পোলিশ সীমান্তের খারাপ রাস্তা, সুইজারল্যান্ডে পিয়েরের পরিচিত যাদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে ও মঁসিয় দেসাল্লে যাকে সে ছেলের গৃহশিক্ষকরূপে বিদেশ থেকে নিয়ে এসেছে-এইসব বিষয় পিয়েরের সঙ্গে অল্প কয়েকটি কথা বলেই আবার সে স্পেরানস্কি-প্রসঙ্গের আলোচনায় সাগ্রহে যোগ দিল।
সে বলতে লাগল, যদি রাজদ্রোহ থেকে থাকে, নেপোলিয়নের সঙ্গে গোপন সম্পর্কের কোনো প্রমাণ যদি থাকে, তাহলে সেগুলো সাধারণের কাছে প্রকাশ করা উচিত ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি স্পেরানস্কিকে পছন্দ করি না, কখনো করতাম না, কিন্তু আমি চাই ন্যায়বিচার!
এতক্ষণে পিয়ের বন্ধুর একটি অতি পরিচিত প্রয়োজনের কথা বুঝতে পারল : তার মনের মধ্যে অতিশয় যন্ত্রণাদায়ক যে চিন্তাগুলি ঘোরাফেরা করছে তাদের চাপা দেবার জন্য বাইরের ব্যাপার নিয়ে উত্তেজিত আলোচনায় মেতে থাকা তার পক্ষে এখন বড় দরকারি।
প্রিন্স মেশচেরেস্কি চলে যাবার পরে প্রিন্স আন্দ্রু পিয়েরের হাত ধরে তাকে নিজের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটাকে নিয়ে গেল। সেখানে একটা বিছানা পাতা হয়েছে, আর আছে কয়েকটা ভোলা পোর্টমেন্টো। তারই একটার ভিতর থেকে একটা বাক্স বের করে তার ভিতর থেকে প্রিন্স আন্দ্রু কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট তুলে নিল। নিঃশব্দে বেশ তাড়াতাড়ি কাজটা করল। উঠে দাঁড়িয়ে একটু কাশল। তার মুখটা বিষণ্ণ, ঠোঁট দুটি চাপা।
তোমাকে কষ্ট দেবার জন্য আমাকে ক্ষমা কর…
পিয়ের বুঝল প্রিন্স আন্দ্রু এবার নাতাশার প্রসঙ্গ তুলবে, তার মুখে করুণা ও সহানুভূতির চিহ্ন ফুটে উঠল। তা দেখে প্রিন্স আন্দ্রু বিরক্ত হল, কঠিন, কর্কশ, অপ্রীতিকর স্বরে সে বলতে লাগল :
কাউন্টেস রস্তভার কাছ থেকে আমি একটা চিঠি পেয়েছি, তাতে সে আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, আর তোমার শ্যালক যে তার পাণিপ্রার্থনা করেছে বা ঐরকম একটাকিছু ঘটেছে তার বিবরণও আমি শুনেছি। কথাগুলি কি সত্য?
সত্যও বটে, অসত্যও বটে, পিয়ের বলা শুরু করতেই প্রিন্স তাকে বাধা দিল।
এই তার সব চিঠি ও একটা প্রতিশ্রুতি, সে বলল।
টেবিল থেকে প্যাকেটটা তুলে পিয়েরের হাতে দিল।
এটা কাউন্টেসকে দিও…যদি তার সঙ্গে তোমার দেখা হয়।
সে খুব অসুস্থ, পিয়ের বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, তাহলে সে কি এখনো এখানেই আছে? সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল, আর প্রিন্স কুরাগিন?
কুরাগিন অনেক আগেই চলে গেছে। কাউন্টেস তো যমের দুয়ার পর্যন্ত গিয়েছিল।
তার অসুস্থতার জন্য আমি দুঃখিত, বলে প্রিন্স আন্দ্রু তার বাবার মতোই নিরাসক্ত, বিদ্বেষপূর্ণ হাসি হাসল।
তাহলে মঁসিয় কুরাগিন কাউন্টেস রস্তভার পাণিগ্রহণ করে তাকে সম্মানিত করেননি বলে প্রিন্স আন্দ্রু বারকয়েক নাক ঝাড়ল।
পিয়ের বলল, সে বিয়ে করতে পারে নি, কারণ আগেই তার বিয়ে হয়েছে।
প্রিন্স আন্দ্রু পুনরায় এমনভাবে হেসে উঠল যাতে তার বাবার কথাই মনে পড়ে যায়।
তোমার শ্যালকটি এখন কোথায় আছে জিজ্ঞাসা করতে পারি কি? সে বলল।
সে চলে গেছে পিটার্স…কিন্তু আমি ঠিক জানি না, পিয়ের বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, ঠিক আছে, তাতে কিছু যায়-আসে না। কাউন্টেস রস্তভাকে বলে দিও, সে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল এবং আছে, আর আমি তার কল্যাণই চাই।
বিয়ের প্যাকেটটা নিল। আরো কিছু বলবার আছে কি না স্মরণ করতে চেষ্টা করে প্রিন্স আন্দ্রু তার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
পিয়ের বলল, আমি বলি কি, পিটার্সবুর্গে আমাদের যে আলোচনা হয়েছিল তা কি তোমার মনে আছে?
প্রিন্স আন্দ্রু অতি জবাব দিল, হা, আমি বলেছিলাম পতিতা মেয়েমানুষকে ক্ষমা করা উচিত, কিন্তু ওকে ক্ষমা করতে পারব একথা তো বলিনি। আর পারবও না।
পিয়ের বলল, কিন্তু এ তুলনা করা কি চলে?… ।
প্রিন্স আন্দ্রু তাকে বাধা দিয়ে চিৎকার করে বলল :
হ্যাঁ, আবার তার পাণিপ্রার্থনা করি, উদারতা দেখাই, এই তো?…হা, সেটা খুবই মহান ব্যাপার হত, কিন্তু সেই ভদ্রলোকের পদাংক অনুসরণ করতে আমি পারব না। যদি আমার বন্ধুত্ব চাও তো আর কখনো একথা আমাকে বলো না…কোনও কথা নয়! আচ্ছা, বিদায়। তাহলে প্যাকেটটা তাকে দিচ্ছ?
ঘর থেকে বেরিয়ে পিয়ের বুড়ো প্রিন্স ও প্রিন্সেস মারির কাছে গেল।
বুড়ো মানুষটিকে আগের চাইতে হাসিখুশি মনে হল। প্রিন্সেস মারি সর্বদাই একরকম, তবু দাদার প্রতি সহানুভূতির অন্তরালে পিয়েরের নজরে পড়ল যে এই বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় সে খুশিই হয়েছে। তাদের দিকে তাকিয়ে পিয়ের বুঝতে পারল, রস্তদের প্রতি তাদের সকলের মনেই কী ঘৃণা ও বিরূপতা বাসা বেঁধেছে। সে আরো বুঝতে পারল, যে মেয়ে অন্য কারো জন্য প্রিন্স আন্দ্রুকে ত্যাগ করতে পারে এদের সামনে তার নাম। উচ্চারণ করাও অসম্ভব।
ডিনারের সময় আসন্ন যুদ্ধ নিয়েই আলোচনা চলল। প্রিন্স আন্দ্রু অনবরত কথা বলতে লাগল, কখনো বাবার সঙ্গে তর্ক করছে, কখনো বা সুইস শিক্ষক দেল্পের সঙ্গে, তার সব কথাতেই একটা অস্বাভাবিক উত্তেজনার প্রকাশ, আর তার কারণটা পিয়ের খুব ভালোই জানে।
.
অধ্যায়-২২
তার উপর যে কাজের ভার দেওয়া হয়েছে সেটা শেষ করার জন্য সেদিন সন্ধ্যায়ই পিয়ের রস্তভদের বাড়িতে গেল। নাতাশা বিছানায় শুয়ে, কাউন্ট ক্লাবে গেছে, চিঠিগুলো সোনিয়াকে দিয়ে পিয়ের মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার কাছে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু খবরটাকে কীভাবে নিয়েছে সেটা জানতে সে খুবই আগ্রহী। দশ মিনিট পরে সোনিয়া মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার কাছে এল।
