দয়া করে আমাকে ক্ষমা কর, ক্ষমা কর! ঈশ্বর সাক্ষী, আমি জানতাম না, বলতে বলতে নাতাশাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বুড়ো কাউন্ট বেরিয়ে গেল।
মাদময়জেল বুরিয়েই প্রথম এই ভূত-দেখার আতংক কাটিয়ে উঠতে পারল। সে প্রিন্সের অসুস্থতার কথা বলতে লাগল। নাতাশা ও প্রিন্সেস মারি নিঃশব্দে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল, আর যা বলতে চাইছে তা বলতে না পেরে যত বেশিক্ষণ সেভাবে থাকল ততই পরস্পরের প্রতি বিরূপতা বেড়েই চলল।
কাউন্ট ফিরে এলে নাতাশা চলে যাবার জন্য দৃষ্টিকটু রকমের তাড়াতাড়ি করতে লাগল, সেইমুহূর্তে বয়স্কা প্রিন্সেসটির প্রতি তার মনে ঘৃণা দেখা দিল, আধ ঘণ্টার আলোচনার মধ্যে সে একবারও প্রিন্স আন্দ্রুর নামটা পর্যন্ত উল্লেখ করল না। নাতাশা ভাবল, এই ফরাসি মহিলাটির সামনে আমি তো তার কথা তুলতে পারি না। সেই একই চিন্তা প্রিন্সেস মারিকেও বিঁধছিল। নাতাশাকে কি বলা উচিত ছিল তা সে জানে, কিন্তু সেকথা সে বলতে পারেনি, কারণ মাদময়জেল বুরিয়ে তাতে বাদ সেধেছে। যে কারণেই হোক, বিয়ের কথাটা সে তুলতে পারেনি।
কাউন্ট যখন ঘর থেকে চলে যাচ্ছে তখন প্রিন্সেস মারি তাড়াতাড়ি নাতাশার কাছে গিয়ে তার হাত চেপে ধরে গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল :
দাঁড়াও, আমি বলতে চাই…
অকারণেই নাতাশা বিদ্রুপের চোখে তার দিকে তাকাল।
প্রিন্সেস মারি বলল, প্রিয় নাতালি, আমি তোমাকে বলতে চাই, দাদা যে তোমাকে পেয়ে সুখী হয়েছে তাতে আমি খুশি…
সে থামল, তার মনে হল, সে সত্যি কথা বলছে না। নাতাশা সেটা লক্ষ্য করল, তার কারণও অনুমান করল।
চোখের জলে গলা আটকে এলেও বাহ্যিক মর্যাদার গুরুত্বের সঙ্গে নির্বিকার স্বরে সে বলল, আমি মনে করি প্রিন্সেস, সেকথা বলার মতো সময় এটা নয়।
কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই তার মনে হল, এ আমি কি বললাম–কি আমি কি করলাম?
.
সেদিন ডিনারের সময় সকলেই নাতাশার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল। নিজের ঘরে বসে সে শিশুর মতো কাঁদছে, নাক ঝাড়ছে আর ফেঁপাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে সোনিয়া তার চুলে চুমো খাচ্ছে।
সে শুধাল, নাতাশা, কেন এমন করছ? তাদের নিয়ে তোমার কি যায়-আসে? এসব কেটে যাবে নাতাশা।
কিন্তু তুমি যদি জানতে সেটা কতবড় দোষের ব্যাপার…আমি যেন…
ও কথা বলো না নাতাশা। সেটা তো তোমার দোষ নয়, তাহলে তুমি কেন ভাবছ? আমাকে চুমো খাও, সোনিয়া বলল।
নাতাশা মুখ তুলে বন্ধুর ঠোঁটে চুমো খেয়ে নিজের ভেজা মুখটা তার মুখের উপর চেপে ধরল।
বলল, আমি বলতে পারছি না, আমি জানি না। কারো দোষ নেই, সব দোষ আমার। কিন্তু এ আঘাত যে ভয়ংকর। ওঃ, কেন সে আসছে না?… ।
চোখ লাল করে সে ডিনারে এল। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা সবই জানত, তবু সে এমন ভান করতে লাগল যেন নাতাশার এই বিপর্যস্ত ভাব তার চোখেই পড়েনি, সে গলা ছেড়ে কাউন্ট ও অন্য অতিথিদের সঙ্গে হাসি তামাশা শুরু করে দিল।
.
অধ্যায়-৮
সেদিন সন্ধ্যায় রস্তভরা অপেরায় গেল, মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা আগে থেকেই একটা বক্সের ব্যবস্থা করে রেখেছিল।
নাতাশা যেতে চায়নি, কিন্তু মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার প্রস্তাব উপেক্ষা করতে পারল না। সেজেগুজে নাচ ঘরে এসে বাবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে বড় আয়নাটার দিকে তাকিয়ে দেখল সে তো সুন্দরী, খুব সুন্দরী, সঙ্গে সঙ্গে তার দুঃখ আরো বেড়ে গেল, কিন্তু সে দুঃখ বড় মধুর, বড় মিষ্টি।
হে ঈশ্বর, সে যদি এখানে থাকত তাহলে আমি ওরকম আচরণ করতাম না, ভিন্ন রকম আচরণ করতাম। বোকার মতো সবকিছুতে ভয় পেতাম না, শুধু তাকে আলিঙ্গন করতাম, তাকে জড়িয়ে ধরতাম, জিজ্ঞাসু চোখ মেলে সে আমাকে দেখত, আর আগেকার মতোই হাসত। আর তার চোখ দুটি–সে চোখ যেন আমি দেখতে পাচ্ছি! নাতাশা ভাবতে লাগল। তার বাবা ও বোনকে নিয়ে আমার কিসের মাথাব্যথা? আমি শুধু তাকেই ভালোবাসি, তাকে, তাকে, সেই মুখ, সেই চোখ, সেই হাসি, পুরুষসুলভ অথচ শিশুর মত।…না, না, তার কথা এখন ভাবব না, শুধু ভাবব না নয়, তাকে ভুলে থাকব, আপাতত সম্পূর্ণ ভুলে থাকব। এই অপেক্ষা করে থাকা আর সহ্য করতে পারছি না, এখনই কেঁদে ফেলব! অনেক কষ্টে কান্না চেপে সে আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
গাড়িতে বাবার পাশে বসে বিষণ্ণ চিত্তে সে দেখতে লাগল রাস্তার বাতিগুলো বরফ-ঢাকা জানালার উপর ঝিকমিক করছে, দেখতে দেখতে তার দুঃখ আরো বেড়ে গেল, ভালোবাসার চিন্তায় আরো বেশি করে ডুবে গেল, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে তাও ভুলে গেল। অন্য সব গাড়ির মাঝখানে পড়ে তাদের গাড়িটাও বরফের উপর দিয়ে খচ-মচ করে এগিয়ে চলল। থিয়েটারে পৌঁছে নাতাশা ও সোনিয়া পোশাক উঁচু করে তাড়াতাড়ি লাফিয়ে নেমে পড়ল। পরিচারকরা কাউন্টকে ধরে নামিয়ে দিল। বারান্দা পার হয়ে অন্য দর্শকদের সঙ্গে তারা তিনজনও প্রথম সারির বক্সগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে বাজনার মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে।
একটি পরিচারক তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে বক্সের দরজা খুলে দিল। বাজনা উচ্চতর হল। এখনো যবনিকা ওঠেনি, বাজনা বাজছে।
সোনিয়া বলল, ঐ দেখ, আলেনিয়া ও তার মা, তাই না?
কাউন্ট বলল, আরে, মাইকেল কিরিলভিচ দেখছি আরো শক্ত-সমর্থ হয়েছে!
আন্না মিখায়লভনাকে দেখ-চুল বাঁধার কী ছিরি!
