আচ্ছা, আর তিনি? কাউন্ট জিজ্ঞাসা করল।
তিনি? তিনি তো আধা পাগল…আমার কোনো কথাই শুনবেন না। কিন্তু কথা বাড়িয়ে লাভ কি? মেয়েটা তো এদিকে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল। আমার পরামর্শ শুনুন, এখানকার কাজ শেষ করে অত্রানুর বাড়িতে চলে যান…সেখানে অপেক্ষা করুন।
না, না। নাতাশা জোর গলায় বলে উঠল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল, হ্যাঁ, ফিরে যাও, সেখানেই অপেক্ষা কর। তোমাদের ভাবী বর যদি এখানে আসে-তাহলে একটা ঝগড়াঝাটি কিছুতেই এড়ানো যাবে না। কিন্তু বুড়োকে একা পেলে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে তারপর সে তোমাদের কাছে যেতে পারবে।
কাউন্ট রস্তভ এ পরামর্শের যুক্তিবত্তার প্রশংসা করে এটাকে মেনে নিল। বুড়োর মতিগতি যদি ফেরে তো তখন মস্কোতে অথবা বল্ড হিলসে তার সঙ্গে দেখা করাই ভালো হবে, আর তা যদি না হয়, তার অমতেই যদি বিয়েটা হয়, তাহলে তো সে বিয়ে একমাত্র অত্রাদণুতেই হতে পারে।
বুড়ো কাউন্ট বলল, খুব সত্যি কথা। মেয়েকে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম বলে আমি দুঃখিত।
না, না, দুঃখ করছেন কেন? এখানে যখন এসেছেন তখন তাকে শ্রদ্ধা জানানো আপনার কর্তব্য। কিন্তু তিনি যদি তা না চান-সেটা তার ব্যাপার, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল। তাছাড়া, বিয়ের পোশাক তৈরি হয়ে গেছে, কাজেই আর কিসের জন্য এখানে অপেক্ষা করবেন, যা এখনো তৈরি হয়নি, সেগুলো আমি পরে পাঠিয়ে দেব। আপনাদের ছেড়ে দিতে মন চাইছে না, তবু এটাই সেরা ব্যবস্থা। কাজেই ঈশ্বরের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে চলে যান।
হাতের থলের ভিতর থেকে একটা চিঠি বের করে নাতাশার হাতে দিল। প্রিন্সেস মারির চিঠি।
তোমাকে লিখেছে। বেচারি, নিজেকে কত কষ্ট দিচ্ছে। তুমি হয় তো ভেবেছ সে তোমাকে পছন্দ করেনি-তাই নিয়েই তার যত ভয়।
কিন্তু সে তো আমাকে সত্যি পছন্দ করে না, নাতাশা বলল।
বাজে কথা বলো না, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা চেঁচিয়ে উঠল।
আমি কাউকে বিশ্বাস করি না, আমি জানি সে আমাকে পছন্দ করে না, চিঠিটা নিয়ে নাতাশা সাহসের সঙ্গে বলল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল, লক্ষ্মী মেয়ে, ওভাবে কথার জবাব দিতে নেই। আমি যা বলছি সেটাই ঠিক। চিঠির একটা জবাব লিখে দাও!
নাতাশা কোনো জবাব দিল না, প্রিন্সেস মারির চিঠিটা পড়বার জন্য নিজের ঘরে চলে গেল।
প্রিন্সেস মারি লিখেছে, তাদের দুজনের মধ্যে যে ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে সেজন্য সে খুব হতাশ হয়ে পড়েছে। তার বাবার মনোভাব যাই হোক, নাতাশা যেন বিশ্বাস করে যে তার দাদা যাকে পছন্দ করেছে তাকে সে ভালোবাসবেই, কারণ দাদার সুখের জন্য সে সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত।
লিখেছে, অবশ্য মনে করো না যে আমার বাবা তোমার প্রতি বিরূপ। তিনি এখন বৃদ্ধ, অথর্ব, কাজেই ক্ষমার্হ, কিন্তু তিনি ভালো মানুষ, উদার হৃদয়, এবং তার ছেলেকে যে সুখী করতে পারবে তাকেই তিনি ভালোবাসবেন। প্রিন্সেস মারি অনুরোধ করেছে, নাতাশা যেন এমন একটা সময় ঠিক করে দেয় যখন সে এসে নাতাশার সঙ্গে আবার দেখা করতে পারে।
চিঠি পড়া শেষ করে নাতাশা তার জবাব লিখতে লেখার টেবিলে গিয়ে বসল। প্রিয় প্রিন্সেস, যান্ত্রিকভাবে তাড়াতাড়ি ফরাসিতে এটুকু লিখেই সে থামল। আগের দিন সন্ধ্যায় যা সব ঘটেছে তারপরেও সে তার আর কি লিখবে? চিঠিটা সামনে নিয়ে বসে সে ভাবতে লাগল, হ্যাঁ, হ্যাঁ! যা কিছু ঘটেছে, আর এখন তো সবই বদলে গেছে।…তার সঙ্গে কি সব সম্পর্কে ছিঁড়ে ফেলব? সত্যি ফেলব? সে যে ভয়ংকর… এইসব ভয়াবহ চিন্তার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য সে সোনিয়ার কাছে গেল।
ডিনারের পরে নাতাশা আবার তার ঘরে গিয়ে প্রিন্সেস মারির চিঠিটা হাতে নিল। ভাবতে লাগল, এও কি হতে পারে যে সব শেষ হয়ে গেছে? এ কি হতে পারে যে এত তাড়াতাড়ি এই ঘটনাগুলো ঘটার ফলে আগেকার সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে? আগেকার সবটুকু অন্য তীব্রতা নিয়েই প্রিন্স আন্দ্রুর প্রতি ভালোবাসার কথা তার মনে পড়ল, আবার সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝল যে সে কুরাগিনকে ভালোবাসে। সে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিজেকে দেখতে পেল প্রিন্স আন্দ্রুর স্ত্রীরূপে, তার সঙ্গে যে সুখের ছবিগুলি সে এতদিন কল্পনায় এঁকেছে সেসবই তার মনে পড়ল, আবার সেইসঙ্গে গতকাল আনাতোলের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠল।
সম্পূর্ণ বিমূঢ় হয়ে সে নিজেকেই প্রশ্ন করল, সেটাই ভালো হতে পারে না কেন? একমাত্র তাহলেই আমি সম্পূর্ণ সুখী হতে পারতাম, কিন্তু আমাকে যে বেছে নিতে হবে, অথচ তাদের যে-কোনো একজনকে বাদ দিয়ে আমি সুখী হতে পারি না। কিন্তু যা ঘটেছে সেকথা প্রিন্স আন্দ্রুকে বলা বা তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা দুটোই সমান অসম্ভব। সেই একজনকে পেলে কিছুই হারায় না। কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রুর যে ভালোবাসার মধ্যে আমি এতকাল বেঁচেছিলাম তার আনন্দ কি আমাকে সত্যি সত্যি চিরদিনের মতো বিসর্জন দিতে হবে?
একটা রহস্যময় ভঙ্গি করে ঘরে ঢুকে একটি দাসী ফিসফিস করে বলল, শুনুন মিস, একটি লোক এই চিঠিটা আপনাকে দিতে বলল। দাসী চিঠিটা নাতাশার হাতে দিল।
নাতাশা কোনো কিছু না ভেবে যন্ত্রচালিতের মতো চিঠির সিল ভেঙে যা পড়ল সেটা আনাতোলের প্রেম পত্র, চিঠির একটা শব্দও না বুঝেই সে এটুকু বুঝতে পারল যে এ চিঠি যার কাছ থেকে এসেছে তাকে সে ভালোবাসে। হ্যাঁ, তাকে সে ভালোবাসে, অন্যথায় যা ঘটেছে তা ঘটল কেমন করে? তার প্রেমপত্রই বা তার হাতে এল কেমন করে?
