যেসব সৈনিকদের ভাগ্য-পরীক্ষার দ্বারা অথবা বাধ্যতামূলক সৈন্যদলভুক্তির বিধানের দ্বারা এই অভিযানের সামিল করা হয়েছিল তাদের যেমন এ ব্যাপারে কোনোরকম স্বাধীন ইচ্ছা ছিল না, তেমনই যে নেপোলিয়ন এবং আলেক্সান্দারের ঘাড়ে যুদ্ধটাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এ ব্যাপারে তাদেরও কোনো ইচ্ছার স্বাধীনতা ছিল না। যা ঘটেছে তার অন্যথা হতেই পারত না, কারণ নেপোলিয়ন এবং আলেক্সান্দারের মনোবাসনাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে এমন অসংখ্য ঘটনার সমাবেশ প্রয়োজন ছিল যাদের যেকোন একটিকে বাদ দিলেই এ ঘটনাটি ঘটতেই পারত না। যে লক্ষ লক্ষ লোকের হাতে ছিল প্রকৃত ক্ষমতা-যে সৈনিকরা গোলাগুলি চালিয়েছিল, অথবা যারা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল রসদ ও কামান-বন্দুকতারাই তো এই দুর্বল ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করেছিল, এবং নানারকমের অসংখ্য জটিল কারণের দ্বারা সেকাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।
বুদ্ধির অতীত ঘটনাবলীর ব্যাখ্যার জন্য আমরা নিয়তিবাদের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হই। ইতিহাসের সেইসব ঘটনাকে যতই আমরা বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাই ততই সেগুলি আমাদের কাছে আরো বেশি করে বিচার ও বুদ্ধির অতীত বলে প্রতীয়মান হয়ে ওঠে।
প্রতিটি মানুষ নিজের মতো করে বাঁচে, ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণের জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করে, মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে এখন সে এ-কাজ বা সে-কাজ করতেও পারে, আবার না করতেও পারে, কিন্তু যেমুহূর্তে কাজটি করা হয়ে গেল তখনই একটি বিশেষ মুহূর্তে সংঘটিত সেই কাজটি হয়ে ওঠে অপরিবর্তনীয় ও ইতিহাসের অধীন, সেখানে সে ঘটনার কোনো স্বাধীন সত্তা নেই, তার তাৎপর্য তখন নিয়তি-নির্ধারিত।
প্রতিটি মানুষের জীবনেই দুটি দিক থাকে, একদিকে তার ব্যক্তিগত জীবন, সেখানে তার স্বার্থ যত বিমূর্ত সেও ততই স্বাধীন, আর একদিকে তার দলগত মৌমাছি-জীবন, সেখানে নিয়তির অনিবার্য বিধানকে মেনে চলতে সে সাধ্য।
মানুষ নিজের জন্য বাঁচে সচেতনভাবে, কিন্তু মানবতার ঐতিহাসিক ও সার্বিক লক্ষ্যসাধনের ক্ষেত্রে সে একটি অচেতন যন্ত্র মাত্র। একটা কাজ একবার করা হয়ে গেলে আর তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না, মহাকালের যাত্রাপথে আরো অসংখ্য মানুষের কর্মধারার সঙ্গে মিলেমিশে সেই কাজটিই একটি ইতহাসিক তাৎপর্য লাভ করে। একটি মানুষ সামাজিক মর্যাদার সোপানের যত বেশি উঁচুতে অধিষ্ঠিত থাকে, যত বেশি মানুষের সঙ্গে সে যুক্ত থাকে, এবং অন্যের উপর তার প্রভাব বেশি থাকে, ততই তার প্রতিটি কাজ হয়ে ওঠে নিয়তি-নির্দিষ্ট ও অনিবার্য।
রাজার হৃদয় তো প্রভুরই হাতে।
রাজা তো ইতিহাসের ক্রীতদাস।
ইতিহাস, অর্থাৎ মানবজাতির অচেতন, সাধারণ, মৌমাছি-জীবন, রাজার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে স্বীয় উদ্দেশ্যসাধনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
যদিও ১৮১২ সালের সেইসময় নেপোলিয়নের দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে verser (ou ne pas verser) le sang de ses peuples (জনগণের রক্তপাত করা হবে কি হবে না)-নেপোলিয়নকে লেখা শেষ চিঠিতে আলেক্সান্দার এই ভাষাই ব্যবহার করেছিল–সেটা তার উপরেই নির্ভর করছে, তথাপি তখনো সে ছিল নিয়তির অনিবার্য দৃঢ় মুষ্টিতেই আবদ্ধ, স্বাধীন ইচ্ছামতো কাজ করছি ভাবলেও আসলে তখনো তাকে কাজ করতে হয়েছিল মৌমাছি-জীবনের জন্যই–অর্থাৎ ইতিহাসের তাগিদেই।
পশ্চিমের মানুষরা পুবে এল অন্য মানুষদের হত্যা করতে, আর সহ-অবস্থানের বিধানেই হাজার হাজার ছোট ছোট কারণ এসে তার সঙ্গে মিলে ঘটিয়ে তুলল এই যুদ্ধ : ইওরোপিয় নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা লংঘনের দরুন তিরস্কার, ওল্ডেনবুর্গের ডিউকের প্রতি অন্যায়, প্রুশিয়াতে সৈন্য চালনা-(নেপোলিয়নের মতো) যেটা করা হয়েছিল অস্ত্রের দ্বারা সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে,–জগণের প্রবণতার সঙ্গে ফরাসি সম্রাটের যুদ্ধপ্রীতি ও যুদ্ধের অভ্যাসের মিল ঘটে যাওয়া, সমরায়োজনের জাকজমকের প্রলোভন, তজ্জনিত ব্যয়বহুলতার ক্ষতিপূরণের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা লাভের প্রয়োজন, তজ্জনিত ব্যয়বহুলতার ক্ষতিপূরণের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা লাভের প্রয়োজন, ড্রেসডেন-এ প্রাপ্ত প্রভূত সম্মানের নেশা, সেইসব কূটনৈতিক আলোচনা সমকালীনদের মতো যা চালানো হয়েছিল শান্তি স্থাপনের আন্তরিক বাসনায়, কিন্তু আসলে যা উভয় পক্ষের আত্ম-রতিকেই আঘাত করেছিল,-এইসব এবং আরো লক্ষ লক্ষ কারণ একসঙ্গে মিলেমিশে এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছিল।
একটি আপেল যখন পেকে গাছ থেকে পড়ে, তখন সেটা নিচে পড়ে কেন? তার কারণ কি পৃথিবীর আকর্ষণ, না তার বোঁটাটা শুকিয়ে যাওয়া, না কি সূর্যের উত্তাপে রসহীন হওয়া, না কি সেটার ভার বেড়ে যাওয়া, না কি বাতাসের নাড়া খাওয়া, না কি গাছের নিচে দাঁড়ানো ছেলেটির ফল খাবার ইচ্ছা? কোনোটাই কারণ নয়। এইসবই সেইসব শর্তের একত্র সমাবেশ যার ফলে সব গুরুত্বপূর্ণ জৈব ও প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি ঘটে। যে উদ্ভিদবিজ্ঞানী মনে করে যে আপেলের কোষ-তন্তুগুলি নষ্ট হয়ে যাবার ফলেই আপেলটা মাটিতে পড়ে তার কথাও ঠিক, আবার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে যে ছেলেটি মনে করে যে সে আপেলটা খাবার ইচ্ছায় প্রার্থনা করেছে বলেই সেটা মাটিতে পড়েছে তার কথাও ঠিক। যে লোক বলে যে ইচ্ছা হয়েছিল বলেই নেপোলিয়ন মস্কো গিয়েছিল, আর যে লোক বলে যে লক্ষ লক্ষ টন ওজনের একটা গুপ্ত পাহাড় ধসে পড়েছে কারণ শেষ মজুরটি তার খন্তা দিয়ে সেটাকে শেষবারের মতো আঘাত করেছে–দুজনের কথাই সমান সত্য বা সমান ভুল। ঐতিহাসিক ঘটনার বেলায় তথাকথিত মহাপুরুষরা ঘটনার নামকরণের জন্য প্রয়োজনীয় লেবেলমাত্র, আর লেবেলের মতোই ঘটনাটির সঙ্গে তাদের যোগসূত্রটিও নামমাত্র।
