আবার! আবার! নাতাশা বাধা দিল।
নাতাশা, তোমার জন্য আমার ভয় হয়!
কিসের ভয়?
ভয় হচ্ছে তুমি নিজের সর্বনাশ করতে চলেছ, দৃঢ়কণ্ঠে সোনিয়া বলল, আর নিজের কথায় নিজেই আতংকিত হয়ে উঠলে।
নাতাশার মুখে পুনরায় ক্রোধের প্রকাশ দেখা দিল।
সর্বনাশের পথেই আমি যাব, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাব! সেটা তোমার ব্যাপার নয়! কষ্ট তো তুমি পাবে না, পাব আমি। আমাকে একা থাকতে দাও, একা থাকতে দাও! তোমাকে আমি ঘৃণা করি!
সোনিয়ার সঙ্গে নাতাশা আর একটি কথাও বলল না, তাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। সেই একই ক্ষুব্ধ বিস্ময় ও অপরাধবোধ নিয়ে সে বাড়িময় ঘুরে বেড়াতে লাগল, এই একটা কাজে হাত দেয়, আবার আর একটা কাজে হাত দেয়, তারপর সেটাও ছেড়ে দেয়।
এ অবস্থা সোনিয়ার পক্ষে কষ্টদায়ক, সে বন্ধুর উপর নজর রাখল, কখনো তাকে চোখের আড়ালে যেতে দিল না।
কাউন্ট ফিরে আসার আগের দিন নাতাশা সারা সকালবেলাটা বসার ঘরের জানালার পাশে বসে রইল, যেন কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে, বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় জনৈক অফিসারকে কিছু ইঙ্গিতও করল, সোনিয়ার ধারণা লোকটি আনাতোল।
সোনিয়া বন্ধুর উপর আরো কড়া নজর রাখল, লক্ষ্য করল, ডিনারের সময় এবং সারাটা সন্ধ্যা নাতাশা একটা অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে কাটাল। কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করলে কদাচিৎ জবাব দেয়, কথা শুরু করে শেষ করে না, সবকিছুতেই হাসতে থাকে।
চায়ের পরে সোনিয়া দেখল, একটি দাসী। ভিতরে ঢুকবার অপেক্ষায় সভয়ে নাতাশার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। নাতাশা দরজা খুলে দাসীকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিল। সোনিয়া দরজায় কান পেতে বুঝতে পারল, আরো একটা চিঠি দেওয়া হল।
সহসা সে পরিষ্কার বুঝতে পারল, সেদিন সন্ধ্যায় নাতাশা একটা কোনো ভয়ংকর মতলব এঁটেছে। সে দরজায় টোকা দিল। নাতাশা দরজা খুলল না।
সোনিয়া ভাবল, ওরা পালিয়ে যাবে! নাতাশা সব পারে। আজ তার মুখটা অতিশয় করুণ ও কঠোর দেখাচ্ছে। হ্যাঁ, ঠিক তাই, সে আনাতেলের সঙ্গে পালিয়ে যাবে, কিন্তু এখন আমি কি করি? কাউন্ট বাইরে গেছেন। আমি কি করি? কুরাগিনকে চিঠি লিখে কৈফিয়ৎ চাইব? কিন্তু তাকে জবাব দিতে বাধ্য করব কি দিয়ে? পিয়েরকে চিঠি লিখব? প্রিন্স আন্দ্রু তো বলে গিয়েছে কোনো দুর্ভাগ্যজনক কিছু ঘটলে তাকেই জানাতে।…কিন্তু সে হয় তো ইতিমধ্যেই বলকনস্কিকে প্রত্যাখ্যান করেছে–গতকালই সে প্রিন্সেস মারিকে চিঠি লিখেছে। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাকে একথা জানানোও সোনিয়ার কাছে ভয়ংকর বলে মনে হল। অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সোনিয়া ভাবতে লাগল : যাই হোক না কেন, এই পরিবারের উপকারের কথা যে আমার মনে আছে, নিকলাসকে যে আমি ভালোবাসি, সেকথা যদি আজ প্রমাণ করতে না পারি তো আর কোনোদিনই পারব না। হ্যাঁ, তিনটে রাতও যদি ঘুমুতে না পারি তবু এই বারান্দা ছেড়ে যাব না। তাকে জোর করে ধরে রাখব, পরিবারের মুখে কলংক লাগতে দেব না।
.
অধ্যায়-১৬
আনাতোল ইদানীং দলখভদের সঙ্গেই আছে। কয়েকদিন আগেই নাতালি রস্তভাকে অপহরণের মতলব ভাজা হয়েছে, আর দলখভই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি করেছে, নাতাশার দরজায় কান পেতে সব কথা শুনে সোনিয়া যেদিন সংকল্প নিল যে তাকে রক্ষা করবেই, সেইদিনই ওই মতলব হাসিল করার কথা। নাতাশা কথা দিয়েছে রাত দশটার সময় সে খিড়কির দরজায় কুরাগিনের সঙ্গে মিলিত হবে। কুরাগিন একটা এয়কা প্রস্তুত রাখবে এবং নাতাশাকে তাতে চড়িয়ে চল্লিশ মাইল দূরের কামেংকা গ্রামে পৌঁছবে, আর সেখানেই তাদের বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য একজন পুরোহিতকে হাজির করা হবে। কামেংকা থেকে পর পর ঘোড়া পালটিয়ে তারা ওয়ারস এর বড় রাস্তায় পৌঁছবে এবং সেখান থেকে ডাক-ঘোড়ায় চেপে দ্রুত বিদেশে পাড়ি দেবে।
আনাতোলের একটা পাসপোর্ট আছে, ডাক-ঘোড়ার হুকুম-নামা আছে, বোনের দেওয়া দশ হাজার রুবল আছে, এবং দলখভের সাহায্যে কর্জ-করা আরো দশ হাজার আছে।
এই নকল বিয়ের দুই সাক্ষী খভস্তিকভ ও মাকারিন দলখভের সামনের ঘরে বসে চা খাচ্ছে। খভস্তিকভ একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্ষুদে কর্মচারী, দলখভের জুয়াখেলার সহযোগী, আর মাকারিন একজন অবসরপ্রাপ্ত হুজার, দুর্বলচিত্ত ভালো মানুষ, কুরাগিনের প্রতি তার অসীম স্নেহ।
দলখভ বড় পড়ার ঘরটাকে একটা খোলা ডেস্কের সামনে বসেছিল। ঘরের দেয়াল জুড়ে ঝুলছে পারসিক কম্বল, ভালোকের চামড়া ও অস্ত্রশস্ত্র। দলখভের পরনে ভ্রমগোপযোগী জোব্বা ও উঁচু বুট। ডেস্কের উপরে রয়েছে একটা গণনা-ফলক ও কয়েক বান্ডিল নোট। ইউনিফর্মের বোম খোলা অবস্থায়ই আনাতোল তিনটে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে : এক ঘরে সাক্ষীরা বসে আছে, পড়ার ঘর, এবং পিছনের ঘর যেখানে তার ফরাসি খানসামা ও অন্যরা মিলে তার শেষ জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে।
দলখভ বলল, তাহলে, খভস্তিকভকে দিতে হবে দু-হাজার।
তাহলে দিয়ে দাও, আনাতোল বলল। মাকার্কা (মাকারিনের ডাক-নাম) বিনা পারিশ্রমিকেই তোমার জন্য যে-কোনো বিপদকে বরণ করতে প্রস্তুত। কাজেই আমাদের সব হিসাব মিটে গেল। দলখভ কাগজটা দেখিয়ে বলল। ঠিক আছে তো?
নিশ্চয় আছে, দলখভের কথায় কান না দিয়েই আনাতোল হাসিমুখে বলল, সে হাসিটি তার মুখে লেগেই আছে।
