যে সমস্ত কাজকে তারা তাদের ইচ্ছাধীন কাজ বলে মনে করে তার প্রতিটি কাজই ঐতিহাসিক অর্থে অনিচ্ছাপ্রসূত, ইতিহাসের যাত্রাপথের সঙ্গে যুক্ত এবং অনাদিকাল থেকে পূর্বনির্দিষ্ট।
.
অধ্যায়-২
২৯শে মে নেপোলিয়ন ড্রেসডেন ত্যাগ করল, সেখানে সে তিনটি সপ্তাহ কাটিয়েছে এমন একটি দরবার পরিবৃত হয়ে যার মধ্যে ছিল প্রিন্স, ডিউক, রাজন্যবর্গ, এমনকি একজন সম্রাট পর্যন্ত। ড্রেসডেন ছাড়বার আগে নেপোলিয়ন অনুগ্রহ দেখাল সেইসব রাজা ও প্রিন্সদের যাদের প্রতি সে প্রশ্ন, আর যাদের প্রতি অপ্রসন্ন তাদের ভাগ্যে জুটল তিরস্কার, নিজস্ব মণি-মুক্তো-হীরে-অর্থাৎ যেগুলি সে পেয়েছে অন্য রাজাদের কাছ থেকে উপহার দিল অস্ট্রিয়ার সাম্রাজ্ঞীকে, ইতিহাসকারদের কাছ থেকে আমরা শুনেছি, যে সম্রাজ্ঞী মারি লুই প্যারিসে নেপোলিয়নে এক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাকেই নিজের স্বামী বলে মনে করত। গভীর মমতায় তাকে আলিঙ্গন করে নেপোলিয়ন যখন বিদায় নিল তখন সে দুঃখ ম্রাজ্ঞীর পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। যদিও কূটনীতিবিদরা তখনো দৃঢ়ভাবে সন্ধির সম্ভাবনায় বিশ্বাস করে মহাউৎসাহে সেই উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে, যদিও স্বয়ং সম্রাট নেপোলিয়ন আলেক্সান্দারকে Morisieur mon frzre বলে সম্বোধন করে তাকে চিঠি লিখেছে এবং আন্তরিক আশ্বাস জানিয়েছে যে সে যুদ্ধ চায় না, আর তাকে চিরদিন ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে–তথাপি নেপোলিয়ন তার সেনাদলের সঙ্গে যোগ দিতে যাত্রা করল, আর প্রতিটি ঘাঁটিতে নতুন করে হুকুম জারি করল যাতে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সৈন্য-চলাচল আরো বৃদ্ধি করা হয়। চাকর-বাকর, এড-ডি কং ও একজন পথ-প্রদর্শকে পরিবৃত হয়ে একটা ছয়-ঘোড়ার ভ্রমগোপযোগী গাড়িতে সে যাত্রা করল পোসেন, থর্ন, ডানজিগ ও কোনিগসবের্গ-এর পথে। প্রতিটি শহরে হাজার হাজার মানুষ উত্তেজনা ও উৎসাহসহকারে তার সঙ্গে দেখা করল।
সেনাদল এগিয়ে চলেছে পশ্চিম থেকে পুবে, আর ছয়টি ঘোড়াও বদলাবদলি করে সেই একই দিকে নেপোলিয়নকে নিয়ে এগিয়ে চলল। ১০ই জুন সেনাদলের সঙ্গে মিলিত হয়ে সে রাত্রিবাস করল ভিল্কাভিস্কি অরণ্যে জনৈক পোলিশ কাউন্টের জমিদারিতে তার জন্য তৈরি একটা বাড়িতে।
পরদিন সেনাদলকে পেরিয়ে একটা গাড়িতে চেপে সে নিয়েমেন-এ হাজির হল এবং পার হবার উপযুক্ত একটা স্থান বেছে নেবার জন্য পোলিশ ইউনিফর্ম পরে নদীর তীরে পৌঁছে গেল।
নদীর অপর তীরে কিছু কসাককে দেখা গেল, আর দূর-বিস্তার তৃণভূমির মাঝখানে দেখা গেল মস্কোর পবিত্র শহর (Moscou, la ville sainte), যে সিথিয়া রাজ্যে একদা মহান আলেক্সান্দার প্রবেশ করেছিল তেমনই এক রাজ্যের রাজধানী–তারপরেই একান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে এবং রণ-কৌশল ও কূটনৈতিক বিবেচনাকে উপেক্ষা করে নেপোলিয়ন সেনাদলকে অগ্রসর হবার হুকুম দিল এবং পরদিনই তার সেনাদল নিয়েমেন অতিক্রম করতে আরম্ভ করল।
নিয়েমেন-এর বা তীরের উতরাইতে সেইদিনই তার জন্য যে শিবিরে স্থাপন করা হয়েছিল, ১২ জুন খুব সকালে সেই শিবির থেকে বেরিয়ে এসে নেপোলিয়ন চোখে একটা স্পাই-গ্লাস (ছোট দূরবীন) লাগিয়ে দেখতে পেল, তার সৈন্যরা জলস্রোতের মতো ভিল্কাভিস্কি অরণ্য থেকে বেরিয়ে এসে নদীর উপরকার তিনটি সেতু পথ ধরে ছুটে চলেছে। সৈনিকরা সম্রাটের উপস্থিতির কথা জানত, তাই তাকে খুঁজতে গিয়ে পাহাড়ের উপরে শিবিরের সম্মুখে ওভারকোট ও টুপি পরিহিত একটি মূর্তিকে অন্য সকলের চাইতে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা নিজ নিজ টুপি তুলে চিৎকার করে উঠল : VieL Empereur! তারপর যে বিরাট জঙ্গলের মধ্যে তারা আত্মগোপন করেছিল একে একে অবিশ্রাম স্রোতধারার মতো সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিন ভাগে ভাগ হয় তিনটি সেতুর উপর দিয়ে অপর তীর লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল।
এবার আমরা যুদ্ধে নামব। আঃ, তিনি নিজে যখন কাজটা হাতে নেন তখন সবকিছুই গরম হয়ে ওঠে..ঈশ্বর সাক্ষী!…ঐ তো তিনি!…Vive L Empereur! তাহলে এই সেই এশিয়ার তৃণভূমি! যাই বল, দেশটা খুব নোরা। অ রিভোয়া, বুচে, তোমার জন্য মস্কোর সেরা প্রাসাদটা রেখে দেব! অ রিভোয়া। শুভেচ্ছা জানাই!…সম্রাটকে দেখেছ? Vive L Empereur!-দেখ জেরার্ড, আমাকে যদি ভারতবর্ষের শাসনকর্তা করা হয়, তাহলে তোমাকে করব কাশ্মীরের মন্ত্রী-কথা একেবারে পাক্কা। Vive L Empereur! হুররা! হুররা! হুররা! কসাকের দল-রাস্কেলরা-দেখ কেমন দৌড়চ্ছে! ViveL Empereur! ঐ তো তিনি, দেখছে পাচ্ছ? ঠিক তোমাকে যেমন দেখছি, এইভাবে দুবার তাকে দেখছি। ছোট্ট কর্পোরাল।…একজন প্রবীণকে তিনি ক্রুশ উপহার দিলেন, তাও দেখেছি।…vive L Empereur! যুবক ও বৃদ্ধ, নানা চরিত্রের ও সামাজিক মর্যাদার মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হল একই কথা। সকলেরই চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে দীর্ঘ প্রত্যাশিত অভিযান শুরু করার আনন্দ, আর যে মানুষটি ধূষর কোট গায়ে পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে তার প্রতি আবেগমথিত অনুরাগ।
১৩ জুন নেপোলিয়নের জন্য একটা ছোট আরবি ঘোড়া আনা হল। তা পিঠে চেপে সে ছুটল নিয়েমেন এর উপরকার একটা সেতুর দিকে। চারদিকে সৈনিকদের চিৎকার ও জয়ধ্বনিতে কানে তালা লাগবার উপক্রম। যুদ্ধের চিন্তায় মগ্ন মন তাতে বিরক্তি বোধ করলেও নেপোলিয়ন সে চিৎকার সহ্য করেই চলেছে, কারণ সে জানে যে সৈনিকদের এখন থামতে বলা বৃথা। একটা জনাকীর্ণ ভাসমান সেতুকে পার হয়ে সে হঠাৎ বাঁ দিকে মোড় ঘুরে সোজা ঘোড়া ছুটিয়ে দিল কভনোর দিকে। আনন্দে রুদ্ধশ্বাস অশ্বারোহী রক্ষীদল আগে আগে চলেছে ভিড়ের ভিতর দিয়ে তার জন্য রাস্তা পরিষ্কার করে দিয়ে। প্রশস্ত ভিলিয়া নদীর তীরে পৌঁছে সেখানে অবস্থানকারী একটি পোলিশ উহলান রেজিমেন্টের কাছে গিয়ে সে থামল।
