মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার কথার জবাবে পিয়ের বলল, কিন্তু বিয়ে হবে কেমন করে? সে তো বিয়ে করতে পারে না–সে যে বিবাহিত!
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা সক্ষোভে বলে উঠল এ যে প্রতি ঘণ্টায় অবস্থা আরো ঘোরালো হয়ে উঠেছে। চমৎকার ছেলে! কী শয়তান! আর ও কি না তারই আশায় বসে আছে-বসে আছে গতকাল থেকে! সব ওকে বলতে হবে। তাহলে অন্তত তার আশা ছেড়ে দেবে!
পিয়েরের মুখে আনাতোলের বিয়ের বিস্তারিত বিবরণ শুনে, আনাতোলকে অনেকরকম বকুনি দিয়ে মনের ঝাল মিটিয়ে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা কেন পিয়েরকে ডেকে এনেছে সেকথা জানাল। তার ভয় হচ্ছে, কাউন্ট বা বলকনস্কি-যেকোন মুহূর্তে সে এসে পড়তে পারে–যদি এ ব্যাপারে জানতে পারে (যদিও তাদের কাছ থেকে ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখতে পারবে বলেই সে আশা করে) তাহলে আনাতোলকে হয় তো দ্বৈতযুদ্ধে আহ্বান করে বসবে, সুতরাং পিয়ের যেন তার নাম করে তার শ্যালককে মস্কো ছেড়ে চলে যেতে বলে, যাতে আর কোনোদিন আনাতোলের মুখ তাকে দেখতে না হয়। এতক্ষণে বুড়ো কাউন্ট, নিকলাস ও প্রিন্স আন্দ্রুর বিপদটা উপলব্ধি করে পিয়ের কথা দিল সে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার ইচ্ছামতো কাজই করবে।
নিজের ইচ্ছার কথা পিয়েরকে সংক্ষেপে ও সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিয়ে সে তাকে বসার ঘরে যেতে দিল।
বলল, মনে রেখ, কাউন্ট কিছুই জানেন না। এমন ভাব দেখাবে যেন তুমিও কিছুই জান না। এদিকে আমি গিয়ে মেয়েকে বলছি যে তার জন্য অপেক্ষায় থেকে কোন লাভ নেই! মন চায় তো ডিনার পর্যন্ত থেকে যেয়ো!
কাউন্টের সঙ্গে পিয়েরের দেখা হল। তাকে খুবই বিচলিত ও দুর্বল মনে হল। সকালেই নাতাশা তাকে বলে দিয়েছে যে সে বলকনস্কিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সে পিয়েরকে বলল, গোলমাল, বড়ই গোলমাল হে বাপু! মা কাছে না থাকলে মেয়েদের নিয়ে যে কত গোলমালই পোয়াতে হয়। এখানে আসাটাই আমার ভুল হয়েছে। তোমার কাছে খোলাখুলিই সব বলছি। তুমি কি শুনেছ, কারো সঙ্গে পরামর্শ না করেই সে বিয়ে ভেঙে দিয়েছে? একথা সত্য যে এ বিয়েতে আমার খুব মত ছিল না। অবশ্য ছেলেটি খুব ভালো, কিন্তু তাহলেও বাবার অমতে বিয়ে করে তারা সুখী হত না, আর নাতাশার তো বরের অভাব হত না। তথাপি ব্যাপারটা তো অনেকদিন ধরে চলে আসছে, আর এখন বাবা মার সম্মতি ছাড়াই এরকম একটা কাজ! এখন তো তার মাও অসুস্থ, কি যে হবে ঈশ্বরই জানেন! কি জান কাউন্ট, মায়ের অনুপস্থিতিতে মেয়েদের নিয়ে চলা বড়ই শক্ত…।
পিয়ের বুঝল, কাউন্ট খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছে, সে প্রসঙ্গটা বদলাতে চাইল, কিন্তু কাউন্ট তার নিজের বিপদের কথাই বলতে লাগল।
উত্তেজিত মুখে সোনিয়া ঘরে ঢুকল।
নাতাশার শরীর ভালো নয়, সে তার ঘরেই আছে, আপনাকে একবার দেখতে চাইছে। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তার কাছেই আছেন। তিনিও আপনাকে যেতে বলেছেন।
হ্যাঁ, তুমি তো বলকনস্কির বড় বন্ধু, নিশ্চয়ই সে তাকে একটা খবর পাঠাতে চাইছে। হায়রে! তাহলে কী সুখের ব্যাপারই না হত!
কপালের অল্প কয়েকগাছি পাকা চুল মুঠো করে ধরে কাউন্ট ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা যখন নাতাশাকে বলল যে আনাতোল বিবাহিত, তখন নাতাশা সেকথা বিশ্বাস করতে চায়নি, বার বার বলল, পিয়ের নিজে এসে কথাটা বলুক। নাতাশার ঘরের দিকে যেতে যেতে সোনিয়া সংবাদটা পিয়েরকে জানাল। বিবর্ণ, রুক্ষ নাতাশা মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার পাশেই বসেছিল, দুটি চোখ জ্বরতপ্ত উজ্জ্বলতা। পিয়ের ঘরে ঢুকতেই সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। হাসল না, মাথা নাড়ল না, শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তার দৃষ্টি শুধু একটি জিজ্ঞাসা : সে কি আনাতোলের বন্ধু, না কি অন্য সকলের মতোই তার শত্রু? তার কাছে পিয়েরের যেন কোনো অস্তিত্বই নেই।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা পিয়েরকে দেখিয়ে নাতাশাকে বলল, ইনি সব জানেন। আমি সত্যি কথা বলেছি কিনা ওঁর মুখেই শোন।
পশ্চাদ্ধাবনকারী কুকর ও শিকারির দিকে আহত জন্তু যেভাবে তাকায় সেই দৃষ্টিতে নাতাশা একের পর অন্যের দিকে তাকাতে লাগল।
করুণায় আনত চোখে পিয়ের বলতে শুরু করল, নাতালিয়া ইলিনিচনা, এটা সত্য কি মিথ্যা তাতে আপনার কিছু যায় আসে না, কারণ…
তাহলে সে বিবাহিত একথা সত্য নয়?
হ্যাঁ, সত্য।
বিয়েটা কি অনেকদিন আগে হয়েছে? আপনার দিব্যি…
পিয়ের দিব্যি করেই বলল।
নাতাশা তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করল, সে কি এখনো এখানে আছে?
হ্যাঁ, এইমাত্র আমি তাকে দেখেছি।
নাতাশা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলল, হাত দিয়ে ইশারা করে জানিয়ে দিল, তাকে যেন একলা থাকতে দেওয়া হয়।
.
অধ্যায়-২০
পিয়ের ডিনারের জন্য অপেক্ষা করল না, ঘর থেকে বেরিয়ে তখনই চলে গেল। সে শহরময় আনাতোল কুরাগিনকে খুঁজে বেড়াতে লাগল। তার কথা মনে হতেই সব রক্ত হৃৎপিণ্ডে ছুটে এল, শ্বাস টানতে কষ্ট হতে লাগল। কুরাগিন বরফ-পাহাড়ে নেই, জিপসিদের আড্ডায় নেই, কোমোনেনোদের কাছেও নেই। পিয়ের ক্লাবে গেল। ক্লাবে সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলেছে। একে একে সদস্যরা সকলেই এসে হাজির হল। সে জনে জনে আনাতোলের কথা জিজ্ঞাসা করল। কেউ বলল এখনো আসেনি, কেউ বলল ডিনারে আসবে। কিন্তু আনাতোল এল না। অগত্যা ডিনারের জন্য অপেক্ষা না করে পিয়ের বাড়ি ফিরে গেল।
