দ্বিতীয় অঙ্কে একটা কবরখানার দৃশ্য দেখা গেল। ক্যানভাসের মধ্যে একটা গোল গর্ত করে চাঁদের আদল আনা হয়েছে, পাদপ্রদীপের আলোগুলো ঢেকে দেওয়া হয়েছে, শিঙার গম্ভীর শব্দের তালে তালে কালো জোব্বা পরা একদল লোক ছুরি হাতে নিয়ে দুইদিক থেকে মঞ্চে ঢুকল। তারপর আরো কিছু লোক এখন হাল্কা নীল পোশাক পরা সেই শ্বেতবসনা সুন্দরীকে টানতে টানতে ছুটে এল। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই তাকে টেনে নিয়ে গেল না, অনেকক্ষণ ধরে তার সঙ্গে গান করল, তারপর তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। দৃশ্যের অন্তরালে তিনবার ধাতব শব্দ হল এবং প্রত্যেকে নতজানু হয়ে প্রার্থনা-সঙ্গীত গাইতে লাগল। আর এসব কিছুর মাঝে মাঝেই শোনা গেল শ্রোতাদের সোৎসাহ চিৎকার।
দ্বিতীয় অঙ্ক শেষ হবার পরে কাউন্টেস বেজুখভা রস্তভদের বক্সের কাছে এগিয়ে গেল–তার বুকটা সম্পূর্ণ খোলা-বুড়ো কাউন্টকে দস্তানা-পরা আঙুলে ইশারা করে অন্য কারো দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে তার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলতে লাগল। বলল, আপনার মনোরমা কন্যাদের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিন। সারা শহর তো তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, অথচ আমি তাদের চিনিও না।
নাতাশা দাঁড়িয়ে কাউন্টেসকে অভিবাদন জানাল। এই সুন্দরীর প্রশংসায় তার মুখটা খুশিতে লাল হয়ে উঠেছে। হেলেন বলল, এখন তো আমিও মস্কোপন্থী হতে চাই। কিন্তু এমন সব মণিমুক্তোকে গ্রামের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছেন এতে আপনার লজ্জা করে না?
আকর্ষণীয় নারীত্বের খ্যাতি কাউন্টেস বেজুখভার আছে। যা তার মনের কথা নয়–বিশেষত সেটা স্তুতিবচন হয়–সেটাকে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে সে বলতে পারে।
প্রিয় কাউন্ট, আমি কিন্তু আপনার মেয়েদের দেখাশুনার ভার নিলাম। যদিও এ যাত্রায় আমি এখানে বেশিদিন থাকছি না-আপনারাও থাকছেন না–তবু তাদের খুশি রাখতে চেষ্টা করব। চিরাচরিত মধুর হাসি হেসে নাতাশাকে বলল, পিটার্সবুর্গে তোমার কথা অনেক শুনেছি, তখন থেকেই তোমার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা। তোমার কথা বেস্কয়ার কাছেও শুনেছি। তুমি কি শুনেছ সে বিয়ে করছে? তাছাড়া, আমার স্বামীর বন্ধু, বলকনস্কি, প্রিন্স আন্দ্রু বলকনস্কির কাছেও শুনেছি।
তৃতীয় অংকে একটি রাজপ্রাসাদের দৃশ্য : অনেক মোমবাতি জ্বলছে, আর দেয়ালে ছোট দাড়িওয়ালা অনেক নাইটের ছবি ঝুলছে। মাঝখানে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা সম্ভবত রাজা ও রানী। ডান হাত দুলিয়ে খারাপ সুরে একটা গান গেয়ে রাজা লাল রঙের সিংহাসনে বসে পড়ল। যে কন্যাটি প্রথমে শাদা পোশাক ও পরে হাল্কা নীল পোশাক পরেছিল, এখন তার পরনে শুধু একটা ঢিলে জমা। চুল ছড়িয়ে দিয়ে সে সিংহাসনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। রানীকে উদ্দেশ করে সে একটা করুণ গান করল, কিন্তু রাজা কঠোরভাবে হাত নাড়তেই দুইদিক থেকে ছুটে এল নরনারীর দল, এবং সকলে একসঙ্গে নাচতে লাগল। তারপর কর্কশ সুরে বেহালা বেজে উঠল, আর মোটা পা ও শুকনো হাতওয়ালা একটি স্ত্রীলোক হঠাৎ উইংসের পাশে চলে গেল, এবং বডিসটা ঠিক করে নিয়ে আবার মঞ্চের মাঝখানে এসে এক পায়ের উপর আরেক পা ঠুকে লাফাতে শুরু করে দিল। স্টলের প্রতিটি লোক হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, সাবাস! তখন একটি লোক মঞ্চের এককোণে চলে গেল। অর্কেস্ট্রার করতাল ও শিঙা আরো উচ্চ নিনাদে বাজতে লাগল, আর সেই লোকটি খালি পায়ে লাফ দিয়ে অনেক উঁচুতে উঠতে অতি দ্রুত পা দুটো দোলাতে লাগল। লোকটি দুপোর্ত, এই খেলাটা দেখাবার জন্য বছরে সে ষাট রুবল পায়।) স্টলে, বক্সে ও গ্যালারিতে সকলেই হাততালি দিয়ে প্রাণপণে চেঁচাতে লাগল, আর লোকটি থেমে হাসতে হাসতে সকলকে অভিনন্দন জানাল। তারপর রাজা বাজনার তালে তালে চিৎকার করে উঠতেই সকলে গান ধরল। কিন্তু তখনই হঠাৎ ঝড় উঠল, অর্কেস্ট্রায় ভীষণ-মধুর সুর বাজতে লাগল, সকলে ছুটে চলে গেল, যবনিকা নেমে এল। শ্রোতাদের মধ্যে আবার হৈ-হট্টগোল শুরু হল, সকলের মুখেই উচ্ছ্বসিত চিৎকার : দুপোর্ত! দুপোর্ত! দুপোর্ত! নাতাশার কাছে এখন আর এসব বিস্ময়কর মনে হচ্ছে না। আনন্দে হাসতে হাসতে খুশি মুখে সে চারদিকে তাকাতে লাগল।
দুর্পোত খুব মজাদার নয়? হেলেন জানতে চাইল।
হ্যাঁ, নাতাশা জবাব দিল।
.
অধ্যায়-১০
বিরতির সময় হেলেনের বক্সে একঝলক ঠাণ্ডা বাতাস এল, দরজাটা খুলে গেল, ঘরে ঢুকল আনাতোল।
অস্বস্তির সঙ্গে নাতাশার উপর থেকে চোখ সরিয়ে আনাতোলের দিকে তাকিয়ে হেলেন বলল, আমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
নাতাশা মুখ ঘুরিয়ে সুন্দর যুবক অফিসারটির দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তার পাশেই বসে পড়ে আনাতোল জানাল, এই পরিচয়ের সৌভাগ্যের জন্য অনেকদিন থেকেই সে অপেক্ষা করে ছিল। অভিনয় সম্পর্কে নাতাশার অভিমত জানতে চেয়ে কুরাগিন আরো জানাল, আগের একটা অভিনয়কালে সেমেনভনা মঞ্চের উপর পড়ে গিয়েছিল।
তারপরই হঠাৎ পুরনো পরিচিত বন্ধুর মতো সুরে বলে উঠল, জানেন কাউন্টেস, আমরা একটা সাজগোজ-প্রতিযোগিতার আয়োজন করছি, আপনাকে তাতে অবশ্যই যোগ দিতে হবে! খুব মজা হবে। আমরা সবাই কারাগিনদের বাড়িতে মিলিত হব। দয়া করে আপনিও আসুন না!
কথা বলার সময় সে কিন্তু একটি মুহূতের জন্যও নাতাশার মুখ, গলা ও খোলা বাহুর উপর থেকে সহাস্য চোখ দুটি সরাল না। নাতাশা নিশ্চিত জানে, তাকে দেখে আনাতোল মুগ্ধ হয়েছে। এতে সে খুশি হল, কিন্তু তার উপস্থিতিতে কেমন যেন বিব্রতবোধ করতে লাগল।
