নাতাশা মোটা অভিনেত্রীটির দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু তার সামনে যা ঘটছে তার কিছুই সে দেখল না, শুনল না, বুঝল না। তার শুধু মনে হল এমন একটা আশ্চর্য অর্থহীন জগতে সে এসে পড়েছে যে জগৎ তার পুরনো জগৎ থেকে অনেক দূরে-যে জগতে কি ভালো আর কি মন্দ, কি যুক্তিপূর্ণ আর কি যুক্তিহীন তা জানা অসম্ভব। তার পিছনেই বসে আছে আনাতোল, তার সান্নিধ্য সম্পর্কে সচেতন থাকার ফলে তার মনে জেগেছে প্রত্যাশার একটা শংকিতবোধ।
প্রথম একক আবৃত্তির পরে সকলেই এগিয়ে মাদময়জেল জর্জেসকে ঘিরে উৎসাহ প্রকাশ করতে লাগল।
কাউন্টও ভিড়ের ভিতর দিয়ে অভিনেত্রীটির দিকেই এগিয়ে চলল। নাতাশা তাকে বলল, উনি কী সুন্দরী!
পিছন থেকে আনাতোল বলল, আপনাকে দেখলে কিন্তু তা মনে হয় না! কথাটা সে এমনভাবে বলল যে শুধু নাতাশাটাই সেটা শুনতে পেল। আপনি মনোহারিণী…যে মুহূর্তে আপনাকে দেখেছি তখন থেকেই…
চলে এস নাতাশা, মুখ ফিরিয়ে কাউন্ট বলল।
কয়েকটা আবৃত্তি করে মাদময়জেল জর্জেস চলে গেলে কাউন্টস বেজুখভা অতিথিদের নাচ-ঘরে আমন্ত্রণ জানাল।
কাউন্ট বাড়ি ফিরতে চাইল, কিন্তু হেলেন অনুরোধ করল তারা যেন আজকের বল-নাচটা মাটি করে না দেয়, অগত্যা রস্তভরা থেকে গেল। আনাতোল ভালস-নাচে নাতাশাকে ডাকল এবং নাচের সময় তার কোমরে ও হাতে চাপ দিয়ে বলল, সে একটি কুহকিনী, তাকে সে ভালোবাসে। পরে দুইজনে একটা একোসাসও নাচল, তখন কিন্তু আনাতোল কিছুই বলল না, শুধু নাতাশার দিকে তাকিয়ে রইল। নাতাশা ভীরু চোখ তুলে তার দিকে তাকাল, কিন্তু যা বলতে চেয়েছিল তা বলতে পারল না। চোখ নামিয়ে নিল।
তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমাকে ওসব কথা বলবেন না। আমি বাগদত্তা, অন্যকে ভালোবাসি। সে আবার আনাতোলের দিকে তাকাল।
তার কথায় আনাতোল বিচলিত হয়নি, দুঃখও পায়নি।
আনাতোল বলল, আমাকে ওকথা বলবেন না। আমি কি করব? শুধু বলতে পারি, আপনার ভালোবাসায় আমি পাগল, পাগল হয়ে গেছি! আপনি যে এত মায়াবিনী সেটা কি আমার দোষ?…এবার আমাদের পালা।
নাতাশা উত্তেজিত, উজ্জীবিত, ভীত চোখ মেলে চারদিকে তাকাতে লাগল, খুশিতে ভরপুর। সে সন্ধ্যায় যা ঘটল তার কিছুই সে বুঝল না। একত্রে তারা একোসাস নাচল, গ্রোসভাতের নাচল। বাবা বলল, বাড়ি চল, কিন্তু সে আরো থাকতে চাইল। সে যেখানে যায়, যার সঙ্গেই কথা বলে, আনাতোলের চোখ দুটি সর্বদাই তার উপর স্থিরনিবদ্ধ।
সাজঘর থেকে পোশাক ঠিক করে বেরিয়ে আসার পরে তার হাতখানি ধরে নরম গলায় আনাতোল বলল, আমি তো আপনার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি না, কিন্তু আর কোনো দিন আপনাকে দেখতে পাব না তাও কি সম্ভব? আপনার ভালোবাসায় আমি পাগল। আমি কি কোনো দিন…? পথ আটকে দিয়ে আনাতোল নিজের মুখটা তার মুখের খুব কাছাকাছি নিয়ে এল।
আনাতোলের বড় বড় চকচকে দুটি পুরুষসুলভ চোখ নাতাশার চোখের এত কাছাকাছি এসেছে যে সেই দুটি চোখ ছাড়া আর কিছুই সে দেখতে পাচ্ছে না।
নাতালি? আনাতোল ফিসফিস করে বলল, কিন্তু নাতাশা বুঝতে পারল তার হাতের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছে : নাতালি?
আমি জানি না। আমার কিছু বলার নেই, নাতাশার চোখ দুটি বলল।
জ্বলন্ত ঠোঁটের চাপ পড়ল তার ঠোঁটে, আর ঠিক সেইমুহূর্তে সে মুক্তি পেল, হেলেনের পায়ের শব্দ ও পোশাকের খসখস শব্দ শোনা গেল। নাতাশা মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল, তারপর লাল হয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভয়ার্ত চোখে আনাতোলের দিকে তাকিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল।
একটা কথা, শুধু একটা, ঈশ্বরের দোহাই! আনাতোল চেঁচিয়ে বলল।
নাতাশা থামল। তার একটা কথাই সে শুনতে চায়।
নাতালি, শুধু একটা কথা, শুধু একটা! আনাতোল বার বার বলতে লাগল। কি বলবে বুঝতে না পেরে হেলেন তাদের কাছে না আসা পর্যন্ত আনাতোল একই কথা বলতে লাগল।
হেলেন নাতাশাকে নিয়ে বসার ঘরে ফিরে গেল। নৈশভোজনের জন্য অপেক্ষা না করেই রস্তভরা চলে গেল।
বাড়িতে পৌঁছে নাতাশা সারা রাত ঘুমতে পারল না। সে কাকে ভালোবাসে- আনাতোলকে, না প্রিন্স আন্দ্রুকে, এই মীমাংসার অতীত প্রশ্নই তাকে যন্ত্রণা দিতে লাগল। প্রিন্স আন্দ্রুকে সে ভালোবাসে-গভীরভাবে ভালোবাসে। কিন্তু আনাতোলকেও যে ভালোবাসে তাতেও তো কোনো সন্দেহ নেই। না হলে এসব ঘটল কেমন করে? এরপরেও যদি বিদায় নেবার সময় তার হাসি আমি ফিরিয়ে দিয়ে থাকি, ব্যাপারটাকে এতদূর পর্যন্ত গড়াতে দিয়ে থাকি, তার অর্থ গোড়া থেকেই আমি তাকে ভালোবেসেছি। তার অর্থ, সে দয়ালু, মহৎ, চমৎকার, তাকে ভালো না বেসে আমি পারিনি। আমি যদি তাকে ভালোবেসে থাকি, এবং আর একজনকেও ভালোবেসে থাকি, তাহলে আমি কি করব? এইসব ভয়ংকর প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে না পেয়ে সে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করল।
.
অধ্যায়-১৪
নানা চিন্তাভাবনা ও কর্মব্যস্ততা নিয়ে সকাল এল। সকলে ঘুম থেকে উঠল, চলাফেরা শুরু করল, কথা বলতে লাগল। দর্জিরা আবার এল, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা হাজির হল। প্রাতরাশে সকলের ডাক পড়ল।
প্রাতরাশের পরে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা তার হাতল-চেয়ারটায় বসে নাতাশা ও কাউন্টকে ডেকে আনাল।
তারপর বলতে শুরু করল, শুনুন, সমস্ত ব্যাপারটা আমি ভালো করে ভেবে দেখেছি আর এই আমার পরামর্শ। আপনি জানেন, কাল আমি প্রিন্স বলকনস্কির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তার সঙ্গে কিছু কথাও হয়েছে…হঠাৎ কি মাথায় ঢুকল তিনি চিৎকার করলেন, কিন্তু চিৎকার শুনে ঘাবড়াবার বান্দা আমি নই। আমার যা বলার ছিল তা বলেছি!
