কাউন্টেসের দুই চোখ জলে ভরে গেল। সে নীরবে ভাবতে লাগল।
প্রিন্সেস বলল, আমি প্রায়ই ভাবি, যদিও হয়তো এ কথা ভাবা পাপ, এই তো কাউন্ট সিরিল ভ্রাদিমিরভিচ একেবারে একা থাকেন…তিনি এত ধনী…প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী…অথচ তার এ জীবনের কী দাম? এ তো তাঁর কাছে একটা বোঝা, আর বরি সবে তার জীবন শুরু করতে চলেছে…
নিশ্চয়ই তিনি বরিসের জন্য কিছু রেখে যাবেন, কাউন্টেস বলল।
একমাত্র ঈশ্বরই জানেন ভাই। এই ধনী বুড়োরা বড়ই স্বার্থপর হয়। তবু বরিসকে নিয়ে এখনই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাব, আর সোজাসুজি কথাটা তাকে বলব। লোকে আমাকে যা বলে বলুক, আমার ছেলের ভাগ্য যখন বিপন্ন তখন আমার কাছে সবই সমান। প্রিন্সেস উঠে পড়ল। এখন দুটো বাজে। তুমি খাবার খাও চারটেয়। তোমার সময় হয়ে গেছে।
পিটার্সবুর্গের বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন মহিলারা সময়ের সদ্ব্যবহার করতে জানে; তাদের মতোই আন্না মিখায়লভনা একজনকে পাঠিয়ে দিল ছেলেকে ডেকে আনতে এবং তাকে নিয়ে সামনের ঘরে গেল।
কাউন্টেস তাদের বিদায় দিতে দরজা পর্যন্ত গেল। ছেলে যাতে শুনতে না পায় এমনভাবে ফিসফিস করে আন্না মিখায়লভনা বলল, বিদায় ভাই, আমার সৌভাগ্য কামনা করো।
খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের ঘরে এসে কাউন্ট বলল, আপনি কি কাউন্ট সিরিল ম্লাদিমিরভিচের কাছে যাচ্ছেন? তাঁর শরীর ভালো থাকলে পিয়েরকে বলবেন, সে যেন আমাদের সঙ্গে খাবার খায়। আপনি তো জানেন, সে এ বাড়িতে এসে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নেচেছে। তাকে অবশ্য আমন্ত্রণ জানাবেন। আমরা দেখতে চাই তারাস কেমন করে আজ সুনাম রাখে। সে বলে, আমাদের মতো ডিনার কাউন্ট অর্লভ কখনো দিতে পারে নি।
*
অধ্যায়-১৫
প্রিন্সেস আন্না মিখায়লভনা ও তার ছেলেকে নিয়ে কাউন্টেস রস্তভার গাড়ি খড়-বিছানো রাস্তা ধরে চলতে– চলতে কাউন্ট সিরিল স্লাদিমিরভিচ বেজুকভের বাড়ির প্রকাণ্ড উঠোনে ঢুকলে প্রিন্সেস তার পুরোনো দিলে জামার ভিতর থেকে হাতটা বের করে আদর করে ছেলের কাদের উপর রেখে বলল, বাবা বরিস, তাকে ভক্তি করো। কাউন্ট সিরিল ভাদিমিরভিচ তোমার ধর্মবাপ; তার উপরেই তোমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এই কথাটা মনে রেখে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো; আর ভালো ব্যবহার করতে তো তুমি ভালোই জান।
ছেলে নির্বিকার গলায় বলল, তার ফলে অপমান ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে এমন ভরসা থাকলেও না হয় কথা ছিল…। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিয়েছি, তাই তোমার জন্যই সে কথা আমি রাখব।
একটা গাড়ি ফটকে দাঁড়িয়ে আছে দেখেও হলের দরোয়ান মা ও ছেলেকে ভালো করে লক্ষ্য করে, বিশেষ করে মহিলাটির পুরোনো ঢিলে জামাটার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চাইল তারা কাউন্ট অথবা প্রিন্সেস কার সঙ্গে দেখা করতে চায় এবং যখন শুনল যে তারা কাউন্টের সঙ্গে দেখা করতে চায় তখন বলে দিল যে হিস এক্সেলেন্সির শরীর আজ আরো খারাপ এবং তিনি কারো সঙ্গে দেখা করবেন না।
আমাদের ফিরে যাওয়াই ভালো, ছেলে ফরাসিতে বলল।
ছেলেকে শান্ত করার জন্য তার কাঁধের উপর হাতটা রেখে মা অনুনয় করে ডাকল, বাবা আমার!
বরিস আর কোনো কথা বলল না, কিন্তু জোব্বাটা না খুলেই সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মার দিকে তাকাল।
আন্না মিখায়লভনা নরম গলায় দরোয়ানকে বলল, দেখ ভাই, আমি জানি যে কাউন্ট সিরিল ভাদিমিরভিচ খুব অসুস্থ…সেজন্যই আমি এসেছি…আমি তাঁর আত্মীয়া। তাকে আমি বিরক্ত করব না ভাই…আমি শুধু প্রিন্স ভাসিলি সের্গেভিচের সঙ্গে দেখা করতে চাই : তিনি তো এখানেই আছেন, তাই না? তুমি আমার কথা বল।
দরোয়ান ঘন্টাটা টেনে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল; সেটা দোতলায় বেজে উঠল।
সরু ব্রিচেস, জুতো ও চাতক-পাখি-মার্কা কোট-পরা পরিচারক সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে মাঝপথে দাঁড়িয়ে নিচে তাকাতেই দরোয়ান হাক দিল, প্রিন্সেস বেস্কায়া প্রিন্স ভাসিলি সের্গেভিচের সঙ্গে দেখা করতে চান।
দেয়ালের মস্ত বড় ভেনিসিয় আয়নায় নিজের রং-করা পশমী পোশাকের ভাজ ঠিক করে নিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া জুতো পায়ে মা কার্পেটে-মোড়া সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উঠতে লাগল।
ছেলের কাঁধে হাত রেখে তার মনে জোর আনবার চেষ্টায় মা আবার বলল, তুমি আমাকে কথা দিয়েছ বাবা!
চোখ নিচু করে ছেলে নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করে চলল।
একটা বড় হল-ঘরে তারা ঢুকল; সেই হলের একটা দরজা দিয়ে প্রিন্স ভাসিলির ঘরে যেতে হয়।
হলের মাঝখানে পৌঁছে মা ও ছেলে একজন বয়স্ক পরিচারককে সবে জিজ্ঞাসা করতে যাবে তারা কোন পথে এগোবে এমন সময় একটা দরজার ব্রোঞ্জের হাতল ঘুরিয়ে বেরিয়ে এল প্রিন্স ভাসিলি-তার বুকের উপর একটি তারা বসানো ভেলভেটের কোট; বাড়িতে এই পোশাক পরাই তার রীতি; প্রিন্স ভাসিলির সঙ্গে একজন সুদর্শন লোক, তার মাথাভর্তি চুল। পিটার্সবুর্গের বিখ্যাত ডাক্তার লোরেন।
প্রিন্স বলল, তাহলে এটাই নিশ্চিত?
প্রিন্স, মানুষ মাত্রেরই ভুল হয়, কিন্তু… ডাক্তার ফরাসি উচ্চারণে লাতিন ভাষায় জবাব দিল।
খুব ভালো, খুব ভালো…।
আন্না মিখায়লভনা ও তার ছেলেকে দেখে প্রিন্স ভাসিলি মাথা নুইয়ে ডাক্তারকে বিদায় দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে নীরবে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। ছেলে লক্ষ্য করল, হঠাৎ তার মার মুখের উপর গভীর দুঃখের একটা ছায়া নেমে এল। সে ঈষৎ হাসল।
