আনাতোল হাসল। সেই নিচ, তোষামুদে হাসি স্ত্রীর কল্যাণে যা পিয়ের খুব ভালোই চেনে, সে হাসি দেখে পিয়ের ক্ষেপে গেল।
আঃ, নিচ, হৃদয়হীন পশু! আর্তকণ্ঠে কথাটা বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন আনাতোল পিটার্সবুর্গ যাত্রা করল।
.
অধ্যায়-২১
পিয়ের মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার বাড়িতে গেল তাকে খবর দিতে যে তার মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে, আনাতোলর মস্কো থেকে নির্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সমস্ত বাড়িটা আতংকে ও উত্তেজনায় থমথম করছে। নাতাশা খুবই অসুস্থ, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তাকে গোপনে জানাল, আনাতোল যে বিবাহিত এ খবর জানবার পরে সেইরাতেই নাতাশা গোপনে আর্সেনিক সংগ্রহ করে সেই বিষ খেয়েছিল। কিছুটা খেয়েই সে খুব ভয় পেয়ে যায় এবং সোনিয়াকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে সবকথা খুলে বলে। যথাসময়ে প্রয়োজনীয় প্রতিষেধকের ব্যবস্থা করায় বিপদ কেটে গেলেও এখন সে এত দুর্বল যে তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, আর তাই কাউন্টেসকে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠানো হয়েছে। বিপর্যস্ত কাউন্ট ও সোনিয়ার সঙ্গেও পিয়েরের দেখা হল, তখনো তাদের মুখে চোখের জলের দাগ লেগে আছে, কিন্তু সে নাতাশার সঙ্গে দেখা করতে পারল না।
সেদিন পিয়ের ক্লাবেই ডিনার খেল। সেখানে সর্বত্রই রস্তভার অপহরণের গুজব শোনা গেল। সে অবশ্য গুজবের তীব্র প্রতিবাদ করে প্রত্যেককে জানিয়ে দিল যে, তার শ্যালক নাতাশার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু তা গৃহীত হয় নি। এর বেশি কিছুই ঘটেনি। পিয়েরের মনে হল, সমস্ত ব্যাপারটা চাপা দিয়ে নাতাশার সুনামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা তার কর্তব্য।
সে অত্যন্ত ভয়ের সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রুর আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল, তার খবরের জন্য প্রতিদিনই একবার করে বুড়ো প্রিন্সের কাছে যেতে লাগল।
বুড়ো প্রিন্স বলকনস্কি শহরে প্রচারিত সব গুজবই মাদময়জেল বুরিয়ের কাছ থেকে শুনতে পেল, প্রিন্সেস মারির কাছে লেখা যে চিঠিতে নাতাশা বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে সেটাও সে পড়েছে। এতে তার মন-মেজাজ বেশ খুশি হয়ে উঠল, গভীর অধৈর্যের সঙ্গে সে ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
আনাতোল চলে যাবার কয়েকদিন পরে পিয়ের প্রিন্স আন্দ্রুর একটা চিঠি পেল, তাতে নিজের যাবার কথা জানিয়ে তাকে দেখা করতে বলেছে।
প্রিন্স আন্দ্রু মস্কোতে পৌঁছনোমাত্রই বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে দিয়ে নাতাশা প্রিন্সেস মারিকে যে চিঠিটা লিখেছিল সেই চিঠি বাবা তার হাতে তুলে দিল (মাদময়জেল বুরিয়ে প্রিন্সেস মারির কাছ থেকে চিঠিটা চুরি করে বুড়ো প্রিন্সকে এনে দিয়েছিল এবং কিছু ডালপালা ছড়িয়ে নাতাশার অপহরণের কাহিনীও তাকে শুনিয়ে দিল।
প্রিন্স আন্দ্রু পৌঁছল সন্ধ্যায়, আর পিয়ের তার সঙ্গে দেখা করতে এল পরদিন সকালে। বসার ঘরে ঢুকেই সে শুনতে পেল প্রিন্স আন্দ্রু পড়ার ঘরে উত্তেজিত চড়া গলায় পিটার্সবুর্গের কোনো ষড়যন্ত্র নিয়ে কথা বলছে। বুড়ো প্রিন্সের গলা এবং অপর একজনের গলা মাঝে মাঝেই তাকে বাধা দিচ্ছে। প্রিন্সেস মারি পিয়েরের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে এল। যে ঘরে প্রিন্সেস আন্দ্রু ছিল তার দরজার দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মুখ দেখেই পিয়ের বুঝতে পারল, যা ঘটেছে তা নিয়ে এবং নাতাশার বিশ্বাসহীনতার সংবাদটাকে তার দাদা যেভাবে নিয়েছে তা নিয়েও সে যেন বেশ খুশিই হয়েছে।
প্রিন্সেস মারি বলল, দাদা বলেছে সে এইরকমই আশা করেছিল। আমি জানি, আত্মগর্বই তাকে তার মনের আসল কথা প্রকাশ করতে দেবে না, তু সে যেরকম ভালোভাবে খবরটাকে নিয়েছে ততটা আমি আশা করিনি। স্পষ্টতই এই রকমটাই ঘটার কথা…।
কিন্তু এও কি সম্ভব যে সবকিছু সত্যি শেষ হয়ে গেছে পিয়ের প্রশ্ন করল।
প্রিন্সেস মারি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। এরকম একটা প্রশ্ন যে পিয়ের কেমন করে করল তাই সে বুঝতে পারে নি। পিয়ের পড়ার ঘরে ঢুকল। প্রিন্স আন্দ্রু অনেক বদলে গেছে। স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে, কিন্তু দুই ভুরুর মাঝখানে একটা সমান্তরাল ভাঁজ পড়েছে। অসামরিক পোশাকে সে তার বাবা ও প্রিন্স মেশচেরেস্কির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আলোচনা চলছিল স্পেনষ্কিকে নিয়ে-তার আকস্মিক নির্বাসন এবং রাজদ্রোহের অভিযোগের সংবাদ সবেমাত্র মস্কোতে পৌঁছেছে।
প্রিন্স আন্দ্রু বলছে, একমাস আগেও তাকে নিয়ে যারা নাচানাচি করছিল তারাই আজ তার নিন্দা করছে, তাকে অভিযুক্ত করছে। অনুগ্রহবঞ্চিত কোনো লোককে বিচার করা এবং অন্য লোকের ভুলের সব দোষ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াটা খুব সোজা, কিন্তু আমি বলতে চাই যে এই শাসনকালে যদি কোনো ভালো কাজ হয়ে থাকে তো সেটা তিনিই করেছেন–আর কেউ নয়।
পিয়েরকে দেখে সে থামল। তার মুখটা কেঁপে উঠল, সেখানে একটা প্রতিহিংসার ভাব দেখা দিল।
উত্তরপুরুষ তার প্রতি ন্যায়বিচার করবে, এই বলে বক্তব্য শেষ করে সে সঙ্গে সঙ্গে পিয়েরের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
আরে, কেমন আছ? আরো মোটাসোটা হয়েছ দেখছি? চটপট কথাগুলি বললেও তার কপালের নতুন ভাঁজটা গভীরতর হল। হ্যাঁ, আমি ভালো আছি, পিয়েরের প্রশ্নের উত্তরে কথাটা বলে সে হাসল।
পিয়েরের মনে হল সে হাসি যেন স্পষ্ট করে বলছে : আমি ভালো আছি, কিন্তু আমার স্বাস্থ্য তো এখন আর কারো কোনো কাজে লাগবে না।
