বলল, কাউন্ট পিতর কিরিলোভিচের সঙ্গে দেখা করার জন্য নাতাশা পীড়াপীড়ি করছে।
কিন্তু তা কি করে হয়? ওকে কি করে তার কাছে নিয়ে যাব? ঘরটা যে এখনো পরিষ্কার করা হয় নি।
সোনিয়া বলল, না, সে পোশাক বদলে বসার ঘরে চলে গেছে।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা শুধু কাঁধ ঝাঁকুনি দিল।
ওর মা যে কবে আসবেন! আমাকে তো জ্বালিয়ে মারছে! পিয়েরকে বলল, দেখুন, ওকে যেন সব কথা বলবেন না! ওকে দেখলে বড়ই করুণা হয়, ওকে বকুনি দিতেও মন সায় দেয় না।
নাতাশা ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক শুকিয়ে গেছে, মুখটা কঠিন, বিবর্ণ, কিন্তু পিয়ের যেরকম আশা করেছিল মোটেই সেরকম লজ্জায় সংকুচিত নয়।
পিয়েরই তার দিকে এগিয়ে গেল। ভাবল, নাতাশা যথারীতি হাতটা এগিয়ে দেবে, কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই সে থামল, দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল, দুটো হাত মড়ার মতো দুই পাশে ঝুলে পড়ল।
তারপর তাড়াতাড়ি বলতে লাগল, পিতর কিরিলোভিচ, প্রিন্স বলকনস্কি আপনার বন্ধু ছিলেন-বন্ধু আছেন। একসময় সে আমাকে বলেছিল আপনাকে…
তার দিকে তাকিয়ে পিয়ের নাকটা টানল, কিন্তু কোনো কথা বলল না। তখনো পর্যন্ত তার মনে ছিল নাতাশার প্রতি তিরস্কার, সে চেষ্টা করেছে তাকে ঘৃণা করতে, কিন্তু এইমুহূর্তে নাতাশার জন্য সে এত বেশি দুঃখ বোধ করল যে তাকে তিরস্কার করার মনই রইল না।
সে তো এখন এখানেই আছে, তাকে বলবেন…মানে…আমাকে যেন ক্ষমা করে!
কি যে বলবে পিয়েরের মাথায় এল না।
নাতাশা তাড়াতাড়ি বলতে লাগল, না, আমি জানি সব শেষ হয়ে গেছে। শুধু তার প্রতি যে অন্যায় করেছি সেই যন্ত্রণাই আমাকে দগ্ধ করছে। তাকে বলবেন, তার কাছে আমার একটি ভিক্ষা, সে যেন সবকিছুর জন্য আমাকে ক্ষমা করে, ক্ষমা করে, ক্ষমা করে…
নাতাশার সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল। সে একটা চেয়ারে বসে পড়ল।
একটা অজ্ঞাতপূর্ব করুণায় পিয়েরের অন্তর উসিত হয়ে উঠল।
বলল, বলব, সব কথাই তাকে আর একবার বলব। কিন্তু…একটা কথা আমি জানতে চাই…
কি জানতে চান? নাতাশার চোখে জিজ্ঞাসা ফুটে উঠল।
আমি জানতে চাই আপনি কি ভালোবাসতেন সেই… পিয়ের বুঝতে পারছে না আনাতোলের কথাটা কীভাবে তুলবে, তার কথা মনে হতেই পিয়েরের মুখ লাল হয়ে উঠেছে-আপনি কি ভালোবাসতেন সেই খারাপ লোকটিকে?
নাতাশা বলল, তাকে খারাপ লোক বলবেন না! কিন্তু আমি জানি না, কিছুই জানি না…
নাতাশা কেঁদে ফেলল, আর করুণা, মমতা ও ভালোবাসার অনুভূতি যেন পিয়েরের অন্তরে আরো বেশি করে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল তার চশমার নিচ দিয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে, তবু আশা করল যে তা কারো নজরে পড়বে না।
এ নিয়ে আমরা আর কোনো কথা বলব না, পিয়ের বলল, তার দরদী, নরম কণ্ঠস্বর সহসা নাতাশার কাছে অদ্ভুত ঠেকল।
এ নিয়ে আমরা আর কথা বলব না–তাকে সব কথাই বলব, কিন্তু আপনার কাছে আমার একটা মিনতি, আমাকে বন্ধু বলেই মনে করবেন, যদি কোনো সাহায্য বা পরামর্শ চান, যদি কারো কাছে মনের কথা খুলে বলতে চান–এখন নয়, পরে যখন আপনার মন পরিষ্কার হবে–তখন আমার কথা মনে করবেন! নাতাশার হাতখানি টেনে নিয়ে সে তাতে চুমো খেল। আমার ক্ষমতায় যদি কোনো কিছু করা সম্ভব হয় তাহলে খুশি হব।
ওভাবে কথা বলবেন না, আমি তার উপযুক্ত নই! বলেই নাতাশা ঘর থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়াল, কিন্তু পিয়ের তার হাতটা ধরে ফেলল।
সে জানত তার আরো কিছু বলার আছে। কিন্তু সেকথা যখন বলা হল তখন নিজের কথায় সে নিজেই। অবাক হয়ে গেল।
পিয়ের নাতাশাকে বলল, দাঁড়ান, দাঁড়ান! সারাটা জীবন আপনার সামনে পড়ে আছে।
আমার সামনে? না! আমার সব শেষ হয়ে গেছে, লজ্জা ও আত্মধিক্কারের সুরে সে বলল।
সব শেষ? পিয়ের কথাটার পুনরাবৃত্তি করল। আমি যদি এই আমি না হতাম, যদি হতাশ পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর, বুদ্ধিমান ও শ্রেষ্ঠ মানুষ, যদি আমার স্বাধীনতা থাকত, তাহলে এইমুহূর্তে আমি নতজানু হয়ে আপনার হাত ও আপনার ভালোবাসা প্রার্থনা করতাম!
অনেকদিন পরে এই প্রথম নাতাশার দুই চোখ বেয়ে কৃতজ্ঞতা ও মমতার ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল, পিয়েরের দিকে তাকিয়ে সে ঘর থেকে চলে গেল।
সে চলে যাওয়ামাত্রই পিয়েরও ছুটে পাশের ঘরে চলে গেল, মমতা ও আনন্দের উদগত অশ্রুতে কোনোরকমে সংযত করল, এবং জোব্বার আস্তিন খুঁজে না পেয়ে সেটাকে কাঁধের উপর ফেলেই স্লেজে উঠে পড়ল।
কোচয়ান জানতে চাইল, এবার কোথায় যাব ইয়োর এক্সেলেন্সি?
পিয়ের নিজেকে শুধাল, কোথায় যাব? এখন কোথায় যেতে পারি? নিশ্চয়ই ক্লাবে যাব না, কারো সঙ্গে দেখা করতেও নয়? মমতা ও ভালোবাসার যে অভিজ্ঞতা তার হয়েছে, চোখের জলের ভিতর দিয়ে নাতাশা যে নরম, মমতাময় শেষ দৃষ্টি তাকে উপহার দিয়েছে, তার সঙ্গে তুলনায় সব মানুষকেই এখন করুণার পাত্র বলে মনে হচ্ছে।
বাড়ি! পিয়ের জবাব দিল, তারপর দশ ডিগ্রি তুষারপাত সত্ত্বেও চওড়া বুকের উপর থেকে ভালোকের চামড়ার জোব্বাটা সরিয়ে সানন্দে খোলা বাতাসে শ্বাস টানতে লাগল।
আবহাওয়া পরিষ্কার, তুষার পড়ছে। স্বল্পালোকিত নোংরা রাস্তার আর কালো কালো ছাদের উপরে অন্ধকার তারকাখচিত আকাশ বহুদূরে প্রসারিত। এইমাত্র তার আত্মা যে ঊর্ধ্বলোকে বিচরণ করছে তার সঙ্গে তুলনায় পার্থিব সবকিছু কত নিচ ও তুচ্ছ-এই চিন্তাই এতক্ষণ পিয়েরকে পেয়ে বসেছিল, এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে সে অনুভূতি তার মন থেকে দূর হয়ে গেল। আবাত স্কোয়ারে ঢোকার মুখে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত একটা অন্ধকার তারকাখচিত আকাশ তার সামনে দেখা দিল। ঠিক তার মাঝখানে, প্রেশিস্তেংকা বুলভার্দের উপরে, চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তারাদলের ভিতরে থেকেও পৃথিবীর নৈকট্য, তার সাদা আলো ও দীর্ঘ ঊর্ধ্বায়িত পুচ্ছের দরুন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সম্পূর্ণ পৃথক ১৮১২ সালের প্রকাণ্ড ও উজ্জ্বল ধূমকেতুটি জ্বলজ্বল করছে–সকলেই বলেছে, এই ধূমকেতুটি সবরকম দুঃখ-দুর্দশা ও পৃথিবীর ধ্বংসের ইঙ্গিত বহন করে এনেছে। কিন্তু দীর্ঘ উজ্জ্বল পুচ্ছসমন্বিত এই ধূমকেতুটি পিয়েরের মনে কোনো ভয়ের অনুভূতি জাগাল না। বরং এই উজ্জ্বল ধূমকেতুটির দিকে সে আনন্দের সঙ্গে অশ্রুজলে ভেজা চোখে তাকিয়ে রইল : ধারণার অতীত দ্রুতগতিতে অপরিমেয় মহাশূন্যের ভিতর দিয়ে স্বীয় কক্ষপতে চলতে চলতে এই মুহূর্তে সহসা ধূমকেতুটিকে মনে হচ্ছে–পৃথিবীবিদ্ধকারী একটা তীরের মতো–সে যেন একটা বিশেষ স্থানে এসে স্থির হয়ে গেছে, অসংখ্য ঝিকিমিকি তারাদলের মাঝখানে স্বীয় পুচ্ছটিকে সবেগে উচ্চে তুলে তার সাদা আলোর শিখাগুলিকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। পিয়েরের মনে হল, তার নিজের দয়ার্দ্র উৰ্বায়িত যে আত্মা এখন একটা নতুন জীবনের মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে, এই ধূমকেতু যেন তারই পরিপূর্ণ প্রতিধ্বনি।
০৯. ইওরোপিয় বাহিনীর সমর-সজ্জা
নবম পর্ব – অধ্যায়-১
