একদিন মাদাম মহাবাটপাড়ের কাছ থেকে একজন দর্জি এল রস্তভদের বাড়ি। নাতাশা মহা খুশি হয়ে বসার ঘরের পাশের ঘরটাতে ঢুকল নতুন পোশাক পরীক্ষা করে দেখতে। হাতাবিহীন একটা বডিস গায়ে দিয়ে পিঠের দিকটা মাপসই হয়েছে কিনা দেখার জন্য আয়নার দিকে মুখ ঘোরাতেই তার কানে এল বাবা ও অন্য একটি স্ত্রীলোকের উচ্ছ্বসিত গলা। স্ত্রীলোকটি হেলেন। নাতাশা বডিসটা খুলে ফেলবার আগেই দরজাটা খুলে গেল, আর লাল ভেলভেটের উঁচু কলারের একটা গাউন পরে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল কাউন্টেস বেজুখভা।
লজ্জারাঙা নাতাশাকে দেখেই চেঁচিয়ে বলল, হায় মায়াবিনী! চমৎকার! না, এর তুলনা হয় না প্রিয় কাউন্ট।কাউন্ট রস্তভ তার সঙ্গেই ঘরে ঢুকেছে। আপনারা মস্কোতে আছেন, অথচ কোথাও যাচ্ছেন না কেন? না, আমি আপনাদের ছাড়ছি না! আজ রাতে মাদময়জেল জর্জেস আমার বাড়িতে আবৃত্তি করে শোনাবেন, কিছু লোকজনও আসবে, আপনি যদি আপনার এই সুন্দর মেয়েদের-এরা তো মাদময়জেল জর্জেসের চাইতেও সুন্দরী নিয়ে না আসেন, তো আপনার সঙ্গে আমার আড়ি! আমার স্বামী এখন ভিতরে আছে, নইলে আপনাদের নিয়ে যেতে তাকে পাঠাতে পারতাম। আপনাকে আসতেই হবে। অতি অবশ্য আসবেন। আটটা থেকে নটার মধ্যে।
দর্জিটি হেলেনের পরিচিত, তার দিকে একবার মাথাটা নাড়ল, দর্জিও সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাল। হেলেন অনবরত কথা বলে চলল, বিশেষভাবে নাতাশার রূপ-কীর্তন। নাতাশার নতুন পাশাকের প্রশংসা করে ধাতুবন্ত্রের তৈরি নিজের পোশাকের প্রশংসা করে জানাল, পোশাকটা প্যারিস থেকে এসেছে, আর নাতাশাকেও ঐরকম একটা পোশাক আনবার পরামর্শ দিল।
বলল, অবশ্য তোমাকে তো সবকিছুতেই মানায় গো মায়াবিনী!
নাতাশার মুখে খুশির হাসি খেলে গেল। কাউন্টেস বেজুখভার প্রশংসার ছোঁয়ায় সে যেন নতুন করে ফুটে উঠেছে।
আমার ভাই কাল আমার সঙ্গে ডিনার খেয়েছে-হাসতে হাসতে মরি আর কি-সে তো কিছু খেল না, শুধু তোমার জন্যই হা-হুঁতাশ করল গো মায়াবিনী! তোমার প্রেমের সে তো একেবারে পাগল হয়ে গেছে সোনা!
একথা শুনে নাতাশার মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
হেলেন বলল, আহা, কতই লজ্জা তোমার সুন্দরী! তুমি কিন্তু অবশ্যই আসবে। একজনকে ভালোবাস বলেই ঘরে দরজা দিয়ে বসে থাকতে হবে তার কি মনে আছে। যদি বিয়ের কথাও হয়ে থাকে, তাহলেও তোমার মনের মানুষটি নিশ্চয় চাইবে ঘরের একঘেয়েমি ছেড়ে তুমি সমাজে একটু চলাফেরা কর।
তাহলে আমাদের বিয়ের কথাও এ জানে, ইনি ও আমার স্বামী-ভালোমানুষ পিয়ের-তা নিয়ে কথা বলেছে, হাসাহাসি করেছে। তাহলে তো সবই ঠিক আছে। দুটি বিস্মিত চোখ মেলে নাতাশা হেলেনের দিকে তাকাল।
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা গম্ভীর মুখে চুপচাপ এসে ডিনারে বসল, বোঝাই যাচ্ছে বুড়ো প্রিন্সের কাছে সে হেরে গেছে। এখনো তার উত্তেজনা কাটেনি, শান্তভাবে কথা বলতেও পারছে না। কাউন্টেসের প্রশ্নের জবাবে জানাল, সব ঠিক আছে, কাল সব বলবে। কাউন্টেস বেজুখভার আগমন ও সন্ধ্যার আমন্ত্রণের সংবাদ শুনে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা বলল :
বেজুখভার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আমি রাখতে চাই না, তোমাকেও সেই পরামর্শই দিচ্ছি, যাই হোক, তুমি যখন কথা দিয়েছ-যাও। এতে তোমার মনটাও অন্য দিকে যাবে, সে নাতাশাকে উদ্দেশ্য করে বলল।
.
অধ্যায়-১৩
কাউন্ট রস্তভ মেয়েদের নিয়ে কাউন্টেস বেজুখভার বাড়ি গেল। সেখানে বেশ লোকজন এসেছে, কিন্তু প্রায় সকলেই নাতাশার অপরিচিত। যেসব স্ত্রী-পুরুষ এসেছে তাদের প্রায় সকলেরই স্বাধীনভাবে চলাফেরার খ্যাতি আছে–এটা দেখে কাউন্ট রস্তভের মন বিরূপ হয়ে উঠল। মাদময়জেল জর্জেস যুবকবৃন্দ পরিবৃত হয়ে ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে। মেতিভিয়েরসহ বেশ কয়েকজন ফরাসি ভদ্রলোকও সেখানে হাজির। হেলেন মস্কো আসার পর থেকেই মেতিভিয়ের তার বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছে। কাউন্ট স্থির করল, তাস খেলতে বসবে না, বা মেয়েদের চোখের বাইরে যেতে দেবে না, এবং মাদময়জেল জর্জেসের আবৃত্তি শেষ হওয়ামাত্রই চলে যাবে।
রস্তভদের খোঁজেই আনাতোল দরজায় দেখা দিল। কাউন্টকে অভ্যর্থনা জানিয়েই সে নাতাশাকে অনুসরণ করল। তাকে দেখামাত্র অপেরার সেই মনোভাব নাতাশাকে পেয়ে বসল-আনাতোলের প্রশংসায় পরিতুষ্ট অহংকার এবং দুজনের মধ্যে একটা নৈতিক ব্যবধানের অনুপস্থিতিজনিত আতংক।
হেলেন সানন্দে নাতাশাকে স্বাগত জানিয়ে তার রূপ ও পোশাকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠল। পোশাক বদলাবার জন্য মাদময়জেল জর্জেস পাশের ঘরে চলে গেল। বসার ঘরের চেয়ারগুলো সাজিয়ে নিয়ে সকলে বসে পড়ল। নাতাশার জন্য একটা চেয়ার নিয়ে এসে আনাতোল নিজে তার পাশেই বসতে যাচ্ছিল, কিন্তু কাউন্টের নজর ছিল মেয়ের উপর, সে তাড়াতাড়ি এসে তার পাশে বসে পড়ল। আনাতোল বসল তার পিছনে।
কঠোর বিষণ্ণ দৃষ্টিতে শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে মাদময়জেল জর্জেস কিছু ফরাসি কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল, সে কবিতায় ছেলের প্রতি নিষিদ্ধ প্রেমের বর্ণনা। কখনো তার গলা চড়ছে, কখনো বা অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, কখনো সগৌরবে মাথাটা তুলে ধরছে, আবার কখনো থেমে গিয়ে চোখ পাকিয়ে কর্কশ কন্ঠে আবৃত্তি করছে।
চারদিক থেকে রব উঠল, প্রশংসনীয়! স্বর্গীয়! মনের মতো!
