিটার্সবুর্গ থেকে ভিলনায় এসেছিল তাদের মধ্যে কাউন্টেস বেজুকভাও ছিল, তার তথাকথিত রুশ সৌন্দর্যের ধাক্কায় রুচিশীলা পোলিশ মহিলাদের সে একেবারে কাৎ করে দিল। ম্রাটের নজরও তার উপর পড়ল, তার সঙ্গে নেচে সম্রাট তাকে সম্মানিত করল।
বরিস দ্রুবেৎস্কয় স্ত্রীকে মস্কোতে রেখে এসেছে, বর্তমানে সে en gracon (অবিবাহিত)-এর মতোই বাস করছে, এড-ডি-কং না হলেও সেও এই উৎসবের ব্যয়বাবদ মোটা টাকা চাঁদা দিয়েছে। এখন সে একজন ধনী লোক, সম্মানের উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত, এখন আর সে কারো অনুগ্রহভিখারী নয়, সমবয়স্কদের মধ্যে যারা উঁচুতে উঠেছে তাদের সঙ্গে সে কারো অনুগ্রহভিখারী নয়, সমবয়স্কদের মধ্যে যারা উঁচুতে উঠেছে তাদের সঙ্গে সে সমানতালে পা ফেলে চলে। অনেকদিন পরে তিলনাতে হেলেনের সঙ্গে তার দেখা হল। হেলেন এখন বড় বড় লোকের সঙ্গে মেলামেশা করছে, বরিসও সম্প্রতি বিয়ে করেছে, তাই অনেকদিনের পুরনো বন্ধুর মতোই তারা চলতে লাগল।
মধ্যরাত। নাচ তখনো চলছে। মনের মতো জুটি না পেয়ে হেলেন বরিসের সঙ্গেই মাজুরকা নাচের প্রস্তা করল। তারাই তৃতীয় জুটি। জরির কাজকরা কালো গাউনের তলা থেকে বেরিয়ে-আসা হেলেনের ঝকঝবে খোলা কাঁধের দিকে তাকিয়ে পূর্ব-পরিচিতদের কথা বলতে বলতে বরিস সারাক্ষণ ম্রাটের দিকেই চো ফিরিয়ে রইল। সম্রাট তখন নিজে নাচছে না, দরজায় দাঁড়িয়ে একের পর এক নাচের জুটিদের থামিয়ে এম মিষ্টি করে কথা বলছে যা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব।
মাজুরকা শুরু হলে বরিস লক্ষ্য করল, সম্রাটে অতিপ্রিয় অনুগামীদের অন্যতম অ্যাডজুটান্ট-জেনারে বলাশেভ সম্রাটের দিকে এগিয়ে গেল এবং সম্রাট একটি পোলিশ মহিলার সঙ্গে আলাপনে রত থাকলে শিষ্টাচার-বিরোধীভাবে তার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। কথা শেষ করে সম্রাট তার দিকে তাকাল, যখন বুঝ পারল যে কোনো গুরুতর কারণেই সে এ সময়ে এখানে এসেছে, তখন সম্রাট মহিলাটির দিকে তাকিয়ে ঘাড় ঈষৎ দুলিয়ে বলাশেভের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। বলাশেভ কি যেন বলতে না বলতেই সম্রাটের মুখে ফুটে উঠল অপার বিস্ময়। বলাশেভের হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে সাত গজ চওড়া একটা পথ করে নিয়ে সম্রাট তাকে নিয়ে ঘরটা পার হয়ে গেল। তা দেখে আরাকচিভের উত্তেজিত মুখের ভাবটা বরিসের নজর এড়াল না। ভুরুর নীচে থেকে সম্রাটের দিকে তাকিয়ে আরাকচিভ লাল নাকটা ঝেড়ে ভিড়ের ভিতর থেকে কয়েক পা এগিয়ে গেল, মনে আশা, সম্রাট হয় তো তাকে ডেকে কথা বলবে।
কিন্তু আরাকচিভের দিকে না তাকিয়েই সম্রাট ও বলাশেভ আলোকিত বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। তলোয়ার হাতে নিয়ে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে আরাকচিভ প্রায় বিশ পা দূর থেকে তাদের অনুসরণ করল।
মাজুরকা নাচের নানা মুদ্রার মাঝেও বরিসের মনে একটা দুশ্চিন্তা দেখা দিল, বলাশেভ কি সংবাদ এনেছে, আর কেমন করে অন্য সকলের আগে সেটা জানা যায়। নাচের মাঝখানেই সে বাগানের দরজার কাছে চলে গেল এবং সম্রাট ও বলাশেভকে বারান্দায় উঠে আসতে দেখে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল। যেন সরে যাবার আর সময় নেই এমনি ভাব দেখিয়ে সে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাল।
ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত হবার মতো উত্তেজিত স্বরে সম্রাট তখন এই শেষ কথাগুলি বলছে :
যুদ্ধ ঘোষণা না করেই রাশিয়ার ভিতরে অনুপ্রবেশ! যতদিন একটি সশস্ত্র শত্রুসৈন্য আমার দেশে থাকবে ততদিন আমি কিছুতেই সন্ধি করব না!
বরিসের মনে হল, কথাগুলি বলতে পেরে সম্রাট যেন খুশি হয়েছে, কিন্তু বরিস সেটা শুনে ফেলায় অসন্তুষ্ট হয়েছে।
ভ্রূকুটি করে সম্রাট বলল, একথা যেন কেউ জানতে না পারে!
বরিস বুঝল, শেষের কথাগুলি তাকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে। চোখ বুজে সে মাথাটা একটু নোয়ালো। সম্রাট পুনরায় নাচ-ঘরে ঢুকে আরো আধ ঘণ্টা সময় সেখানে কাটিয়ে দিল।
এইভাবে বরিসই প্রথম জানতে পারল যে ফরাসি বাহিনী নিয়েমেন পার হয়েছে। এই ঘটনাটিকে ধন্যবাদ, কারণ এতে প্রমাণ হল যে অন্য কেউ জানে না এমন অনেক খবরই সে রাখে, আর এতে তাদের চোখে বরিসের মর্যাদা আরো বেড়ে গেল।
মাসাধিক কালের অপূর্ণ প্রত্যাশার পরে একটা বল-নাচের আসরে ফরাসি বাহিনীর নিয়েমেন অতিক্রম করার এই অপ্রত্যাশিত সংবাদ সকলকেই চমকে দিল। সংবাদটা প্রথম জানবার পরেই সক্ষোভ প্রতিবাদে সম্রাটের মুখ দিয়ে যে কথাটি উচ্চারিত হল সেটা ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। সেদিন রাত দুটোয় বাড়িতে ফিরেই সম্রাট-সচিব শিশকভাকে ডেকে পাঠাল, তাকে বলল সৈন্যদের উদ্দেশ্যে একটি হুকুম-নামা লিখে পাঠাতে এবং ফিল্ড-মার্শাল প্রিন্স সলতিকভকে তার একটি অনুলিপি পাঠিয়ে দিতে, তাকে আরো নির্দেশ দেওয়া হল যে সেই হুকুম-নামায় যেন লেখা থাকে–যতদিন একটি সশস্ত্র ফরাসিও রাশিয়ার মাটিতে থাকবে। ততদিন সম্রাট কোনোরকম সন্ধি করবে না।
