তাকে দেখবার জন্য পোলদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল, সকলে সোৎসাহে চেঁচিয়ে উঠল, Vivat! (জিন্দাবাদ!)।
নদীটার এদিক-ওদিক ভালো করে দেখে নেপোলিয়ন ঘোড়া থেকে নেমে নদীর তীরে একটা কাঠের উপর বসল। তার নির্বাক ইশারায় একটা দূরবীন এনে দেওয়া হল। এগিয়ে আসা একটা চাকরের পিঠে সেটাকে রেখে সে নদীর ওপারে দৃষ্টি ফেরাল। তারপর কাঠের উপর মেলে-ধরা একখানা মানচিত্রের মধ্যে ডুবে গেল। মাথা না তুলে দুজনে এড-ডি-কংকে কি যেন বলতেই তারা ঘোড়া ছুটিয়ে পোলিশ উহলানদের কাছে এগিয়ে গেল।
একজন এড-ডি-কং পৌঁছতেই পোলিশ উহলানদের মধ্যে গুঞ্জন শোনা গেল, কি? তিনি কি বলছেন?
হুকুম হয়েছে, হেঁটে পার হওয়া যায় এরকম একটা জায়গা খুঁজে বের করে নদীটা পার হতে হবে। পোলিশ উহলানদের কর্নেল জনৈক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ উত্তেজনায় রক্তিম হয়ে থেমে থেমে জিজ্ঞাসা করল, সেরকম জায়গার খোঁজ না করে সে কি উহলানদের নিয়ে সাঁতরে নদী পার হতে পারে। এড-ডি-কং উত্তর দিল, এই অতিউৎসাহ দেখে সম্রাট অসন্তুষ্ট নাও হতে পারে।
এড-ডি-কং কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই গোঁফওয়ালা বুড়ো অফিসারটির চোখ-মুখ খুশিতে ঝকমকিয়ে উঠল, হাতের তলোয়ার তুলে চিৎকার করে উঠল, ভাইভাত! তারপর উহলানদের অনুসরণ করতে হুকুম দিয়ে নদীর জলে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। শত শত উহলান তার পিছনে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর, ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ে উহলানরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। কিছু ঘোড়া ও সৈনিক ডুবে গেল, কেউবা জিনের উপরে থেকে অথবা ঘোড়ার কেশর ধরে সাঁতরাতে লাগল। মাত্র আধ ভার্ল্ড দূরেই একটা শুকনো খাদ থাকা সত্ত্বেও দূরে কাঠের উপর উপবিষ্ট লোকটির চোখের সামনে নদীর সাঁতরাতে এবং ডুবে যেতে পারায় তারা গর্ববোধ করতে লাগল, যদিও সে লোকটি তাদের এই কার্যকলাপ একবার তাকিয়েও দেখল না। এড-ডি-কং ফিরে এসে যখন সুযোগমতো ম্রাটের প্রতি পোলদের এই অনুরাগের কথা জানাল তখন ধূসর ওভারকোর্ট পরিহিত লোকটি উঠে দাঁড়াল, এবং বের্থিয়ারকে ডেকে এনে নদীর তীরে পায়চারি করতে করতে তাকে নানা নির্দেশ দিতে লাগল, আর মাঝে মাঝে ডুবন্ত উহলানদের দিকে আপত্তিসূচক দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল।
আফ্রিকা থেকে মস্কোভির তৃণভূমি পর্যন্ত পৃথিবীর যেকোন স্থানে তার উপস্থিতিই যে মানুষের বাকরোধ করা এবং তাদের উন্মত্ত আত্ম-বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেবার পক্ষে যথেষ্ট-এ সত্য তার কাছে মোটেই নতুন নয়। ঘোড়া আনতে বলে সে নিজের বাসস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
তাদের সাহায্যের জন্য নৌকা পাঠানো সত্ত্বেও প্রায় চল্লিশ জন উহলান নদীতে ডুবে গেল। বাকি, মধিকাংশ সৈনিক অনেক কষ্টে যে তীর থেকে যাত্রা করেছিল সেখানেই ফিরে এল। শুধু অল্প কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে কর্নেল স্বয়ং নদী পেরিয়ে কোনোরকমে ওপারে উঠল। তীরে উঠেই ভেজা পোশাকসমেত তারা চিৎকার করে উঠল, ভাইভাত! তারপর সোৎসাহে সেইখানে তাকাল যেখানে নেপোলিয়ন বসেছিল, কিন্তু এখন আর নেই, তবু তারা সেইমুহূর্তে মনে মনে খুশি হল।
সেদিন সন্ধ্যায় নেপোলিয়ন দুটো আদেশ জারি করল : প্রথম, রাশিয়াতে চালাবার জন্য যেসব জাল রুশ নোট বানানো হয়েছে যত শীঘ্র সম্ভব সেগুলো বাজারে ছেড়ে দেওয়া হোক, দ্বিতীয়, যে স্যাক্সনটির কাছে ফরাসি বাহিনীর উদ্দেশ্যে প্রেরিত হুকুম সংক্রান্ত তথ্যসম্বলিত চিঠি পাওয়া গেছে তাকে গুলি করে মারা হোক। আর এই দুই হুকুমের ফাঁকে নেপোলিয়ন আরো নির্দেশ দিল, যে পোলিশ কর্নেল অকারণে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল তাকে সম্মানিত সেনাদল-এর তালিকাভুক্ত করা হোক, সে সেনাদলের প্রধান স্বয়ং নেপোলিয়ন।
Quos vult perdere dementat.(ঈশ্বর যাদের ধ্বংস করতে চান তাদেরই পাগল করে দেন।)
.
অধ্যায়-৩
ইতিমধ্যে রাশিয়ার সম্রাট সেনা পরিদর্শন করতে এবং নানারকম কুচকাওয়াজের ব্যবস্থা করতে একমাসের উপর ভিলনাতে কাটাচ্ছে। প্রত্যাশিত যুদ্ধের কোনোরকম প্রস্তুতিই নেওয়া হয় নি, আর সেই প্রস্তুতির জন্যই সম্রাট চলে এসেছে পিটার্সবুর্গ থেকে। যুদ্ধের কোনো সঠিক পরিকল্পনাই করা হয় নি। বিভিন্ন পরিকল্পনার যেসব প্রস্তাবমাত্র করা হয়েছিল একমাস যাবৎ সম্রাট প্রধান ঘাঁটিতে হাজির হবার ফলে তা বরং আরো বেড়ে গেছে। তিনটি বাহিনীরই নিজ নিজ প্রধান সেনাপতি আছে, কিন্তু সমগ্র রুশবাহিনীর কোনো সর্বাধিনায়ক নেই, আর সম্রাট নিজেও সে দায়িত্বভার গ্রহণ করে নি।
সম্রাট যত বেশিদিন ভিলনায় কাটাল, যুদ্ধের প্রস্তুতি ততই যেন হ্রাস পেতে লাগল। যারা সর্বদা সম্রাটকে ঘিরে রইল তাদের সকলেরই একমাত্র চেষ্টা হল সম্রাটের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা, যুদ্ধ যে আসন্ন সেকথা তারা ভুলেই গেল।
পোলিশ প্রধানগণ, সভাসদগন এবং স্বয়ং সম্রাট কর্তৃক আয়োজিত অনেকগুলি বল-নাচ ও ভোজনোৎসবের পরে জুন মাসে জনৈক পোলিশ এড-ডি-কং-এর খেয়াল হল যে, ম্রাটের সম্মানে এড-ডি কংদের তরফ থেকেও একটা ডিনার ও বল-নাচের আয়োজন করা উচিত। প্রস্তাবটা সকলেরই মনে ধরল। সম্রাটও সম্মতি দিল। চাঁদা তুলে অর্থ সংগ্রহ করা হল। ম্রাটের প্রিয়পাত্রী জনৈক মহিলাকে প্রধান অভ্যর্থনাকারিণী হিসেবে আমন্ত্রণ করা হল। কাউন্ট বেনিংসেন ভিলনা প্রদেশের জমিদার, উৎসবের জন্য সে তার গ্রামের বাড়িটা ছেড়ে দিল। স্থির হল, ১৩ই জুন তারিখে কাউন্ট বেনিংসেনের জমিদারি জাক্রেৎ-এ বল নাচ, ডিনার, নৌকাবাইচ ও আতসবাজি পোড়ানো হবে।
