নিকোলাস বলল, সোনিয়া! এ জগতে অন্য লোককে নিয়ে আমার কি দরকার? তুমিই আমার সব। তোমাকে আমি তা প্রমাণ করে দেব!
তোমার মুখে এসব কথা আমি শুনতে চাই না।
বেশ, তাহলে বলব না; শুধু তুমি আমাকে ক্ষমা কর সোনিয়া। কাছে গিয়ে নিকোলাস সোনিয়াকে চুমো খেল।
আহা, কী সুন্দর, নাতাশা ভাবল। সোনিয়া ও নিকোলাস সবজি-ঘর থেকে চলে গেলে নাতাশাও সেখান থেকে বেরিয়ে বরিসকে ডেকে আনল।
অর্থপূর্ণ চতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, বরিস, এখানে এস। তোমাকে কিছু বলতে চাই। এখানে, এখানে! বরিসকে নিয়ে সে সবজি-ঘরে সেই টবগুলোর মধ্যে গেল যেখানে সে লুকিয়েছিল।
বরিস হাসতে হাসতে তাকে অনুসরণ করল।
সেই কিছুটা কি? বরিস প্রশ্ন করল।
নাতাশা বিচলিত বোধ করল, চারদিকে তাকাল, তারপর একটা টবের উপর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া পুতুলটাকে দেখে সেটাকে তুলে নিল।
পুতুলটাকে চুমো খাও, সে বলল।
বরিস একদৃষ্টিতে তার উন্মুখ মুখখানির দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো কথা বলল না।
নাতাশা বলল, চাই কি? আচ্ছা, তাহলে এখান এস। গাছপালাগুলোর আরো ভিতরে ঢুকে সে পুতুলটাকে ফেলে দিল। ফিসফিসিয়ে বলল, আরো কাছে, আরো কাছে।
সে তরুণ অফিসারটার হাত চেপে ধরল; তার সলজ্জ মুখে ফুটে উঠল একটি গম্ভীর ভয়ের ভাব।
আর আমাকে আমাকে চুমো খাবে কি ভুরুর নিচ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে উত্তেজনায় প্রায় কেঁদে ফেলে অস্পষ্ট গলায় নাতাশা ফিসফিস করে বলল।
বরিস লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
নাতাশার উপর ঝুঁকে পড়ে আরো লাল হয়ে সে বলল, আচ্ছা মজার লোক তো তুমি! কিন্তু সে অপেক্ষা করে রইল, কিছুই করল না।
হঠাৎ নাতাশা লাফ দিয়ে একটা টবের উপর উঠে বরিসের চাইতে উঁচু হয়ে দুটি খোলা হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করল এবং মাথার চুলগুলোকে পিছনে ঠেলে দিয়ে গভীর আশ্লেষে তার ঠোঁটের উপর চুমো খেল।
তারপর টবগুলোর অপর পাশে নেমে নাতাশা ঘাড় কাৎ করে দাঁড়াল।
বরিস বলল, নাতাশা, তুমি তো জান আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু…
তুমি আমাকে ভালোবাস? নাতাশা বলল।
হ্যাঁ, ভালোবাসি, কিন্তু দয়া করে এ রকম কাজের মধ্যে আমাদের টেনে নিও না।…আরো চার বছরের মধ্যেই…তখন আমি তোমার পাণি প্রার্থনা করব।
নাতাশা ভাবতে লাগল।
তেরো, চোদ্দ, পনেরো, মোল, সুন্দর ছোট আঙুলে সে গুনতে লাগল। ঠিক আছে। তাহলে কথা পাকা হল?
আনন্দ ও তৃপ্তির হাসিতে তার উনখ মুখখানি ঝলমল করে উঠল।
পাকা হল! বরিস জবাব দিল।
চিরদিনের মতো? মেয়েটি বলল। মৃত্যু পর্যন্ত।
বরিসের হাতটা ধরে খুশিভরা মুখে নাতাশা তাকে নিয়ে পাশের ছোট ঘরটাতে গেল।
*
অধ্যায়-১৪
অতিথিদের আপ্যায়ন করে কাউন্টেস এতই ক্লান্ত হয়ে পড়ল যে দরোয়ানকে হুকুম দিল যেন আর কাউকে ঢুকেত না দেয়; তবে দরোয়ানকে আরো বলা হল, অভিনন্দন জানাতে যারাই আসবে তাদের যেন খাবার নিমন্ত্রণ অবশ্যই জানানো হয়। ছোটবেলাকার বন্ধু প্রিন্সেস মিখায়লভনার সঙ্গে কিছু গোপন কথা বলার ইচ্ছা হল কাউন্টেসের; বন্ধুটি পিটার্সবুর্গ থেকে আসার পরে তার সঙ্গে ভালো করে দেখাই হয় নি। আন্না মিখায়লভনা তার চেয়ারটা কাউন্টেসের চেয়ারের কাছে টেনে নিল।
আন্না মিখায়লভনা বলল, তোমার সঙ্গে আমি প্রাণ খুলেই কথা বলব। পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে কজনাই বা আর আছি! সেই জন্যই তো তোমার বন্ধুত্ব আমার কাছে এত মূল্যবান।
ভেরার দিকে তাকিয়ে সে থামল। কাউন্টেস বন্ধুর হাতে চাপ দিল।
বড় মেয়ে ভেরা তার খুব প্রিয় নয়; তাকে বলল, ভেরা, তোমার বুদ্ধি-বিবেচনা এত কম কেন? তুমি কি বুঝতে পারছ না যে তুমি এখানে থাক এটা আমরা চাইছি না? অন্য মেয়েদের কাছে যাও, না হয়…
ভেরা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, কিন্তু মোটেই আহত হয়েছে বলে মনে হল না।
নিজের ঘরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি যদি আগেই আমাকে বলতে মামণি, আমি চলে যেতাম।
ছোট ঘরটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে সে দেখল দুই যুগল বসে আছে, এক এক জানালায় এক এক যুগল। সে থেমে ঘৃণার হাসি হাসল। সোনিয়া বসেছে নিকোলাসের পাশে; নিকোলাস নিজের লেখা প্রথম কবিতাটি সোনিয়াকে দেবার জন্য সেটা নকল করছে। বরিস ও নাতাশা বসেছিল আর একটা জানালায়; ভেরা ঢুকতেই। তারা কথা বন্ধ করল। অপরাধসূচক অথচ খুশি মুখে সোনিয়া ও নাতাশা ভেরার দিকে তাকাল।
দুটি ছোট মেয়ে প্রেমে পড়েছে–এ দৃশ্য তো সুখকর; কিন্তু তাদের দেখে ভেরার মনে কোনো রকম সুখের ভাব জাগল না।
সে বলল, কতবার তোমাকে বলি নি যে আমার কোনো জিনিস নেবে না? তোমার তো নিজের একটা ঘর আছে। নিকোলাসের কাছ থেকে সে দোয়াতটা নিয়ে নিল।
কলমটা ডুবিয়ে নিকোলাস বলল, এক মিনিট, এক মিনিট।
ভেরা বলল, তুমি সব সময়েই অসময়ে কাজ কর। বসবার ঘরে এমন ভাবে ছুটে এসেছিলে যে তোমার জন্য সকলেই লজ্জা পেয়েছিল।
সে যা বলল সে কথা ঠিকই, হয়তো সেই জন্যই কেউ কোনো জবাব দিল না, চারজনই এ-ওর দিকে তাকাতে লাগল। দোয়াতটা হাতে নিয়ে ভেরা ঘরের মধ্যেই রয়ে গেল।
তোমাদের এই বয়সে নাতাশা ও বরিসের মধ্যে, অথবা তোমাদের দুজনের মধ্যে কী এমন গোপন কথা থাকতে পারে? যত সব বাজে ব্যাপার!
দেখ ভেরা, তাতে তোমার কি? আত্মপক্ষ সমর্থনে নাতাশা শান্ত গলায় বলল।
মনে হচ্ছে, আজ সে সকলের প্রতিই দয়ালু ও স্নেহশীল।
