কী বোকামি, ভেরা বলল, তোমার জন্য আমি লজ্জিত। গোপন কথাই বটে!
একটু গরম হয়ে নাতাশা বলল, সকলেরই নিজস্ব কিছু গোপন কথা থাকে। তোমার ও বের্গের ব্যাপারে তো আমরা নাক গলাই না।
ভেরা বলল, না গলানোই উচিত, কারণ আমার আচরণে কখনো অন্যায় কিছু থাকে না। কিন্তু বরিসের সঙ্গে তোমার আচরণের কথা আমি এখনই মামণিকে বলে দেব।
বরিস বলল, নাতালিয়া ইলয়িনিচনা আমার প্রতি খুব ভালো ব্যবহারই তো করে। আমার কোনো অভিযোগ নেই।
থাম বরিস! তুমি এমনই এক কূটনীতিক যে আমরা বিরক্ত হয়ে উঠেছি, ঈষৎ কাঁপা ক্ষুব্ধ গলায় নাতাশা কথা বলল। (কূটনীতিক কথাটা এখন ছেলেমেয়েদের মধ্যে খুবই চলতি; একটা বিশেষ অর্থেই সে কথাটা ব্যবহার করল।) আমাকে ও বিরক্ত করে কেন? তারপর ভেরার দিকে ফিরে বলল, এ সব তুমি কোননাদিন বুঝবে না! কারণ তুমি কোনোদিন কাউকে ভালোবাসনি। তোমার হৃদয় বলে কিছু নেই। তুমি একটি মাদাম দ্য জেনলিস, তার বেশি কিছু নয় (এই ডাক নামটা ভেরাকে দিয়েছে নিকোলাস; এটাতে যথেষ্ট হুল আছে বলে মনে করা হয়), আর মানুষের প্রতি বিরূপ ব্যবহার করাতেই তোমার সবচাইতে বেশি আনন্দ! যাও, বের্গের সঙ্গে যত পার প্রেম-প্রেম খেলা করগে।
আর যাই করি আমি কখনো অতিথিদের সামনে একটা ছেলের পিছনে ছুটব না…
নিকোলাস বলল, দেখ, তুমি যা চেয়েছিলে তা করেছ, প্রত্যেককে কতকগুলি অপ্রীতিকর কথা বলেছ, তাদের বিপর্যস্ত করেছ। চল, আমরা নার্সারিতে যাই।
একদল সন্ত্রস্ত পাখির মতো চারজন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ভেরা বলল, অপ্রীতিকর কথা আমাকেই বলা হয়েছে, আমি কাউকে বলি নি।
দরজার পথে অনেকগুলো হাস্যমুখর গলার শব্দ ভেসে এল, মাদাম দ্য জেনলিস! মাদাম দ্য জেনলিস!
প্রত্যেককে বিরক্ত করে তুললেও সুন্দরী ভেরা কিন্তু হাসতে লাগল; এসব কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে আয়নার কাছে গিয়ে সে চুল ও গলবন্ধ ঠিক করতে লাগল। নিজের সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে সে যেন আরো নির্বিকার ও শান্ত হয়ে উঠল।
.
বসবার ঘরে তখনো আলোচনা চলছে।
কাউন্টেস বলছে, দেখ ভাই, আমার জীবনটাও কিছু শুধুই গোলাপে ছাওয়া নয়। যে ভাবে আমরা জীবন চালাচ্ছি তাতে আমাদের সামর্থে যে বেশিদিন কুলোবে না তা কি আমি জানি না? কেবল ক্লাব আর ক্লাব, আর আলস্যে গা ঢেলে দেওয়া। গ্রামে গিয়েও কি বিশ্রাম আছে? থিয়েটার, শিকার, আর কি যে নয় তা ঈশ্বরই জানেন! কিন্তু আমার কথা থাক; তুমি কেমন চালাচ্ছ তাই বল। তোমাকে দেখে আমি তো অবাক হয়ে যাই। আনেৎ,–এই বয়সেও কেমন করে তুমি গাড়ি হাঁকিয়ে একা মস্কো যাচ্ছ, পিটার্সবুর্গ যাচ্ছ, মন্ত্রী ও বড় বড় সব লোকদের সঙ্গে দেখা করছ, তাদের দিয়ে কার্যোদ্ধার করছ! খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার। কেমন করে সব ব্যবস্থা করে ফেলবে? আমি সম্ভবত এ কাজ করতে পারতাম না।
আন্না মিখায়লভনা জবাব দিল, হায় প্রিয় সখী, ঈশ্বর করুন একটি ছেলেকে নিয়ে নিঃসম্বল অবস্থায় বিধবা হওয়া যে কি জিনিস তা যেন তোমাকে কখনো জানতে না হয়। সে অবস্থায় পড়লে মানুষকে অনেক কিছু শিখতে হয়। সেই মামলাটা আমাকে অনেক শিখিয়েছে। যখন কোনো বড় মানুষের সঙ্গে দেখা করতে হয় তখনই একটা চিঠি লিখি : প্রিন্সেস অমুকের ইচ্ছা অমুকের সঙ্গে একবার দেখা করবে, তারপর একটা গাড়ি নিয়ে দুবার, তিনবার, চারবার–যতক্ষণ কার্যসিদ্ধি না হয় ততক্ষণ নিজেই তার কাছে যাই।
কাউন্টেস জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, বরির ব্যাপারে তুমি কার কাছে আবেদন জানিয়েছিলে? দেখ তো, তোমার ছেলে এর মধ্যেই রক্ষীবাহিনীর অফিসার হয়ে গেল, আর আমার নিকোলাস যাচ্ছে সমরশিক্ষার্থী ক্যাডেট হয়ে। তার হয়ে কথা বলবার কেউ নেই। তুমি কাকে ধরেছিলে?
প্রিন্স ভাসিলিকে। তিনি খুব দয়া দেখিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজি হয়ে গেলেন এবং সম্রাটের কাছে ব্যাপারটা তুললেন। উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য তাকে যে সব অসম্মান সইতে হয়েছিল তা ভুলে গিয়ে প্রিন্সেস আন্না মিখায়লভনা বেশ উৎসাহের সঙ্গে কথাগুলি বলল।
প্রিন্স ভাসিলি কি খুব বুড়ো হয়েছেন? কাউন্টেস জানতে চাইল। রুমিয়ান্তসভদের থিয়েটারে একসঙ্গে অভিনয় করার পরে আর তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয় নি। মনে হয় তিনি আমাকে ভুলেই গেছেন। সে সময় কিন্তু আমার দিকে তাঁর নজর ছিল, কাউন্টেস হেসে বলল।
আন্না মিখায়লভনা জবাব দিল, তিনি ঠিক আগের মতোই আছেন, অমায়িকতায় একেবারে উপচে পড়েন। পদমর্যাদা তাঁর মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেয় নি। আমাকে বললেন, প্রিয় প্রিন্সেস, আপনার জন্য মাত্র এইটুকু করতে পারছি বলে আমি দুঃখিত। আপনার কথা আমি সব সময় মনে রাখব। সত্যি, তিনি চমৎকার লোক, আর খুব দয়ালু আত্মীয়। কিন্তু আমার ছেলেকে আমি কত ভালোবাসি তা তো তুমি জান নাতালি : তার সুখের জন্য আমি সবকিছু করতে রাজি! আর আমার সংসারের অবস্থা এখন এত খারাপ যে আমার অবস্থা অতি ভয়ংকর। আন্না মিখায়লভনা গলা নামিয়ে বলতে লাগল, হতভাগা মামলাটার জন্য আমি সর্বস্ব খুইয়েছি, অথচ মামলা ঝুলেই আছে। তুমি কি বিশ্বাস করবে যে আমার হাতে একটি পেনিও নেই; কি করে যে বরির পোশাক কিনব জানি না। রুমাল বের করে কাঁদতে শুরু করল। পাঁচশ রুবল আমার দরকার আর আছে মাত্র পঁচিশ রুবলের একখানা নোট। এই তো আমার অবস্থা…এখন আমার একমাত্র ভরসা কাউন্ট সিরিল ভাদিমিরভিচ বেজুকভ। তিনি যদি তার ধর্মছেলেকে সাহায্য না করেন-তুমি তো জান তিনি বরির ধর্মবাপ-এবং তার খরচপত্রের জন্য কিছু না দেন, তাহলে আমার সব পরিশ্রমই বৃথা হয়ে যাবে।…তার পোশাকের ব্যবস্থাই আমি করতে পারব না।
