আনাতোল ও দলখভও বলগাকে পছন্দ করে তার চমৎকার এয়কা চালানোর জন্য, তাছাড়া আরো একটা কারণ আছে-তারা যা পছন্দ করে বলগারও তাই পছন্দ। অন্যদের বেলায় বলগা দরদাম করে, দু-ঘণ্টার পথ যেতে পঁচিশ রুবল ভাড়া হাঁকে, নিজে বড় একটা চালায় না, যুবকদের ক্রয়কায় বসিয়ে দেয়। কিন্তু তার ভদ্রলোকদের বেলায় সবসময় নিজে চালায়, কাজের জন্য কখনো কিছু দাবি করে করে না। শুধু বছরে দুইবার-যখন খানসামাদের কাছ থেকে খবর পায় যে তাদের হাতে টাকা আছে–তখন একদিন সকালে বহালতবিয়তে আসে, অনেকটা মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে কিছু সাহায্য ভিক্ষা করে। ভদ্রলোকরাও সবসময়ই তাকে আদর করে আসতে দেয়।
সে বলে, এ বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করুন আইভনিচ স্যার, অথবা বলে ইয়োর এক্সেলেন্সি, বড়ই ঘোড়ার অনটন চলছে। মেলায় যাবার জন্য যা পারেন কিছু দিন।
আর আনাতোল ও দলখভও হাতে টাকা থাকলে এক হাজার বা দু হাজার রুবল দিয়ে দেয়।
বলগার মাথায় সুন্দর চুল, বেঁটেখাটো, চ্যাপ্টা নাক, লাল মুখ, সরু লাল গলা, চকচকে ছোট চোখ, ছোট দাড়ি, বছর সাতাশ বয়সের একজন চাষী। পরনে রেশমি পাড় বসানো গাঢ় নীল রংয়ের সুন্দর সুতীর কোট, তার নিচে একটা ভেড়ার চামড়া।
এখন ঘরে ঢুকে সে প্রথমে ক্রুশ-চিহ্ন আঁচল, তারপর ছোট কালো হাতটা বাড়িয়ে দলখভের দিকে এগিয়ে গেল।
অভিবাদন করে বলল, থিয়োদর আইভানিচ!
কেমন আছ হে বন্ধু? এই যে, তুমিও এসে পড়েছ?
আনাতোল ঘরে ঢুকল। তার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলগা বলল, শুভদিন, ইয়োর এক্সেলেন্সি!
লোকটির কাঁধে হাত রেখে আনাতোল বলল, আচ্ছা, বলগা, আমার কথা কি তুমি ভাব, না ভাব না? আঁ দেখ, আমার একটা কাজ করে দিতে হবে…কোন কোন ঘোড়া নিয়ে এসেছ?
আপনার লোক যেমন হুকুম করেছে, আপনার বিশেষ দুই জন্তু, বলগা জবাব দিল।
শোন বলগা। তিনটে ঘোড়াকেই ছুটিয়ে মেরে ফেললেও তিন ঘণ্টার মধ্যে আমাকে সেখানে পৌঁছে দিতেই হবে। বুঝেছ?
বলগা চোখ টিপে বলল, ওরা মরে গেলে আমি কাকে চালাব?
হঠাৎ চোখ ঘুরিয়ে আনাতোল চেঁচিয়ে উঠল, মনে থাকে যেন, তোমার মুখ ভেঙে দেব! ঠাট্টা করো না!
চালকটি হেসে বলল, ঠাট্টার কি হল? আমার ভদ্রলোকদের কোন কাজটা না করে দিয়েছি! ঘোড়ার পক্ষে যত তাড়াতাড়ি ছোটা সম্ভব তত তাড়াতাড়িই আমরা ছুটব!
আনাতোল বলল, আঃ! ঠিক আছে, বস।
দলখভও বলল, হ্যাঁ, বস!
আমি দাঁড়িয়েই থাকব থিয়োদর আইভানিচ।
বসে পড়, যত বাজে কথা! একটু নেটে নাও! বলে একটা বড় গ্লাসে মদিরা ভর্তি করে আনাতোল তার দিকে এগিয়ে দিল।
মদ দেখেই কোচয়ানের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। ভব্যতার খাতিরে একটু আপত্তি জানিয়ে সবটা শেষ করে পকেট থেকে একটা লাল রেশমি রুমাল বের করে মুখটা মুছে নিল।
কখনো রওনা হতে হবে ইয়োর এক্সেলেন্সি?
তা… আনাতোল ঘড়ি দেখল। এখনই রওনা হব। মনে রেখ বলগা। ঠিক সময়ে পৌঁছনো চাই। বুঝলে?
বলগা জবাব দিল, সেটা কপালের উপর নির্ভর করে, অন্যথায় ঠিক সময়ে পৌঁছব না কেন? সাত ঘণ্টায় আপনাকে কি তিভার পৌঁছে দেইনি? আশা করি সে-কথা ইয়োর এক্সেলেন্সির মনে আছে?
সেকথা মনে পড়ায় হেসে মাকারিনের দিকে ফিরে আনাতোল বলল, একবার বড়দিনের সময় আমি তিভার থেকে গাড়িতে যাচ্ছিলাম। আপনি কি বিশ্বাস করবেন মাকাকা, এত জোরে গাড়িটা ছুটছিল যে দম বন্ধ হবার উপক্রম। একসারি বোঝাই স্লেজ সামনে পড়ায় দুটোর উপর দিয়েই ত্রয়কা চালিয়ে দিয়েছিলাম।
বলগা শেষটা বলে দিল, সে ছিল ঘোড়ার মতো ঘোড়া! দলখভের দিকে ঘুরে বলল, আপনি কি বিশ্বাস করবেন থিয়োদর আইভানিচ, ঘোড়াগুলো ঘণ্টায় চল্লিশ মাইল ছুটেছিল? আমি তাদের ধরে রাখতে পারছিলাম না, তুষারপাতের ফলে আমার হাত অবশ হয়ে আসছিল, শেষপর্যন্ত লাগাম ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে উঠলাম-আপনি লাগাম ধরুন ইয়োর এক্সেলেন্সি! ঘোড়াগুলোকে ছোটাবার কোনো ব্যাপারই ছিল না, গন্তব্যস্থানে পৌঁছবার আগে তাদের ধরে রাখাই যায়নি। শয়তানরা তিন ঘণ্টায় আমাদের সেখানে পৌঁছে দিয়েছিল! সেযাত্রায় শুধু একটা মারা গিয়েছিল।
.
অধ্যায়-১৭
আনাতোল ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আবার কয়েক মিনিট পরেই ফিরে এল। এখন তার পরনে লোমের কোট, রুপোর বেল্ট দিয়ে আঁটা, একটা লোমের টুপি কাৎ করে মাথার একপাশে বসানো, সুন্দর মুখের সঙ্গে বেশ মানিয়েছে।
আয়নায় মুখটা দেখে সেই একই ভঙ্গিতে দলখভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে একটা মদের গ্লাস তুলে নিল।
বলল, আচ্ছা, তাহলে বিদায় থিয়োদর। সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। মাকারিন ও অন্যদের দিকে ফিরে একমুহূর্ত কি ভেবে বলল, আমার যৌবনের সহকর্মী ও বন্ধুগণ, বিদায়!
যদিও সকলেই তার সঙ্গেই যাচ্ছে, তবু আনাতোল সহকর্মীদের প্রতি ভাষণের ভিতর দিয়ে মর্মস্পর্শী ও গম্ভীর একটা কিছু করতে চাইল। বুকটাকে সামনে ঠেলে দিয়ে একটা পা দোলাতে দোলাতে উঁচু গলায় ধীরে ধীরে কথাগুলি বলল।
সকলেই গ্লাস তুলে নিন, বলগা, তুমিও নাও। হে আমার যৌবনের সহকর্মী ও বন্ধুরা, আমরা একসঙ্গে অনেকদিন কাটিয়েছি, ফুর্তি করেছি। না কি? এবার, কতদিনে আবার দেখা হবে? আমি তো বিদেশে যাচ্ছি। অনেকদিন সুখে কাটিয়েছি-এবার বিদায় বাছারা! আমাদের স্বাস্থ্য পান করছি! হুররা!… চিৎকার করে বলে গ্লাসটা খালি করে আনাতোল সেটাকে মেঝেতে ছুঁড়ে দিল।
