সেদিন আনাতোল ডিনার খেল দলখভের সঙ্গে। এই দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপারটা কি প্রতিকার করা যায় তাই নিয়ে আলোচনা করল। তার মনে হল, নাতাশার সঙ্গে একবার দেখা করা একান্ত দরকার। সন্ধ্যায় সে বোনের কাছে গেল, নাতাশার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে। সারা মস্কোতে ফুঁ মেরে পিয়ের যখন বাড়ি ফিরল তখন খানসামা খবর দিল, প্রিন্স আন্দ্রুনাতোল কাউন্টেসের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। কাউন্টেসের বসার ঘর তখন অতিথিতে ভর্তি।
ফিরে আসার পর থেকে স্ত্রীর সঙ্গে তার দেখাই হয় নি। এখনো তার সঙ্গে দেখা না করেই সে বসার ঘরে ঢুকল এবং আনাতোলকে দেখতে পেয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল।
স্বামীর কাছে এগিয়ে এসে কাউন্টেস বলল, আরে, পিয়ের, তুমি তো জান না আমাদের আনাতোলের কি অবস্থা…
পিয়ের স্ত্রীকে বলল, যেখানে তুমি সেখানেই অধর্ম ও পাপ! তারপর ফরাসিতে আনাতোলকে বলল, আনাতোল, আমার সঙ্গে এস, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
আনাতোল মুখ ফিরিয়ে বোনের দিকে তাকাল, তারপর পিয়েরকে অনুসরণ করতে উঠে দাঁড়াল। পিয়ের তার হাতটা ধরে কাছে টেনে এনে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার উপক্রম করল।
হেলেন ফিসফিস করে বলল, যদি আমার বসার ঘরে যেতে চাও…, কিন্তু কোনো জবাব না দিয়ে পিয়ের বেরিয়ে গেল।
আনাতোল স্বাভাবিক পটুতার সঙ্গে পা ফেলে তার পিছু নিল, কিন্তু তার মুখে উদ্বেগের চিহ্ন ফুটে উঠল।
পড়ার ঘরে ঢুকে পিয়ের দরজাটা বন্ধ করে দিল, তারপরে আনাতোলের দিকে না তাকিয়েই তাকে উদ্দেশ করে বলল :
তুমি কাউন্টেস রস্তভাকে কথা দিয়েছিলে তাকে বিয়ে করবে এবং তাকে হরণ করে আনার উদ্যোগও করেছিলে, এ কথা ঠিক?
প্রিয় বন্ধু, আনাতোল জবাব দিল (পুরো সংলাপটাই ফরাসিতে হল), এরকম সুরে প্রশ্ন করা হলে তার উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।
পিয়েরের বিবর্ণ মুখ ক্রোধে বিকৃত হয়ে উঠল। আনাতোলের ইউনিফর্মের কলারটা চেপে ধরে তাকে এ পাশ থেকে ও-পাশে ঝাঁকুনি দিতে লাগল। ক্রমে আনাতোলের চোখে-মুখে আতংক ফুটে উঠল।
যখন বলেছি তোমার সঙ্গে কথা বলব, তখন বলবই!…পিয়ের আবার বলল।
ছাড়, কি বোকামি করছ! কি হয়েছে? একটুকরো কাপড়সহ কলারের একটা বোম ঝুলে পড়ায় সেটা নাড়তে নাড়তে আনাতোল বলল।
তুমি একটা শয়তান, একটা বদমাস, এটা দিয়ে কেন যে তোমার মাথাটা গুঁড়িয়ে দিচ্ছি না তা জানি না, পিয়ের ফরাসিতেই বলল।
একটা ভারি কাগজ-চাপা হাতে নিয়ে ছুঁড়ে দেবার ভঙ্গিতে সেটাকে তুলে ধরে আবার যথাস্থানে রেখে দিল।
তাকে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়েছিলে?
আমি…আমি…আমি সেকথা ভেবে দেখিনি। কখনো কোনো কথা দেইনি, কারণ…
পিয়ের বাধা দিল।
আনাতোলের দিকে এগিয়ে বলল, তার কোনো চিঠি তোমার কাছে আছে? কোনো চিঠি?
তার দিকে তাকিয়ে আনাতোল তৎক্ষণাৎ পকেটে হাত ঢুকিয়ে নোটবইটা টেনে বের করল।
আনাতোলের দেওয়া চিঠিটা হাতে নিয়ে টেবিলটাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে পিয়ের সোফায় গিয়ে বসল।
আনাতোলকে ভয় পেতে দেখে পিয়ের বলল, ভয় পেয়ো না, আমি হিংসার আশ্রয় নেব না। প্রথমত, চিঠিগুলো, এমনভাবে বলল যে পড়া মুখস্থ করছে। দ্বিতীয়ত, কিছুক্ষণ থেমে সে বলল, আবার দাঁড়িয়ে ঘরময় পায়চারি করে বলল, কাল তুমি অবশ্যই মস্কো ছেড়ে চলে যাবে।
কিন্তু তা কি করে…?
তার কথায় কান না দিয়ে পিয়ের বলেই চলল, তৃতীয়ত, তোমার ও কাউন্টেস রস্তভার মধ্যে যা ঘটেছে ঘুণাক্ষরেও কখনো কারো কাছে তা বলবে না। আমি জানি, তোমার বলা বন্ধ করতে আমি পারব না, কিন্তু বিবেকের কণামাত্রও যদি তোমার মধ্যে থাকে… পিয়ের নিঃশব্দে বারকয়েক ঘরময় ঘুরে বেড়াল।
আনাতোল একটা টেবিলের পাশে বসে ভুরু কুঁচকে ঠোঁট কামড়াতে লাগল।
যাই বল না কেন, তোমাকে এটা বুঝতেই হবে যে তোমার সুখ ছাড়াও অন্য মানুষের সুখ ও শান্তি বলে একটা কথা আছে, অথচ নিজের ফুর্তির জন্য তুমি একটা গোটা জীবন বরবাদ করতে চলেছ! ফুর্তি করতে হয় আমার স্ত্রীর মতো মেয়েমানুষদের নিয়ে ফুর্তি কর,-সেখানে তোমার অধিকার স্বীকৃত, কারণ তারা জানে তাদের কাছে তুমি কি চাও। তোমার মতো একই লাম্পট্যের অভিজ্ঞতার বর্মে তারাও সুসজ্জিত, কিন্তু একটি কুমারীকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া…তাকে প্রতারিত করা, হরণ করা…তুমি কি বুঝতে পারছ না যে একটি বৃদ্ধ বা শিশুকে প্রহার করার মতোই এটা অতীব নিচ কাজ?…।
পিয়ের থামল, আনাতোলের দিকে তাকাল, তার চোখে এখন রাগের বদলে জিজ্ঞাসার প্রকাশ।
পিয়ের ক্রোধ সংবরণ করেছে দেখে আনাতোল কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল। সে বলল, অতকথা আমি জানি না, জানতে চাইও না, কিন্তু আমার প্রতি তুমি এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছ-নিচ ইত্যাদি–যেটা একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে আমি কাউকে ব্যবহার করতে দিতে পারি না।
আনাতোল কি চায় বুঝতে না পেরে পিয়ের অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আনাতোল বলতে লাগল, যদিও এটা নিভৃত আলোচনা, তবু না…
পিয়ের বিদ্রূপ করে বলল, তুমি কি ক্ষতিপূরণ চাও?
অন্তত তোমার কথাগুলো তো ফিরিয়ে নিতে পার। কি বল? আমি তোমার ইচ্ছামতো কাজ করি সেটাই যদি চাও, তা হলে?
পিয়ের বলে উঠল, কথা ফিরিয়ে নিলাম, ফিরিয়ে নিলাম! তোমার কাছে ক্ষমাও চাইছি।…আর তোমার যাত্রার জন্য যদি টাকার প্রয়োজন হয়…
