ওই তো কুরাগিনরা, জুলি–আর তাদের সঙ্গে বরিস। দেখলেই বোঝা যায় যে ওদের পূর্বরাগ চলছে…
দ্রুবেৎস্কয় কি বিয়ের প্রস্তাব করেছে?
হ্যাঁ, আজই তো শুনলাম, রস্তভদের বক্সে এসে শিনশিন বলে উঠল।
একটি লম্বা, সুন্দরী নারী পাশের বক্সটাকে ঢুকল। তার মাথায় গুচ্ছ গুচ্ছ চুলের বিনুনি, ফোলা-ফোলা শাদা গলা ও ঘাড়ের অনেকখানি খোলা, তাতে দুই লহর বড় বড় মুক্তোর মালা জড়ানো। ভারি রেশমি পোশাকের খস খস আওয়াজ তুলে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সে তার বক্সে জাঁকিয়ে বসল।
নাতাশার দৃষ্টি আপনা থেকেই মহিলাটির গলা, ঘাড় ও মুক্তোগুলোর উপর পড়ল। দ্বিতীয়বার সেদিকে তাকাতেই মহিলাটিও ঘাড়টা ফেরাল, এবং কাউন্টের সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ায় মাথা নেড়ে হাসল। মহিলাটি পিয়েরের স্ত্রী কাউন্টেস বেজুখভা। কাউন্ট সমাজের সকলকেই চেনে, ঝুঁকে পড়ে মহিলার সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
কাউন্টেস কি এখানে অনেক দিন এসেছেন? যাব, যাব, আপনার হাতে চুমো খেতে যাব! এখানে একটা কাজে এসেছি, সঙ্গে আমার মেয়েরাও এসেছে। ওরা বলল, সেমেনভনা আশ্চর্য অভিনয় করেন। কাউন্ট পিয়ের তো কখনো আমাদের কথা ভোলেন না। তিনিও কি এখানে এসেছেন?
হ্যাঁ, তারও আসার কথা, জবাবটা দিয়ে হেলেন মনোযোগর সঙ্গে নাতাশার দিকে তাকাল।
কাউন্ট রস্তভ ভালোভাবে আসনে বসল।
নাতাশার কানে কানে বলল, সুন্দরী, তাই না?
নাতাশা জবাব দিল, আশ্চর্য! এমন নারীর সঙ্গে সহজেই প্রেমে পড়া যায়।
ঠিক সেই সময়ে বাজনা থেমে গেল। বিলম্বে আগত দর্শকরা তাড়াতাড়ি আসনে বসে পড়ল। যবনিকা উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে বক্সের ও স্টলের সকলেই একেবারে চুপ হয়ে গেল। যুবক ও বৃদ্ধ, ইউনিফর্মধারী ও সান্ধ্য পোশাকে সজ্জিত সকল পুরুষ, এবং খালি গলায় ও বুকে মণিমুক্তা ছড়ানো সকল নারী সাগ্রহ কৌতূহলে। মঞ্চের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করল। নাতাশাও সেইদিকেই দৃষ্টি ফেরাল।
.
অধ্যায়-৯
রঙ্গমঞ্চের মেঝেটা মসৃণ বোর্ড দিয়ে তৈরি, দুই পাশেও গাছপালা আঁকা কার্ডবোর্ড, আর পিছনে বোর্ডের উপর পর্দা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মঞ্চের মাঝখানে লাল বডিস ও শাদা স্কার্ট পরা কতকগুলি মেয়ে বসে আছে। শাদা রেশমি পোশাক পরা একটি মোটাসোটা মেয়ে একপাশে একটা নিচু বেঞ্চিতে বসে আছে, বেঞ্চিটার পিছনে একটুকরো সবুজ কার্ডবোর্ড আঠা দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। তারা সকলে কি যেন গাইছে। গান শেষ হলে শ্বেতবসনা মেয়েটি প্রম্পটারের বক্সের দিকে এগিয়ে গেল, আর আঁটোসাটো রেশমি ট্রাউজার পরা একটা লোক পালক ও ছুরি হাতে নিয়ে মেয়েটির কাছে এসে হাত দুলিয়ে দুলিয়ে গান গাইতে লাগল।
প্রথমে লোকটি একা গাইল, তারপর মেট গাইল, তারপর দুজনই থামল আর অর্কেস্ট্রা বাজতে লাগল। তারপর দুজনে একসঙ্গে গাইতে লাগল, আর থিয়েটারের প্রতিটি লোক হাততালি দিয়ে হৈ-চৈ করে উঠল, পুরুষ ও মেয়েটি হাসতে হাসতে দুই হাত ছড়িয়ে অভিবাদন জানাল।
নাতাশা একে গ্রাম থেকে এসেছে, তার উপর বর্তমানে তার মনের যা অবস্থা, তাতে এসব কিছুই নাতাশার কাছে অদ্ভুত ও বিস্ময়কর মনে হল। সে অপেরাটা বুঝতেই পারল না, বাজনাও তার কানে গেল না, সে শুধু দেখতে লাগল বিচিত্র পোশাক পরা কিছু নরনারী মঞ্চের উজ্জ্বল আলোয় চলাফেরা করছে। রঙিন কার্ডবোর্ডগুলোও তার চোখে পড়ল। সে তো জানে এ সবই মিথ্যা ও অস্বাভাবিক, তাই প্রথমে অভিনেতা অভিনেত্রীদের জন্য লজ্জা বোধ করলেও পরে তার বেশ মজা লাগল।
একসময়ে গান শুরু হবার আগে সকলেই যখন চুপচাপ এমন সময় রস্তভদের বক্সের কাছাকাছি দিকের স্টলে ঢুকবার দরজাটা ক্যাচ-ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেল, আর একজন বিলম্বে আগত দর্শকের পায়ের শব্দ শোনা গেল। শিনশিন ফিসফিস করে বলল, ঐ কুরাগিন এলেন! কাউন্টেস বেজুখভা নবাগতের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, নাতাশা তাকিয়ে দেখল, একজন অসাধারণ সুদর্শন অ্যাডজুটান্ট তাদের বক্সের দিকেই এগিয়ে আসছে। অনেকদিন আগে পিটার্সবুর্গের একটি বল-নাচের আসরে নাতাশা আনাতোল কুরাগিনকে দেখেছে। এখন তার পরিধানে অ্যাডজুটান্টের ইউনিফর্ম, তাতে একটি স্কন্ধত্রাণ ও একটি স্কন্ধ-গিট বসানো। তখন অভিনয় চলছে, তরবারি ও জুতোর ক্ষুরের শব্দ তুলে কার্পেট-পাতা পথের উপর দিয়ে সে এগিয়ে এল। নাতাশার দিকে একবার তাকিয়ে সে তার বোনের কাছে গেল, দস্তানা-পরা হাতটা তার বক্সের কোণায় রেখে মাথাটা নেড়ে নাতাশাকে দেখিয়ে কি যেন জিজ্ঞাসা করল। তারপর স্টলের প্রথম সারিতে দলখভের পাশে বসে বন্ধুর মতো কনুই দিয়ে তাকে একটা গুতো মারল।
কাউন্ট বলল, বোন আর ভাই ঠিক একরকম দেখতে। দুইজনই কী সুন্দর!
প্রথম অঙ্ক শেষ হল। স্টলের দর্শকরা নড়াচড়া শুরু করে দিল, কেউ বাইরে গেল, কেউ ঢুকল। বরিস রস্তভদের বক্সে এল, তাদের অভিনন্দনকে সহজভাবে গ্রহণ করল, ভুরু দুটো তুলে অন্যমনস্ক হাসির সঙ্গে নাতাশা ও সোনিয়াকে বিয়েতে তার বাগদত্তার আমন্ত্রণ জানিয়ে সেখান থেকে সরে গেল। যে বরিসের সঙ্গে নাতাশা একদিন প্রেমে পড়েছিল তারই আসন্ন বিয়ে উপলক্ষে নাতাশা তাকে অভিনন্দন জানাল। স্বল্পবাসপরিহিতা হেলেন তার পাশেই বসে প্রত্যেককে দেখে একই হাসি হাসছে, বরিসকেও সেই একই হাসি সে উপহার দিল।
