কিছুক্ষণ দুজনই চুপচাপ। সেই নীরবতা ভাঙতে নাতাশাই জিজ্ঞাসা করল, মস্কো তার কেমন লাগছে। প্রশ্নটা করেই সে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সারাক্ষণই তার মনে হল যে এই লোকটির সঙ্গে কথা বলে সে অনুচিত কাজ করছে। আনাতোল কিন্তু তাকে উৎসাহ দেবার জন্য হাসতে লাগল।
অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে নাতাশার দিকে তাকিয়ে বলল, প্রথম প্রথম খুব ভালো লাগেনি, কারণ একটা শহর তো ভালো লাগে তার সুন্দরীদের জন্য, তাই নয় কি? সাজগোজ-প্রতিযোগিতায় আসছেন তো কাউন্টেস? অবশ্যই আসবেন। তারপর গলা নামিয়ে বলল, সেখানে আপনিই হবেন সুন্দরীশ্রেষ্ঠা। প্রিয় কাউন্টেস, অবশ্যই আসবেন, আর প্রতিশ্রুতি হিসেবে আপনার ফুলের স্তবকটা আমাকে দিন!
তার কথাগুলি নাতাশা ঠিক বুঝতে পারল না, কিন্তু এটা বুঝল যে তার এই দুর্বোধ্য কথাগুলির একটা অশুভ অভিপ্রায় আছে। কি বলবে বুঝতে না পেরে যেন কথাগুলি শুনতেই পায়নি এমনিভাবে সে মুখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু মুখ ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে হল, লোকটি তো সেখানেই আছে, তার পিছনেই আছে, খুব কাছেই আছে।
এখন তার মনের কি ভাব? সে কি বিচলিত? ক্রুদ্ধ? আমার কি উচিত শুধরে নেওয়া? নিজেকেই প্রশ্নগুলি করে সে আবার মুখটা না ফিরিয়ে পারল না। সে সোজা আনাতোলের চোখের দিকে তাকাল, আর তার নৈকট্য, আত্ম-প্রত্যয় ও মধুর হাসি নাতাশাকে জয় করে নিল। আনাতোলের মতো নাতাশাও তার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল। আর পুনরায় সে সভয়ে অনুভব করল যে তাদের মধ্যে আর কোনো ব্যবধান রইল না।
আবার যবনিকা উঠল। শান্ত, খুশি মনে আনাতোল চলে গেল। যে পৃথিবীতে সে এখন আছে তাকে মেনে নিয়ে নাতাশা বাবার পাশে আর একটা বক্সে গিয়ে বসল। তার মনে হল, এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে যা ঘটছে সেটাই একান্ত স্বাভাবিক, কিন্তু অপরদিকে তার বাগদত্তা প্রণয়ী, প্রিন্সেস মারি, বা গ্রামের জীবনের আগেকার চিন্তা-ভাবনাগুলি মোটেই তার মনে পড়ল না, বরং তার মনে হল সেসব যেন কোনো দূর অতীতের ঘটনা।
চতুর্থ অংকে একটা শয়তান এসে হাত দুলিয়ে নাচতে লাগল এবং শেষপর্যন্ত পায়ের নিচ থেকে বোর্ডটা সরিয়ে নেওয়া হলে সে মঞ্চের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল। চতুর্থ অংকের মাত্র এই অংশটাই নাতাশা দেখতে পেল, সে তখন উত্তেজনায় ও যন্ত্রণায় অভিভূত, আর তার কারণ কুরাগিন, নাতাশা তার দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারছিল না। থিয়েটার থেকে বেরিয়ে যাবার সময় আনাতোল এগিয়ে এসে গাড়ি ডেকে দিল, তাদের গাড়িতে উঠতে সাহায্য করল। নাতাশাকে তুলে দেবার সময় সে নাতাশার কনুইয়ের উপর বাহুতে চাপ দিল। উত্তেজিত ও লজ্জিত হয়ে নাতাশা ঘুরে দাঁড়াল। আনাতোল মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে চকচকে চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
বাড়িতে ফিরে তবে নাতাশা সমস্ত ব্যাপারটা পরিষ্কার করে ভাবতে পারল। হঠাৎ প্রিন্স আন্দ্রুর কথা স্মরণ করে সে আতংকিত হয়ে উঠল। অপেরা থেকে ফিরে সকলেই চা খেতে বসেছিল। নাতাশা হঠাৎ চিৎকার করে উঠে মুখ লাল করে ছুটে বেরিয়ে গেল।
নিজের মনেই বলল, হা ঈশ্বর! আমার সর্বনাশ হয়েছে! কেমন করে তাকে আস্কারা দিলাম? দুই হাতে মুখ ঢেকে অনেকক্ষণ বসে রইল। কিন্তু তার মাথায় কিছুই আসছে না। সবকিছুই অন্ধকার, অস্পষ্ট, ভয়ংকর। উজ্জ্বল আলোকিত থিয়েটারে বসে দুপোর্তের অভিনয় দেখতে দেখতে যাকে মনে হয়েছিল সহজ, সরল, এখন একাকি বসে তাকেই মনে হচ্ছে দুর্বোধ্য। এটা কি? তার সম্পর্কে যে আতংক আমি বোধ করেছিলাম সেটাই বা কি? এখন এই যে বিবেকের দংশন অনুভব করছি এটাই বা কি? সে ভাবতে লাগল।
রাতে বিছানায় শুয়ে মনের সব কথা শুধু মাকেই খুলে বলা যায়। সোনিয়াকে বলে কোনো লাভ নেই, হয়, সে কিছুই বুঝবে না, আর না হয় তো সব কথা শুনে আতংকে শিউরে উঠবে। কাজেই নাতাশা নিজের এই যন্ত্রণার কারণ আবিষ্কারের চেষ্টা করতে লাগল।
নিজেকে কি আর ভালোবাসার অনুপযুক্ত করে তুলেছি? নিজেকে প্রশ্নটা করেই সান্ত্বনা খুঁজতে আবার নিজেই জবাব দিল : আমি কি বোকা যে এই প্রশ্ন করছি। আমার কি হয়েছে? কিছু হয়নি। আমি কিছুই করিনি, তাকে মোটেই আস্কারা দেইনি। কেউ কিছু জানবে না, আমিও আর কখনো তার সঙ্গে দেখা করব না।…কাজেই একটা কথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে কিছুই ঘটেনি, অনুশোচনা করবারও কিছু নেই, আর আন্দু এখনো আমাকে ভালোবাসতে পারে। কিন্তু এখনো কথাটা বলছি কেন? হে ঈশ্বর, হে ঈশ্বর, সে কেন এখানে নেই? মুহূর্তকাল নিজেকে শান্ত রাখলেও পুনরায় কে যেন তাকে বলতে লাগল যে এসব কিছু সত্য হলেও, কিছু না ঘটে থাকলেও, প্রিন্স আন্দ্রুর প্রতি তার ভালোবাসার সেই পবিত্রতার মৃত্যু ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গে আবার যেন সে কল্পনায় কুরাগিনের সঙ্গে তার কথাবার্তার সবটাই শুনতে পেল, এবং সেই সাহসী সুদর্শন মানুষটি যখন তার বাহুতে চাপ দিয়েছিল তার তখনকার সেই মুখ, সেই ভঙ্গি, সেই মিষ্টি হাসি সবই সে আবার দেখতে পেল।
.
অধ্যায়-১১
আনাতোল কুরাগিন এখন মস্কোতে বাস করছে কারণ তার বাবাই তাকে পিটার্সবুর্গ থেকে এখানে পাঠিয়েছে। পিটার্সবুর্গে সে বছরে নগদে খরচ করছিল বিশ হাজার রুবল, এবং সমপরিমাণ আরো যেসব ধার-কর্জ করছিল, ঋণদাতারা সে টাকাটা তার বাবার কাছেই দাবি করছিল।
