দলখভ সশব্দে ডেস্কের ডালাটা বন্ধ করে আনাতোলের দিকে ফিরে বলল, বুঝে দেখ। এসব ঝামেলা না করাই ভালো। এখনো সময় আছে।
আনাতোল পাল্টা জবাব দিল, মূর্খ! বাজে কথা বল না! শুধু যদি জানতে…শয়তানই শুধু জানে!
দলখভ বলল, না, সত্যি বলছি, এ মতলব ছেড়ে দাও। আমি মন থেকেই বলছি। যে মতলব আমরা ভেঁজেছি সেটা তামাশার ব্যাপার নয়।
আনাতোল মুখ ভেংচে বলল, আবার বিরক্ত করছ? তুমি উচ্ছন্নে যাও। তোমার এইসব বোকা তামাশার সময় এটা নয়। সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দলখভের মুখে ঘৃণা ও করুণার হাসি দেখা দিল।
আনাতোলকে ডেকে বলল, একটু অপেক্ষা কর। আমি ঠাট্টা করছি না। কাজের কথাই বলছি। এখানে এস, এখানে এস।
আনাতোল ফিরে এল। দলখভের দিকে তাকিয়ে রইল।
এবার আমার কথা মন দিয়ে শোন। এই শেষবারের মতো বলছি। এ নিয়ে ঠাট্টা করব কেন? আমি কি তোমাকে বাধা দিয়েছি। সব ব্যবস্থা কে করেছে? কে পুরোহিত খুঁজে এনেছে, কে পাসপোর্ট পাইয়ে দিয়েছে? কে টাকা তুলেছে? সব আমি করেছি।
বেশ তো সেজন্য তোমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। তুমি কি মনে কর আমি যথেষ্ট কৃতজ্ঞ নই? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনাতোল দলখভকে আলিঙ্গন করল।
আমি তোমাকে সাহায্য করছি, কিন্তু তবু তোমাকে সত্য কথাটা বলা দরকার। এ বড় বিপজ্জনক কাজ, একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে-কাজটা বোকামি। দেখ, তুমি যদি তাকে হরণ করে আন–ঠিক আছে! কিন্তু তারা কি সেখানেই ব্যাপারটাকে থামকে দেবো তোমার যে আগেই বিয়ে হয়েছে সেটাও জানাজানি হয়ে যাবে। তাহলে, তারা তোমাকে ফৌজদারি আদালতে নিয়ে তুলবে…।
আঃ, যত বাজে কথা, বাজে কথা! আনাতোল আর একবার মুখ ভেংচাল। আমি কি তোমাকে সব কথা বুঝিয়ে বলিনি? একটা আঙুল বাঁকিয়ে সে বলে চলল, তোমাকে কি বুঝিয়ে বলিনি যে এই সিদ্ধান্তে আমি এসেছি : এই বিয়ে যদি অসিদ্ধ হয়, তাহলে আমার কৈফিয়ৎ দেবার কিছুই থাকবে না, কিন্তু বিয়েটা যদি সিদ্ধ হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই! বিদেশে এ বিষয়ে কেউ কিছু জানতে পারবে না। তাই নয় কি? কাজেই এ নিয়ে আমাকে কিছু বলল না, বলো না, বলো না!
সত্যি বলছি, এ মতলব ছেড়ে দাও! এর ফলে তুমি অনেক গোলমালে জড়িয়ে পড়বে।
তুমি উচ্ছন্নে যাও! চিৎকার করে উঠে মাথা চুল চেপে ধরে আনাতোল ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আবার সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসে দলখভের সামনেকার হাতল চেয়ার দুই পা মুড়ে বসে পড়ল। স্বয়ং শয়তান বাসা বেঁধেছে। কি বুঝছ? দেখ, কেমন ঢিপঢিপ করছে! দলখভের হাতটা নিজের বুকে রাখল। ভাইরে, কী সে পা! কী চাউনি! দেবী! সে ফরাসিতে বলল। কী?
দলখভ নিরাসক্ত হাসি হেসে দুটি সুন্দর চোখ মেলে তার দিকে তাকালযেন তার কাছ থেকে আরো কিছুটা মজা পেতে চাইছে।
বেশ তো, কিন্তু যখন টাকা ফুরিয়ে যাবে তখন?
তখন আবার কি? অ্যাঁ? ভবিষ্যতের চিন্তায় আনাতোল বিব্রত বোধ করল। তখন কি হবে?…তখন, আমি জানি না।…কিন্তু কেন বাজে কথা বলছ! সে ঘড়ি দেখল! সময় হয়ে গেছে!
আনাতোল ভিতরের ঘরে চলে গেল।
চাকরদের ধমক দিয়ে বলল, এতক্ষণে! প্রায় তৈরি? তোমরা সব ঘুরে বেড়াচ্ছ?
দলখভ টাকাটা সরিয়ে রেখে একটি পরিচারককে পাঠাল যাত্রার আগে কিছু খাদ্য-পানীয় আনতে। তারপর যে ঘরে খভস্তিকভ ও মাকারিন বসে আছে সেখানে গেল।
কনুইতে ভর দিয়ে আনাতোল একটা সোফায় শুনে আছে। মুখে বিষণ্ণ হাসি, সুন্দর ঠোঁট দুটি নাড়িয়ে আপন মনেই কি যেন বলছে।
পাশের ঘর থেকে দলখভ হাঁক দিল, এস, কিছু খেয়ে নাও। একচুমুক পান কর।
আনাতোল হেসে জবাব দিল, আমার ইচ্ছা করছে না।
এস! বলগা এসেছে।
আনাতোল উঠে খাবার ঘরে গেল। বলগা একজন বিখ্যাত ব্ৰয়তা চালক। দলখভ ও আনাতেলের সঙ্গে তার ছবছরের পরিচয়, এয়তা নিয়ে তাদের অনেক সেবা সে করেছে। আনাগোলের রেজিমেন্ট যখন তিভারে ছিল তখন একাধিকবার সে তাকে রাতে তিভার থেকে বয়কায় তুলে ভোরে মস্কো পৌঁছে দিয়েছে, আবার পরদিন রাত্রে তাকে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছে। কেউ পিছু নিলে একাধিকবার সে দলখভকে পালাতে সাহায্য করেছে। তাদের নিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে মস্কোর রাজপথে অনেকবার সে পদযাত্রীদের চাপা দিয়েছে, অনেক গাড়ি উল্টে দিয়েছে, আর সবসময়ই আমার ভদ্রলোকদের দ্বারা ফলাফলের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে। তাদের সেবায় তার একাধিক ঘোড়া নষ্ট হয়েছে। একাধিকবার তারা তাকে প্রহার করেছে, আবার একাধিকবার তাকে শ্যাম্পেন ও মদিরাও খাইয়েছে। আবার দুজনের প্রত্যেকেরই এমন একাধিক কথা সে জানে যা যে কোনো সাধারণ মানুষকে অনেককাল আগেই সাইবেরিয়ায় পাঠিয়ে ছাড়ত। তারাও প্রায়ই বলগাকে তাদের নরকে ডেকে আনে, মদ গেলায়, জিপসিদের সঙ্গে নাচায়, তাদের একাধিক হাজার রুবল তার হাত দিয়েই খরচ হয়েছে। তাদের সেবায় বছরে বিশবার করে তার গায়ের চামড়া ও জীবনকে বিপন্ন করেছে, আর এত বেশি ঘোড়া নষ্ট করেছে যা তাদের কাছ থেকে পাওয়া টাকায় কিনতে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাদের দুজনকে সে ভালোবাসে, ঘণ্টায় বারো মাইল বেগে পাগলের মতো এয়কা চালাতে ভালোবাসে, অন্য চালককে উল্টো দিতে, কোনো পদযাত্রীকে চাপা দিতে এবং মস্কোর রাজপথে জোরকদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিতে ভালোবাসে। তাদের দুজনকে সে সত্যিকারের ভদ্রলোক বলে মনে করে।
