বাবা তাকে জানিয়ে দিয়েছে, এই শেষবারের মতো তার ঋণের অর্ধেক টাকা সে শোধ করে দেবে, তবে এক শর্তে যে প্রধান সেনাপতির অ্যাডজুটান্ট হয়ে তাকে মস্কো চলে যেতে হবে-এ চাকরিটাও বাবাই যোগাড় করে দিয়েছে এবং সেখানে একটি ভালো মেয়ের খোঁজ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বাবা প্রিন্সেস মারি ও জুলি কারাগিনের নামও উল্লেখ করেছে।
বাবার কথা মেনে নিয়ে আনাতোল মস্কো চলে এসেছে এবং পিয়েরের বাড়িতে উঠেছে। পিয়ের প্রথমে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে স্বাগত জানিয়েছিল, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, এমন কি । কখনো কখনো তার সঙ্গে পান-ভোজন করতেও যায়, এবং ঋণের নামে তাকে টাকাও যোগায়।
শিনশিন তো আগেই বলেছে, এখানে এসেই আনাতোল মস্কোর মহিলাদের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে তাদের অবজ্ঞা করে এবং তাদের পরিবর্তে জিপৃসি মেয়েদের ও ফরাসি অভিনেত্রীদের সঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিয়ে-শোনা যায় অভিনেত্রী-প্রধানা মাদময়জেল জর্জেসের সঙ্গে তার সম্পর্কটা নাকি একটু বেশি ঘনিষ্ঠ। কোনো পান-ভোজনের আসর সে বাদ দেয় না, সারা রাত মদ খায়, উঁচু মহলের সব বল-নাচের আসরে ও পার্টিতে সর্বদা হাজির থাকে। কোনো কোনো মহিলার সঙ্গে তার গোপন মেলামেশার কথাও উঠেছে। কিন্তু সে কখনো অবিবাহিতা মেয়েদের, বিশেষ করে ধনবতী উত্তরাধিকারিণীদের পিছনে ছোটে না। তার একটা বিশেষ কারণও আছে। দুবছর আগেই তার একটা বিয়ে হয়েছিল-ঘটনাটা জানে শুধু তার অতিঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। সে সময় রেজিমেন্টের সঙ্গে পোল্যান্ডে থাকাকালে স্বল্পবিত্ত এক পোলিশ জোতদার তাকে বাধ্য করেছিল তার মেয়েকে বিয়ে করতে। আনাতোল অবশ্য অচিরেই স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছে এবং শশুরকে একটা টাকা পাঠাতে রাজি হয়ে এমন বন্দোবস্ত পাকা করে নিয়েছে যাতে সে নিজেকে অবিবাহিত বলে চালিয়ে যেতে পারে।
আনাতোল সবসময়ই নিজের অবস্থা নিয়ে, নিজেকে নিয়ে, অন্য সবাইকে নিয়ে সন্তুষ্ট। এটা তার সহজতা দৃঢ়বিশ্বাস যে সে যেভাবে কাটাচ্ছে তাছাড়া অন্য কোনোভাবে জীবন কাটানো তার পক্ষে অসম্ভব, আর জীবনে কোনোদিন সে কোনো নিচ কাজ করেনি। তার একান্ত ধারণা, হাস যেমন জলে বাস করতে বাধ্য তেমনি ঈশ্বর তাকে এমনভাবেই সৃষ্টি করেছেন যে বছরের ত্রিশ হাজার রুবল খরচ করতে এবং সমাজে একটা গণ্যমান্য আসবে অধিষ্ঠিত হতে সে বাধ্য। এত দৃঢ়তার সঙ্গে সে একটা বিশ্বাস করে যে তার দিকে তাকিয়ে অন্যরাও সেটা বিশ্বাস করে এবং সমাজে তাকে একটা গণ্যমান্য আসন দিতে অথবা টাকা ধার দিতে আপত্তি করে না, আর সেও যত্রতত্র টাকা ধার করে বেড়ায়, কিন্তু কোনোদিন শোধ করে না।
সে জুয়াড়ি নয়, অন্তত টাকা জেতার দিকে তার নজর নেই। সে অহংকারীও নয়। উচ্চকাতক্ষার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা যাবে না। সে নিচ নয়, কেউ কিছু চাইলে তাকে ফিরিয়ে দেয় না। সে চায় শুধু আমোদ-প্রমোেদ আর মেয়েমানুষ, আর যেহেতু তার বিবেচনায় এর মধ্যে অসম্মানের কিছু নেই, সেইহেতু তার এই বাসনাপরিতৃপ্তির ফলে অন্যের কি হল না হল তা সে ভাবেই না, সে সত্যি নিজেকে অনিন্দনীয় বলে মনে করে, শয়তান ও খারাপ লোকদের আন্তরিকভাবে ঘৃণা করে এবং শান্ত বিবেক নিয়ে মাথা উঁচু করে চলে।
দেশ থেকে নির্বাসন এবং পারস্য দেশে দুঃসাহসিক কার্যকলাপের পরে দলখভ সেই বছরই মস্কো ফিরে এসেছে এবং পিটার্সবুর্গের পুরনো দোস্ত কুরাগিনের সঙ্গে মিশে বিলাস, জুয়া ও লাম্পট্যের জীবন চালিয়ে যাচ্ছে, আর তার জন্য কুরাগিনকেই দোহন করে চলেছে।
কুরাগিনের উপর নাতাশার প্রভাব খুব বেশি করেই পড়েছে। অপেরার পরে চা খেতে বসে দলখভের কাছে। নাতাশার বাহু, কাঁধ, পা ও চুলের বর্ণনা দিয়ে বলল যে সে তার সঙ্গে প্রেম করবে। এ ধরনের ভালোবাসাবাসির ফল কি দাঁড়াবে সে বিষয়ে কোনো ধারণাই আনাতোলের নেই, কারণ কখও কোনো কাজের ফলাফল নিয়ে সে মাথা ঘামায় না।
দলখভ বলল, ও মেয়ে প্রথম শ্রেণীর ভায়া, কিন্তু আমাদের জন্য নয়।
আনাতোল বলল, আমার বোনকে বলব তাকে ডিনারে ডাকতে, কি বল?
ওর বিয়েটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলে পারতে…
আনাতোল বলল, তুমি তো জান ছোট মেয়েদের আমি ভালোবাসি, সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মুণ্ডু ঘুরে যায়।
দলখভ কুরাগিনের বিয়ের খবরটা জানত, বলল, এর মধ্যেই কিন্তু একটি ছোট মেয়ের ফাঁদে পড়েছিলে। খুব সাবধান।
দিল-খোলা হাসি হেসে আনাতোল বলল, আরে, সে জিনিস দু-বার ঘটতে পারে না! কি বল?
.
অধ্যায়–১২
অপেরার পরের দিন রস্তভরা কোথাও বের হল না, তাদের সঙ্গে দেখা করতেও কেউ এল না। নাতাশাকে লুকিয়ে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা কাউন্টের সঙ্গে কি নিয়ে যেন কথাবার্তা বলল। নাতাশা অনুমান করল, তারা বুড়ো প্রিন্স সম্পর্কে কথা বলছে এবং একটা কোনো মতলব আঁটছে, এতে সে মনে মনে অসন্তুষ্ট হল। সে আশা করছে প্রিন্স আন্দ্রু যে-কোনো সময় এসে পড়বে, সে এসেছে কি না জানবার জন্য দুইবার সে চাকরটাকে ভজদভিজেংকা পাঠিয়েছে। সে আসেনি। মস্কোর প্রথম দিনগুলোর তুলনায় এখন সে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। প্রিন্স আন্দ্রুর জন্য অধৈর্য প্রতীক্ষা ছাড়াও প্রিন্সেস মারি ও বুড়ো প্রিন্সের সঙ্গে সাক্ষাতের অপ্রীতিকর স্মৃতি তাকে কষ্ট দিচ্ছে। সে কেবলই ভাবছে, হয় প্রিন্স আন্দ্রুন্তু আসবেই না, আর নয় তো তার আসার আগেই নাতাশার নিজের একটা কিছু ঘটে যাবে। প্রিন্স আন্দ্রুর কথা ভাবতে গেলেই তার মনে পড়ে যায় বুড়ো প্রিন্স, প্রিন্সেস মারি, থিয়েটার ও কুরাগিনের কথা। বার বার সেই একই প্রশ্ন তার সামনে এসে হাজির হচ্ছে : সে কি দোষী নয়, সে কি প্রিন্স আন্দ্রুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, আর সঙ্গে সঙ্গে সেই লোকটির প্রতিটি কথা, প্রতিটি ভঙ্গি, মুখের প্রতিটি ভাব তার মনে পড়ে যাচ্ছে। পরিবারের সকলেই নাতাশাকে আগের চাইতে চটপটে ভাবলেও আসলে তার মনের সুখ ও শান্তি আগের চাইতে অনেক কমে গেছে।
