১৮১১ সালের শেষের দিক থেকেই পশ্চিম ইওরোপিয় বাহিনীর সমর-সজ্জা ও সেনাসমাবেশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে লাগল, ১৮১২ সালে সেই বাহিনী পশ্চিম থেকে পুবে রুশ সীমান্তের দিকে এগিয়ে গেল, অবশ্য ১৮১১ সাল থেকে রুশ বাহিনী আগে থেকেই সেখানে জমায়েত হয়েছিল। ১৮১২ সালের ১২ই জুন পশ্চিম ইওরোপিয় সেনাদল রুশ সীমান্ত অতিক্রম করল, শুরু হল যুদ্ধ, অর্থাৎ শুরু হল এমন একটি ঘটনা যা মানুষের বুদ্ধি ও স্বভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। লক্ষ লক্ষ মানুষ পরস্পরের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য অপরাধ, প্রবঞ্চনা, বিশ্বাসঘাতকতা, চৌর্যবৃত্তি, জালিয়াতি, নকল টাকার প্রচলন, সিধেলচুরি, অগ্নিকাণ্ড ও নরহত্যায় প্রবৃত্ত হল যার উল্লেখ একটা পুরো শতাব্দীকালে সারা জগতের আদালতের ইতিহাসেও মেলে না, অথচ সে কাজ যারা করেছে তারা সেইসময়ে তাকে অপরাধ বলেই গণ্য করে নি।
এই অসাধারণ ঘটনা কিসের ফলশ্রুতি? কি এর কারণ? ইতিহাসকাররা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে এর কারণ ওল্ডেনবুর্গের প্রতি কৃত অন্যায়, ইওরোপিয় নিষেধাজ্ঞাকে (contivental system) লংঘন, নেপোলিয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আলেক্সান্দারের দৃঢ়তা, কূটনীতিকদের ভ্রান্তি, ইত্যাদি।
অতএব মেটারনিস, রুমিয়ান্তসেভ অথবা ট্যালোন্ড যদি দরবার ও সান্ধ্য মজলিসের ফাঁকে একটু কষ্ট স্বীকার করে আরো খোলাখুলিভাবে একটা চিঠি লিখত অথবা নেপোলিয়ন যদি আলেক্সান্দারকে লিখত : শ্রদ্ধেয় ভাই আমার, ওন্ডেনবুর্গের ডিউককে তার জমিদারি ফিরিয়ে দিতে আমি রাজি,-তাহলেই আর যুদ্ধ হত না।
আমরা বুঝতে পারি যে সমসাময়িক লোকদের কাছে ব্যাপারটা এইরকমই মনে হয়েছিল। স্বভাবতই নেপোলিয়ন মনে করেছিল যে ইংলন্ডের ষড়যন্ত্রই এই যুদ্ধের কারণ (বস্তৃত সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেপোলিয়ন নিজেই এ কথা বলেছিল)। স্বভাবতই ইংলিশ পার্লামেন্টের সদস্যরা মনে করেছিল যে নেপোলিয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই এ যুদ্ধের কারন, ওল্ডেনবুর্গের ডিউক মনে করেছিল তার প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে তাই এ যুদ্ধের কারণ, ব্যবসায়ীদের মতে যে ইওরোপিয় নিষেধাজ্ঞা ইওরোপকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছিল সেটাই এ যুদ্ধের কারণ, সেনাপতি ও প্রধান সৈনিকদের মতে তাদের চাকরি দেবার প্রয়োজনই এ যুদ্ধের কারণ, তৎকালীন কূটনীতিকদের মতে, ১৮০৯ সালের রুশ-অস্ট্রিয়া মৈত্রীর সংবাদটি নেপোলিয়নের কাছ থেকে ভালোভাবে লুকিয়ে না রাখা, এবং ১৭৮নং স্মারকলিপির অদ্ভুত ভাষা এ যুদ্ধের কারণ। এটা খুবই স্বাভাবিক যে এইসব এবং আরো অসংখ্য ও সীমাহীন কারণ তৎকালীন মানুষের মনে দেখা দিয়েছিল, আমরা, উত্তরকালের মানুষরা যারা এই ঘটনাকে তার বিরাট পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে পাচ্ছি এবং তার ভয়ংকর তাৎপর্যকে পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পারছি, আমাদের কাছে কিন্তু এইসব কারণ মোটেই যথেষ্ট নয়। নেপোলিয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, বা আলেক্সান্দার কঠোর ছিল, অথবা ইংলন্ডের নীতি চাতুর্যপূর্ণ ছিল,-বা ওন্ডেনবুর্গের ডিউকের প্রতি অন্যায় করা হয়েছিল, তাই বলে লক্ষ লক্ষ খৃস্টভক্ত মানুষ পরস্পরকে হত্যা করল, নির্যাতন করল, একথাটা আমরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না। বাস্তবক্ষেত্রে যে নরহত্যা ও হিংসাত্মক ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছিল তার সঙ্গে এইসব ঘটনার কি সম্পর্ক থাকতে পারে সেটা আমাদের মাথায় আসে না : ডিউকের প্রতি অন্যায় করা হয়েছিল বলে ইওরোপের অপর প্রান্ত থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ কেন স্মালেনস্ক-এর অধিবাসীদের হত্যা করল, তাদের ধ্বংস করল এবং তাদের হাতে নিহত হল!
কিন্তু আমাদের মতো তাদের যেসব বংশধর ইতিহাসকরা নই এবং গবেষণার মনোভাবদ্বারা পরিচালিত নই বলে এই ঘটনাটিকে পরিচ্ছন্ন সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি, তাদের কাছে কিন্তু অগণিত কারণ আপনা থেকেই এসে হাজির হয়। সেইসব কারণ অনুসন্ধান করতে আমরা যত বেশি গভীরে প্রবেশ করি ততই তারা বেশি সংখ্যায় প্রকাশ পায, এবং আমাদের কাছে প্রতিটি স্বতন্ত্র কারণ অথবা গোটা কারণ-সমষ্টিকেই মনে হয় সমানভাবে যথার্থ ও ঘটনাবলীর বিরাটত্বের বিচারে সমানভাবে মিথ্যা, এতবড় ঘটনাপ্রবাহকে ঘটাবার পক্ষে একান্তই অনুপযুক্ত। আমাদের কাছে অমুক বা তমুক ফরাসি কর্পোরালের দ্বিতীয়বার চাকরি নেবার ইচ্ছা বা অনিচ্ছা যেমন কারণ বলে গণ্য হতে পারে, তেমনই নেপোলিয়ন কর্তৃক ভিলার ওপারে তার সৈন্য সরিয়ে নেওয়া এবং ওল্ডেনবুর্গের জমিদারি ফিরিয়ে দেওয়ার অনিচ্ছাও কারণ বলে গণ্য হতে পারে, কারণ সে যদি যুদ্ধে যোগ দিতে না চাইত, এবং দ্বিতীয়, তৃতীয় ও সহস্রতম কর্পোরাল ও সৈনিকও যদি আপত্তি জানাত, তাহলে নেপোলিয়নের বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা অনেক কমে যেত এবং তার ফলে যুদ্ধই হত না।
নেপোলিয়নকে ভিক্ষুলার ওপারে সৈন্য সরিয়ে নিতে হবে এই দাবি শুনে সে যদি অসন্তুষ্ট না হাত এবং সৈন্যদের অগ্রসর হবার হুকুম না দিত, তাহলেও যুদ্ধ হত না, আবার তার সব সার্জেন্টরা যদি দ্বিতীয়বার যুদ্ধে যোগ দিতে আপত্তি জানাত তাহলেও যুদ্ধটা না ঘটতে পারত। অথবা যদি ইংরেজরা ষড়যন্ত্র না করত, রাশিয়াতে যদি স্বৈরতন্ত্রী শাসন-ব্যবস্থা না থাকত, অথবা ফ্রান্সে যদি বিপ্লব না ঘটত, পরবর্তীকালে একনায়কত্ব ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত না হত, অথবা ফরাসি বিপ্লবের অনুকূল কোনো পরিস্থিতিই দেখা না দিত,-তাহলেও তো যুদ্ধই হত না। এদের প্রতিটি কারণের অনুপস্থিতি ঘটলে কিছুই ঘটত না। কাজেই এইসব কারণ লক্ষ লক্ষ কারণ-এক মিলিত হয়েই যুদ্ধটা ঘটিয়েছে। কাজেই কোনো একটি কারণে এ যুদ্ধ হয় নি, কিন্তু যুদ্ধটা ঘটতে বাধ্য বলেই ঘটেছে। ঠিক যেভাবে কয়েক শতাব্দী আগে দলে দলে তোক পূর্ব থেকে পশ্চিমে এসে মানুষকে হত্যা করেছিল, সেইভাবেই এবারও লক্ষ লক্ষ মানুষ মানবিক অনুভূতি ও বিচারবুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে মানুষ খুন করতে এসেছিল পশ্চিম থেকে পূর্বে।
