একমুহূর্ত চুপ করে থেকে নাতাশা জবাব দিল : হ্যাঁ, অসুস্থ।
কাউন্ট উদ্বেগের সঙ্গে প্রশ্ন করল, তাকে এত মনমরা দেখাচ্ছে কেন, তার বাকদত্ত স্বামীর কি কিছু হয়েছে, নাতাশা শুধু বলল, কিছুই হয় নি, বাবা যেন কোনোরকম চিন্তা না করে। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাও নাতাশার কথা সমর্থন করে বলল, কিছুই হয় নি। কিন্তু অসুস্থতার ভান, মেয়ের মনমরা ভাব, সোনিয়া ও মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার বিব্রত মুখ–এসব কিছু দেখে কাউন্ট পরিষ্কার বুঝতে পারল যে তার অনুপস্থিতিতে কিছু অঘটন ঘটেছে, কিন্তু তার আদরের মেয়ের গায়ে কলঙ্ক লাগতে পারে সেরকম কিছু ভাবা তার পক্ষে এতই ভয়ঙ্কর, আর নিজের আনন্দময় প্রশান্তিকে সে এতই বড় করে দেখে, যে আর কোনো প্রশ্ন না করে নিজেকে সে এটাই বোঝাতে চেষ্টা করল যে বিশেষ কিছুই ঘটেনি, শুধু মেয়ের অসুস্থতার জন্য তাদের দেশে ফেরাটা যে পিছিয়ে গেল তাতেই তার মন অখুশি হয়ে উঠল।
.
অধ্যায়-১৯
স্ত্রী মস্তোতে আসার পর থেকেই তার কাছাকাছি না হবার জন্যই পিয়ের কোথাও চলে যাবার কথা ভাবছিল। রস্তভরা মস্কোতে আবার কিছুদিন পরেই নাতাশা তার মনের উপর যে প্রভাব ফেলেছে তার ফলেই সে আরো তাড়াতাড়ি মনের সে ভাবনাকে কার্যে রূপায়িত করে ফেলল। জোসেফ আলেক্সিভিচের বিধবার সঙ্গে দেখা করার জন্য সে তিভারে চলে গেল, বিধবাটি অনেকদিন আগেই তাকে কথা দিয়েছিল, পরলোকগত স্বামীর কিছু কাগজপত্র তার হাতে তুলে দেবে।
মস্কোতে ফিরে এসেই মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার একটা চিঠি তার হাতে এল, আন্দ্রু বলকনস্কি ও তার বাকদত্তার সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তাকে দেখা করতে অনুরোধ করা হয়েছে। পিয়ের নাতাশাকে এড়িয়েই চলছিল, কারণ তার মনে হয়েছে, বন্ধুর প্রেমিকার প্রতি একজন বিবাহিত পুরুষের মনোভাব যা হওয়া উচিত, নাতাশার প্রতি তার অনুরাগ তার চাইতে অনেক বেশি হয়ে দেখা দিয়েছে। অথচ ভাগ্য বারবার তাদের দুজনকে একত্রে ঠেলে দিচ্ছে।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার কাছে যাবার জন্য পোশাক পরতে পরতে সে ভাবল : কি ঘটে থাকতে পারে? আমাকে দিয়ে তাদের কি দরকার হতে পারে? প্রিন্স আন্দ্রু যদি তাড়াতাড়ি এসে বিয়েটা করে ফেলত! পথে যেতে যেতে সে ভাবতে লাগল।
তিরস্কয় বুলভার্দে একটি পরিচিত কণ্ঠ তাকে ডাকল।
কে যেন চেঁচিয়ে বলল, পিয়ের! অনেকদিন হল ফিরেছ নাকি? পিয়ের মাথাটা তুলল। দুই ঘোড়ার একটা স্লেজে চেপে আনাতোল ও তার চিরসঙ্গী মাকারিন দ্রুত তার পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আনাতোল সোজা হয়ে বসে আছে সামরিক বাবুদের চিরাচরিত ভঙ্গিতে, বিভার-কলারের মুখের নিচের দিকটা ঢাকা পড়েছে, মাথাটা ঈষৎ হেলানো। মুখটা তাজা ও গোলাপি, সাদা পালক লাগানো টুপিটা একদিকে বাঁকানো, তার ফাঁক দিয়ে চূর্ণ বরফ ছিটানো কোঁকড়া পমেড-মাখানো চুলগুলি দেখা যাচ্ছে।
পিয়ের ভাবল, হ্যাঁ, এই সত্যিকারের সন্ন্যাসী। ক্ষণিকের সুখ ছাড়া আর কোনোদিকে তার নজর নেই, কোনোকিছুতেই সে দুঃখ পায় না, কাজেই সে সর্বদাই হাসিখুশি, সন্তুষ্ট, প্রশান্ত। ওর মতো হবার জন্য আমি তো সব কিছু ছাড়তে রাজি!
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার বাইরের ঘরে তার লোমের কোটটা খুলতে সাহায্য করে পরিচারক জানাল, কত্রীঠাকরুণ তাকে নিজের শোবার ঘরেই ডেকেছে।
নাচ-ঘরের দরজা খুলতেই পিয়ের দেখতে পেল, নাতাশা বিষণ্ণ, ঘৃণাভরা মুখে জানালায় বসে আছে। পিয়েরের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে উদাস মর্যাদার ভঙ্গিতে নাতাশা ঘর থেকে চলে গেল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার ঘরে ঢুকে পিয়ের শুধাল, কি হয়েছে?
খুব ভালো কাজ! মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা জবাব দিল, পঞ্চাশ বছর এ পৃথিবীতে বেঁচে আছি, কিন্তু এরকম লজ্জার কথা কখনো শুনিনি।
তাকে যা বলা হবে তা নিয়ে সে কারো কাছে মুখ খুলবে না-পিয়েরের কাছ থেকে এই কথা আদায় করে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তাকে জানাল, বাবা-মার অজ্ঞাতসারেই নাতাশা প্রিন্স আন্দ্রুকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এসবের কারণ আনাতোল কুরাগিন, পিয়েরের স্ত্রীও তাদের সমাজেই ভিড়েছে, আর গোপনে বিয়ে করার জন্য বাবার অনুপস্থিতিতে নাতাশা বাড়ি থেকে পালাবার চেষ্টা করেছিল।
পিয়ের হাঁ করে সব কথা শুনল, কিন্তু নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারল না। যে বাকদত্তা স্ত্রীকে প্রিন্স আন্দ্রু গত গভীরভাবে ভালোবাসে সে-সেই মনোরমা নাতাশা রস্তভাবলকনস্কিকে ছেড়ে বিয়ে করবে সেই মূৰ্থ আনাতোলকে যে ইতিমধ্যেই গোপনে বিয়ে করেছে (পিয়ের কথাটা জানে), তাকে সে এতই ভালোবেসেছে যে তার সঙ্গে পালিয়ে যেতেও সম্মত হয়েছে-এসব কথা পিয়ের যেন ভাবতেও পারছে না, কল্পনাও করতে পারছে না।
তার মনে পড়ে গেল নিজের স্ত্রীর কথা। খারাপ মেয়ের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার মতো দুর্ভাগ্য শুধু তার একারই হয় নি একথা চিন্তা করে সে নিজের মনেই বলল, এরা সব সমান! তবু প্রিন্স আন্দ্রুর প্রতি করুণায় তার চোখে জল এসে গেল, তার আহত গর্বের প্রতি মনে সহানুভূতি দেখা দিল, আর বন্ধুকে যতই করুণা করতে লাগল ততই নাতাশার প্রতি ঘৃণা ও বিরক্তি বেড়ে চলল। এইমাত্র নাচ-ঘর থেকে চলে যাবার সময় নাতাশার চোখে সে দেখেছে উদাস মর্যাদার দৃষ্টি। সে জানত না যে নাতাশার অন্তর তখন হতাশা, লজ্জা ও পরাজয়ের গ্লানিতে ভরে উঠেছে, তার মুখের সেই উদাস মর্যাদা ও কঠোরতার দোষও তার নয়!
