আপনার স্বাস্থ্য পান করছি, বলে বলগাও তার গ্লাসটা খালি করে রুমালে মুখ মুছল।
সাশ্রু নয়নে মাকারিন আনাতোলকে আলিঙ্গন করল।
আহা প্রিন্স, আপনাকে বিদায় দিতে আমার কত কষ্ট হচ্ছে!
এবার যাওয়া যাক! যাওয়া যাক! আনাতোল চেঁচিয়ে বলল।
বলগা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
আনাতোল বলল, না, থাম! দরজাটা বন্ধ করে দাও, আগে সকলকে একসঙ্গে বসতে হবে। সেটাই প্রথা।
দরজা বন্ধ করে সকলেই বসে পড়ল। (এটা একটা রুশ প্রথা।)
আনাতোল দাঁড়িয়ে বলল, এবার দ্রুত যাত্রা শুরু, বাছারা!
খানসামা জোসেফ কোষবদ্ধ তরবারি তার হাতে তুলে দিল, সকলে বারান্দায় বেরিয়ে গেল।
দলখভ শুধাল, লোমের জোব্বাটা কোথায়? হেই ইগনাকা! মাত্রেনা মাত্রেভনার কাছ থেকে লোমের জোব্বাটা চেয়ে আন। চোখ টিপে বলতে লাগল, পালিয়ে যাওয়া যে কী জিনিস তা অনেক শুনেছি। আরে, সে তো পড়িমরি করে যা পরা থাকবে তাই নিয়েই ছুটে বেরিয়ে আসবে, যদি একটু দেরি করেছ কি অমনি শুরু হবে চোখের জল, আর বাপি ও মামণি, আর সেও এক মিনিটেই জমে বরফ হয়ে ফিরে যাবে–কিন্তু প্রথম সুযোগেই লোমের জোব্বা দিয়ে ঢেকে তাকে একেবারে স্লেজে এনে তুলে দাও।
খানসামা মেয়েদের ব্যবহারের শেয়ালের চামড়ার পটি দেওয়া একটা জোব্বা এনে দিল।
মূর্খ! বললাম না লোমের জোব্বা! হেই মানো, লোমের জোব্বা! তার কণ্ঠস্বর ঘরে ঘরে ধ্বনিত হতে লাগল।
একটি ক্ষীণ তনু, সুদর্শনা জিপসি মেয়ে কালো চোখ ও নীল-কালো চুল নাচিয়ে একটি লাল শাল পরে ছুটে বেরিয়ে এল, তার হাতে একটি লোমের জোব্বা।
দলখভ কোনো কথা না বলে জোব্বাটা মাত্রেনার গায়ে জড়িয়ে দিল। তারপর বলল, এইভাবে, আর তার পরে এইভাবে, কলারটা মাত্রেনার মাথা পর্যন্ত তুলে দিয়ে শুধু মুখের একটুখানি খোলা রাখল। আর তার পরে এইভাবে, দেখতে পাচ্ছ? আনাতোলের মাথাটাকে সে এমনভাবে এগিয়ে ধরল যাতে কলারের ফাঁক দিয়ে মানোর উজ্জ্বল হাসিটুকু দেখা যায়।
মাত্রেনাকে চুমো খেয়ে আনাতোল বলল, আচ্ছা, বিদায় মাত্রেনা। এখানকার লীলা-খেলা তো সাঙ্গ হল। স্তেশকাকে আমার কথা বলো। তাহলে বিদায়! বিদায় মাত্রেনা, আমার সৌভাগ্য কামনা করো!
জিপসি-উচ্চারণে মাত্রেনা বলল, প্রিন্স, ঈশ্বর আপনাকে পরম সৌভাগ্য দান করুন!
ফটকের সামনে দুটো এয়কা দাঁড়িয়ে আছে, দুটি যুবক কোচয়ান ঘোড়াগুলোকে ধরে আছে। বলগা সামনের এয়কাতে উঠে বসল, হাত উঁচু করে লাগাম তুলে নিল। আনাতোল ও দলখভ তার গাড়িতে উঠল। মাকারিন, খডস্তিকভ ও একটি খানসামা উঠল অপ স্লেজটাতে।
তোমরা প্রস্তুত? বলগা শুধাল।
চালাও। হাতের লাগাম ঘুরিয়ে সে চেঁচিয়ে বলল, নিকিৎস্কি বুলভার্দ ধরে এয়কা তীরবেগে ছুটল।
তপ্রু! তফাৎ যাও! হাই!…ত!…বলগার গলা আর বক্সে উপবিষ্ট জোয়ানটির গলা ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। আবাৎ স্কোয়ারে ত্রয়কাটা একটা গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগাল, একটা কিছু ভাঙার শব্দ হল, হৈচৈ শোনা গেল, বয়কাটা আর্বাৎ স্ট্রিট ধরে উড়ে চলল।
পদনভিনস্কি বুলভার্দ বরাবর মোড় ঘুরে বলগা লাগামে টান দিল, পিছন ফিরে পুরনো কোনিউশেনি স্ট্রিটের মোড়ে এয়কা থামাল।
জোয়ানটি বক্স থেকে লাফিয়ে নেমে ঘোড়াগুলোকে ধরল। আনাতোল ও দলখভ পথ ধরে এগিয়ে গেল। ফটকে পৌঁছে দলখভ শিস দিল। শিসের জবাব শোনা গেল, একটি দাসী ছুটে বেরিয়ে এল।
বলল, উঠোনে ঢুকে পড় ন, নইলে ওরা আপনাদের দেখে ফেলবে, তিনি এখুনি এসে পড়বেন।
দলখভ ফটকেই রইল, আনাতোল দাসীকে অনুসরণ করে উঠোনে পড়ে মোড় ঘুরে দৌড়ে বারান্দায় উঠে পড়ল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার ষণ্ডামার্কা পরিচারক গ্রেবিয়েলের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল।
পালাবার পথ আটকে দাঁড়িয়ে গেব্রিয়েল বলল, দয়া করে কত্রীঠাকরুণের কাছে চলুন।
কোন কর্ত্রীঠাকরুণ? তুমি কেন? রুদ্ধশ্বাস অস্পষ্ট স্বরে আনাতোল বলল।
দয়া করে ভিতরে চলুন। আপনাকে ভিতরে নিয়ে যাবার হুকুম হয়েছে।
দলখভ চিৎকার করে বলল, কুরাগিন! ফিরে এস! বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে! ফিরে এস!
আনাতোল ভিতরে ঢুকে যাবার পরে দলখভ ছোট দরজাটার কাছে দাঁড়িয়েছিল, দারোয়ান দরজায় তালা লাগাবার চেষ্টা করতেই সে তার সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করে দিল। প্রাণপণ চেষ্টায় দলখভ দরোয়ানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতেই আনাতোলও ছুটে বেরিয়ে এল আর দলখভ তার হাতটা চেপে ধরে ছোট দরজাটার ভিতরে দিয়ে টানতে টানতে এয়কাটার কাছে ছুটে গেল।
.
অধ্যায়-১৮
সোনিয়াকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তার মুখ থেকে সব কথা জেনে নিয়ে নাতাশার চিঠিটা পড়ে সেটা হাতে নিয়েই নাতাশার গরে গেল।
বলল, নিলাজ অকর্মার ধাড়ি! তোমার কোনো কথা শুনতে চাই না।
নাতাশা অশ্রুহীন বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকাল। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তাকে ঘরের মধ্যে তালাবন্ধ করে রেখে দরোয়ানকে হুকুম দিল, সন্ধ্যাবেলা যারা আসবে তাদের যেন ঢুকতে দেয়, কিন্তু আর বের হতে না দেয়, তারপর পরিচারককে তাদের তার কাছে নিয়ে আসার হুকুম করে বসার ঘরে অপহরণকারীদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
গ্রেবিয়েল এসে যখন খবর দিল যারা এসেছিল তারা পালিয়ে গেছে, তখন সে ভুরু কুঁচকে উঠে দাঁড়াল, দুই হাত পিছনে জুড়ে ঘরময় পায়চারি করতে করতে অনেকক্ষণ ধরে কি করবে তাই ভাবতে লাগল। মাঝরাতে পকেটের মধ্যে চাবিটা নাড়তে নাড়তে নাতাশার ঘরে ঢুকল। সোনিয়া বারান্দায় বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বলল, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা, ঈশ্বরের দোহাই আমাকে ওর কাছে যেতে দিন! তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল।… বিরক্তিকর, শোচনীয়…আমার বাড়িতে…ভয়ংকর মেয়ে, পাজি মেয়ে! আমার দুঃখ শুধু ওর বাবার জন্য!…যত শক্তই হোক, সকলকেই জিভ বন্ধ রাখতে বলে দেব, কাউন্টের কাছে সবকিছু লুকিয়ে রাখতে হবে। দৃঢ় পদক্ষেপে সে ঘরে ভিতরে ঢুকল। দুই হাতে মুখ ঢেকে নাতাশা সোফায় শুয়ে আছে, একটুও নড়ল না। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তাকে যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেইভাবেই আছে।
