নাতাশার এই ভীতি লক্ষ্য করে সোনিয়া বন্ধুর জন্য লজ্জায় ও করুণায় কেঁদে ফেলল।
প্রশ্ন করল, কিন্তু তোমাদের দুজনের কি হয়েছে? সে তোমাকে কি বলেছে সে কেন এ বাড়িতে আসে না?
এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নাতাশা দিল না। মিনতি করে বলল, ঈশ্বরের দোহাই সোনিয়া, কাউকে কিছু বলল না, আমাকে কষ্ট দিও না। মনে রেখো, এসব ব্যাপারে অন্যের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়! তোমাকে বিশ্বাস করে সব বললাম…
তবু সোনিয়া বলল, কিন্তু এই গোপনীয়তা কেন? কেন সে এ বাড়িতে আসে না? কেন প্রকাশ্যে তোমার পাণিপ্রার্থনা করছে না? তুমি তো জান প্রিন্স আন্দ্রুন্তু তোমাকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে–তাই যদি সত্য হয়, কিন্তু আমি একথা বিশ্বাস করি না! নাতাশা, তুমি কি ভেবে দেখেছ এই গোপন কারণগুলি কি হতে পারে?
নাতাশা অবাক হয়ে সোনিয়ার দিকে তাকাল। এই প্রথম এ প্রশ্নটা তার মনে এসেছে, কি জবাব দেবে তা সে জানে না।
কারণগুলি কি তা আমি জানি না। কিন্তু নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে!
সোনিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে লাগল।
যদি কোনো কারণ থাকে… সোনিয়া বলতে শুরু করল।
তার সন্দেহটা বুঝতে পেরে নাতাশা সভয়ে তাকে বাধা দিল।
সোনিয়া, তাকে সন্দেহ করা যায় না! যায় না, যায় না! বুঝতে পারছ না?
সে তোমাকে ভালোবাসে?
বন্ধুর বুদ্ধির অভাব দেখে করুণার হাসি হেসে নাতাশা তার কথাটারই পুনরাবৃত্তি করল, সে আমাকে ভালোবাসে কি না? সে কি, তুমি তো এই চিঠিটা পড়েছ, তাকে দেখেছ।
কিন্তু সে যদি সম্মানবোধহীন হয়?
সে! সম্মানবোধহীন? শুধু যদি জানতে! নাতাশা উচ্ছ্বসিত গলায় বলল।
সে যদি সম্মানিত লোক হয় তো তার উচিত মনের কথা প্রকাশ্যে বলা, অথবা তোমার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ করা, আর তুমি যদি একাজ না কর তো আমি করব। আমি তাকে চিঠি লিখব, বাপিকে বলব! সোনিয়া দৃঢ়কণ্ঠে বলল।
কিন্তু তাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না! নাতাশা বলল।
নাতাশা, আমি তোমাকে বুঝতে পারছি না। আর তুমি এসব কি বলছ! তোমার বাবার কথা, নিকলাসের কথা ভাব।
আমি কাউকে চাই না, তাকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসি না। তাকে সম্মান-জ্ঞানহীন বলবার সাহস তোমার হল কেমন করে? নাতাশা আর্তনাদ করে উঠল।
চলে যাও সোনিয়া। আমি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না, কিন্তু তুমি চলে যাও, ঈশ্বরের দোহাই, চলে যাও! দেখছ আমি কত কষ্ট পাচ্ছি! নাতাশা সক্রোধে চেঁচিয়ে বলল, হতাশা ও চাপা বিরক্তি তার গলায়। সোনিয়া ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে ছুটে চলে গেল।
নাতাশা টেবিলে গিয়ে বসল এবং মুহূর্তমাত্র চিন্তা না করে সারা সকাল যে কথা লিখতে পারেনি প্রিন্সেস মারির চিঠির জবাবে সেই কথাই লিখে ফেলল। চিঠিতে সে লিখল, তাদের মধ্যে সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে, বিদেশে যাবার সময় তার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু যে মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে গেছে তারই সুযোগ নিয়ে সে প্রিন্সেস মারিকে মিনতি করছে, সে যেন সবকিছু ভুলে যায়, তার প্রতি সে যদি কোনো অন্যায় করে থাকে তো তাকে যেন ক্ষমা করে, কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রুর স্ত্রী হতে সে পারবে না। সেইমুহূর্তে নাতাশার কাছে এসবকিছুই একান্ত সহজ, সরল, স্পষ্ট বলে মনে হল।
শুক্রবারে রস্তভদের দেশে ফিরে যাবার কথা, কিন্তু বুধবারেই একজন ভাবী ক্রেতাকে সঙ্গে নিয়ে কাউন্ট তার মস্কোর নিকটবর্তী জমিদারিতে চলে গেল।
কাউন্ট যেদিন চলে যায় সেইদিনই কারাগিনদের বাড়ির একটা বড় ডিনার-পার্টিতে সোনিয়া ও নাতাশার নিমন্ত্রণ হল, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা দুজনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গেল। সেই পার্টিতে আনাতেলের সঙ্গে নাতাশার আবার দেখা হল। সোনিয়া লক্ষ্য করল, তারা এমনভাবে কথা বলছে যাতে অন্য কেউ শুনতে না পায়, আর আগাগোড়াই নাতাশাকে আগের চাইতেও বেশি উত্তেজিত মনে হচ্ছে। বাড়ি ফিরে নাতাশা নিজের থেকেই প্রসঙ্গটা তুলল।
ছেলেমানুষি আত্মতুষ্টির স্বরে বলল, এই তো সোনিয়া, তার সম্পর্কে কত আজেবাজে কথাই তুমি বলেছ। আজ সব বোঝাঁপড়া হয়ে গেল।
আচ্ছা, কি হল? সে কি বলল? তুমি যে আমার উপর রাগ করনি সেজন্য আমি খুশি হয়েছি নাতাশা! আমাকে সব কথা বল-পুরো সত্যটা বল। সে কি বলেছে?
নাতাশা চিন্তিত হল।
আঃ, সোনিয়া, আমার মতো করে তুমি যদি তাকে জানতে! সে বলেছে…সে আমার কাছে জানতে চাইল, বলকনস্কিকে আমি কি কথা দিয়েছি। তাকে প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা যে আমার কাছে তাতে সে খুশি হয়েছে।
সোনিয়া সখেদে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বলল, কিন্তু তুমি তো বলকনস্কিকে প্রত্যাখ্যান করনি?
হয় তো করেছি। হয় তো আমার ও বলকনস্কির মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তুমি আমাকে এত খারাপ ভাবছ কেন?
আমি কিছুই ভাবছি না, শুধু এটা বুঝতে পারছি না…।
একটু সবুর কর সোনিয়া, সব বুঝতে পারবে। সে যে কী মানুষ তা দেখতে পাবে! আমাকে বা তাকে খারাপ ভেব না। আমি কাউকে খারাপ ভাবি না : সকলকেই আমি ভালোবাসি, করুণা করি। কিন্তু আমি কি করব?
নাতাশার মিষ্টি কথায় সোনিয়া ভুলল না। নাতাশার মুখ যত বেশি আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠল, সোনিয়ার মুখ তত বেশি গম্ভীর ও কঠিন হয়ে উঠল।
বলল, নাতাশা, তুমিই আমাকে বলেছিলে তোমার সঙ্গে কথা না বলতে, কিন্তু এখন তুমিই কথাটা তুলেছ। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না নাতাশা। এই গোপনীয়তা কেন?
