আনাতোলের হয়ে দলখভ কর্তৃর্ক খসড়া করা সেই আবেগ-ভরা প্রেম-পত্র কম্পিত হাতে তুলে ধরে পড়তে পড়তে সে তার মধ্যে নিজের মনের কথার প্রতিধ্বনিই যেন শুনতে পেল।
গতকাল সন্ধ্যা থেকে আমার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে : তোমার ভালোবাসা পাওয়া অথবা মৃত্যুকে বরণ করা। আমার সামনে আর কোনো পথ নেই, এইভাবে চিঠি শুরু হয়েছে। তারপর লিখেছে, সে জানে নাতাশার বাবা-মা তাকে তার হাতে তুলে দেবেন না-এমন কিছু গোপন কারণ আছে যা শুধু নাতাশার কাছেই সে বলতে পারে–কিন্তু নাতাশা যদি তাকে ভালোবাসে তাহলে সে শুধু একবার বলুক হ্যাঁ, তাহলে কোনো মানুষের শক্তি নেই তাদের সুখে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। প্রেম সর্বজয়ী। সে নাতাশাকে চুরি করে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবে।
চিঠিটা বিশবার পড়ে, প্রতিটি শব্দের মধ্যে একটা গভীর অর্থ আবিষ্কার করে নাতাশা ভাবল, হ্যাঁ, যা, আমি তাকে ভালোবাসি!
সেদিন সন্ধ্যায় মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার আখারভদের বাড়ি যাবার কথা, মেয়েদের সঙ্গে করে নিয়ে যাবার প্রস্তাব করতে নাতাশা মাথা ধরার কথা বলে বাড়িতেই থেকে গেল।
.
অধ্যায়-১৫
সন্ধ্যার পরে একটু দেরি করে বাড়ি ফিরে সোনিয়া নাতাশার ঘরে গেল। নাতাশা তখনো পোশাক-পরা অবস্থায়ই সোফার উপর ঘুমিয়ে আছে দেখে সে অবাক হল। তার পাশেই টেবিলের উপর আনাতোলের চিঠিটা খোলা পড়ে আছে। সোনিয়া চিঠিটা তুলে পড়ল।
পড়তে পড়তেই ঘুমন্ত নাতাশার দিকে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করল সে যা পড়ছে তার কোনো আভাস নাতাশার মুখে আছে কি না, কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। মুখখানি শান্ত, নম্র, সুখী। পাছে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় এই ভয়ে বুকটা চেপে ধরে বয়ে ও উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে হাতল-চেয়ারটায় বসে পড়েই সোনিয়া হু হু করে কেঁদে উঠল।
কিছুই আমার চোখে পড়েনি? এতদূর গড়ালই বা কেমন করে? সে কি আর প্রিন্স আন্দ্রুকে ভালোবাসে না? আর কুরাগিনকেই বা সে এতটা আস্কারা দিল কেমন করে? সে যে একটা প্রতারক, শয়তান সেটা তো পরিষ্কার! একথা শুনলে নিকলাস, মহৎ নিকলাস কি করবে? আচ্ছা, গত পরশু, গতকাল ও আজ তার চোখে মুখে যে উত্তেজিত, কঠিন, অস্বাভাবিক ভাব দেখেছি এটাই তার অর্থ। সোনিয়া ভাবতে লাগল। কিন্তু সেই লোকটাকে নাতাশা ভালোবাসে এ তো হতেই পারে না! সম্ভবত কার চিঠি না জেনেই সে চিঠিটা খুলেছে। হয় তো চিঠি পড়ে মনে আঘাত পেয়েছে। একাজ সে করতেই পারে না!
চোখের জল মুছে সোনিয়া পা টিপে টিপে নাতাশার দিকে এগিয়ে গেল।
কোনওমতে শোনা যায় এমনভাবে ডাকল, নাতাশা!
নাতাশা জেগে উঠেই সোনিয়াকে দেখতে পেল।
আচ্ছা, তোমরা ফিরে এসেছ?
তারপরই সোনিয়ার বিমূঢ় ভাব দেখে তার মনেও সন্দেহ দেখা দিল।
জানতে চাইল, সোনিয়া, তুমি চিঠিটা পড়েছ?
হ্যাঁ, সোনিয়া মৃদু গলায় বলল।
নাতাশা উচ্ছ্বসিতভাবে হেসে উঠল।
না সোনিয়া, আমি আর পারছি না। তোমার কাছ থেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারছি না। জান, আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি! সোনিয়া, সোনা, সে লিখেছে…
যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না এমনিভাবে সোনিয়া চোখ বড় বড় করে নাতাশাকে দিকে তাকাল।
আর বলকনস্কি? সে শুধাল।
নাতাশা চেঁচিয়ে বলল, আঃ, সোনিয়া, যদি জানতে আমি এখন কত সুখী! ভালোবাসা যে কি জিনিস তা তুমি জান না…
কিন্তু নাতাশা, সেসবই কি শেষ হয়ে যেতে পারে?
যেন প্রশ্নটা বুঝতে পারছে না এমনিভাবে বিস্ফারিত চোখে নাতাশা সোনিয়ার দিকে তাকাল।
তুমি কি তাহলে প্রিন্স আন্দ্রুকে প্রত্যাখ্যান করছ? সোনিয়া বলল।
আঃ, তুমি কিছু বোঝ না! বাজে কথা বলো না, শোন। সাময়িক বিরক্তির সঙ্গে নাতাশা বলল।
সোনিয়া তবু বলতে লাগল, কিন্তু এ যে আমি বিশ্বাস করতেই পারছি না। বুঝতেও পারছি না। এ কি করে হতে পারে যে তুমি একটা বছর ধরে একজনকে ভালোবাসলে, আর হঠাৎ…আর, তাকে তো তুমি মাত্র তিন দিন দেখেছ! নাতাশা, তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না, তুমি ঠাট্টা করছ! তিন দিনে সব ভুলে গিয়ে…
নাতাশা বলল, তিন দিন? মনে হচ্ছে একশ বছর ধরে তাকে আমি ভালোবেসেছি। মনে হচ্ছে তার আগে কাউকে ভালোবাসিনি। তুমি এসব বুঝতে পারবে না। সোনিয়া, একটু সবুর কর, এখানে বস। নাতাশা তাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল।
এরকম যে ঘটে তা আমি শুনেছি, তুমিও নিশ্চয় শুনেছ, কিন্তু এই প্রথম এ ভালোবাসার স্বাদ পেলাম। এ ভালোবাসা আগেকার মতো নয়। তাকে দেখামাত্রই মনে হল সে আমার প্রভু আর আমি তার দাসী, তাকে না ভালোবেসে থাকতে পারলাম না। হ্যাঁ, তার দাসী! সে যা হুকুম করবে আমি তাই করব। সেসব তুমি বুঝতে পারবে না। আমি কি করতে পারি সোনিয়া? আমি কি করতে পারি? চোখে-মুখে সুখের অথচ ভয়ের ভাব ফুটিয়ে নাতাশা বলতে লাগল।
সোনিয়াও উঁচু গলায় বলল, কিন্তু তুমি কি করছ সেটা ভেবে দেখ। আমি তো হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। এই গোপন চিঠিপত্র…তাকে এতদূর যেতে দিলে কেমন করে?
নাতাশা জবাব দিল, বলেছি তো আমার নিজের কোনো ইচ্ছা নেই। তুমি কেন বুঝতে পারছ না? আমি তাকে ভালোবাসি!
তাহলে আমি এ হতে দেব না।…আমি বলে দেব! চোখের জল ফেলে সোনিয়া বলল।
কি বলতে চাও তুমি? ঈশ্বরের দোহাই…যদি বলে দাও তো তুমি আমার শত্রু! নাতাশা ঘোষণা করল। তুমি চাও আমি দুঃখ পাই, তুমি চাও আমাদের ছাড়াছাড়ি হোক…
