ভালো মেয়ে! খুব ভালো! মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল। আমার বাড়িতে প্রেমিকের সঙ্গে মুলাকাত! ভান করে পড়ে থেক না, আমি যা বলছি কান পেতে শোন। নাতাশার হাতে হাত রাখল। আমার কথাগুলি শোন! অত্যন্ত বাজে মেয়ের মতো তুমি নিজের অসম্মান ডেকে এনেছ। তোমাকে টিট করতে পারতাম, কিন্তু তোমার বাবার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে, তাই তার কাছ থেকে সব কথা গোপন রাখব।
নাতাশা একটুও নড়ল না, নিঃশব্দ চাপা কান্নায় তার সমস্ত শরীর ফুলে ফুলে উঠছে, গলা আটকে আসছে। সোনিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা নাতাশার পাশে সোফায় বসল।
কঠিন স্বরে বলল, তার ভাগ্য ভালো যে এখান থেকে পালিয়ে যেতে পেরেছে, কিন্তু আমি তাকে খুঁজে বের করবই!…আমি যা বলছি তা কি কানে যাচ্ছে, না যাচ্ছে না?
নাতাশার মুখের নিচে হাত রেখে মুখটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। নাতাশার মুখের দিকে তাকিয়ে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা ও সোনিয়া দুজনই চমকে উঠল। শুকনো চোখ দুটো চকচক করছে, ঠোঁট দুটো চেপে আছে, গাল বসে গেছে।
একঝটকায় মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আবার সোফায় এলিয়ে পড়ে নাতাশা বলে উঠল, যা হয় হোক!…তাতে আমার কি…আমি মরে যাব!
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল, নাতালি, আমি তোমার ভালোই চাই। চুপচাপ শুয়ে থাক, আমি তোমাকে ছোঁব না। কিন্তু আমার কথা শোন। তুমি যে কত বড় দোষ করেছ তা তোমাকে বলব না। সেটা তুমি নিজেই জান। কিন্তু কাল যখন তোমার বাবা ফিরে আসবেন–তাকে আমি কি বলব? অ্যাঁ?
চাপা কান্নায় আবার নাতাশার শরীরটা দুলে উঠল।
ধর তিনি যদি জানতে পারেন, আর তোমার দাদা, তোমার ভাবী স্বামী?
আমার কোনো স্বামী নেই, আমি তাকে প্রত্যাখান করেছি! নাতাশা চেঁচিয়ে বলল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল, একই কথা। একথা শুনে তারা কি চুপ করে বসে থাকবে? তাকে, তোমার বাবাকে আমি চিনি…তিনি যদি তাকে দ্বৈতযুদ্ধে আহ্বান করেন, সেটা কি ভালো হবে? কি বল?
আঃ, আমাকে একা থাকতে দিন। আপনি নাক গলাচ্ছেন কেন? কেন? কেন? কে আপনাকে ডেকে এনেছে? সোফার উপর উঠে বসে ঘৃণার দৃষ্টিতে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার দিকে তাকিয়ে নাতাশা বলল।
এবার মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাও রেগে গেল, জোর গলায় বলল, কিন্তু তুমিই বা কি চেয়েছিলে? তোমাকে কি তালা-চাবি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল? কে তাকে এ বাড়িতে আসতে বাধা দিয়েছিল? কেন জিপসি গাইয়ে মেয়েদের মতো তোমাকে হরণ করতে এসেছিল? তুমি কি ভেবেছ তারা তোমাকে খুঁজে পেত না? তোমার বাবা, দাদা, বাকদত্ত স্বামী? আর সে তো একটা শয়তান, হতভাগা–তা তো সকলেই জানে!
নাতাশা দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, সে আপনাদের মতো যেকোন লোকের চাইতে ভালো! আপনি বাধা না দিলে…ওঃ, ঈশ্বর! এসব কি হল? কি হল? সোনিয়া, তুমি কেন…? চলে যাও!
নিজের হাতে-গড়া বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ যেভাবে আর্তনাদ করে সেইরকম হতাশাভরা তীব্রতায় নাতাশা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা পুনরায় কি যেন বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই নাতাশা চিৎকার করে উঠল :
চলে যান! চলে যান! চলে যান! আপনারা সকলেই আমাকে ঘৃণা করেন, তুচ্ছ মনে করেন! সে আবার সোফায় শুয়ে পড়ল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা আরো কিছুক্ষণ ধরে তাকে বকল, তারপর বলল, নাতাশা যদি সব কথা ভুলে যায় এবং হাবভাবে কাউকে বুঝতে না দেয় যে একটা কিছু ঘটেছে, তাহলে সবকথাই তার বাবার কাছ থেকে গোপন রাখা হবে এবং কেউ কিছু জানতে পারবে না। নাতাশা কোনো জবাব দিল না, কাঁদলও না, কিন্তু কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল, শরীরটা কাঁপতে লাগল। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তার মাথার নিচে একটা বালিশ খুঁজে দিল, দুটো লেপ চাপা দিল, নিজেই কিছুটা লেবুর জল এনে দিল, কিন্তু নাতাশা কোনো রকম সাড়া দিল না।
নাতাশা ঘুমিয়ে পড়েছে মনে করে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, ঠিক আছে, ওকে গুমোতে দাও।
নাতাশা কিন্তু ঘুমোয়নি, বিবর্ণ মুখে খোলা চোখের সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। সারারাত সে ঘুমোল না, কাঁদল না, সোনিয়া বারকয়েক তার ঘরে গেলে তার সঙ্গেও কথা বলল না।
পরদিন কাউন্ট রস্তভ কথামতোই লাঞ্চের আগে মস্কোর নিকটবর্তী জমিদারি থেকে ফিরে এল। তার মেজাজ খুব ভালো, ক্রেতার সঙ্গে কথাবার্তা ভালোভাবেই এগিয়েছে, কাউন্টেসকে ফেলে তাকে আর বেশিদিন মস্তোতে থাকতে হবে না। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তার সঙ্গে দেখা করে জানাল, গতকাল নাতাশা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, ডাক্তারকে ডাকা হয়েছিল, কিন্তু এখন সে অনেকটা ভালো আছে। সকালে নাতাশা ঘর থেকে বের হল না। শুকনো ঠোঁট চেপে ধরে, শুকনো স্থির দৃষ্টি মেলে জানালায় বসে বাইরের লোকজনের চলাফেরা দেখতে লাগল। কেউ ঘরে ঢুকলে চকিতে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকে দেখছে। তার মনে আশা, আনাতোলের খবর পাবে, হয় নিজে আসবে, না হয় চিঠি লিখবে।
কাউন্ট তার সঙ্গে দেখা করতে এলে পায়ের শব্দ শুনেই সে সাগ্রহে মুখ ফেরাল, কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখে ফুটে উঠল নিরাসক্ত, হিংস্র ভাব। বাবাকে অভ্যর্থনা জানাতে উঠেও দাঁড়াল না।
তোমার কি হয়েছে সোনা মেয়ে? তুমি কি অসুস্থ? কাউন্ট শুধাল।
