হ্যাঁ, সেটাই ভালো হবে, নাতাশা অনিচ্ছাসত্ত্বেও জবাব দিল।
.
অধ্যায়–৭
মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার পরামর্শমতো কাউন্ট রস্তভ পরদিনই নাতাশাকে সঙ্গে নিয়ে প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কি সঙ্গে দেখা করতে গেল। কাউন্ট কিন্তু খুশিমনে বাড়ি থেকে বের হল না, তার মনে যথেষ্ট ভয় ছিল। সৈন্যদল ভুক্তিকরণের সময় বুড়ো প্রিন্সের সঙ্গে তার সর্বশেষ যে সাক্ষাৎ হয়েছিল তখনকার কথা তার খুব ভালোই মনে আছে, প্রিন্সকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানালে তার জবাবে তার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক লোকের নাম না পাঠানোর জন্য তাকে প্রিন্সের সক্রোধ বকুনি শুনতে হয়েছিল। নাতাশার মেজাজ কিন্তু খুব খুশি, সব-সেরা গাউনটি পরে মনে মনে ভাবছে : তারা আমাকে পছন্দ না করেই পারে না, সকলেই তো সবসময় আমাকে পছন্দ করে, তারা যা চাইবে আমি তাই করব : তার বাবাকে ভালোবাসব, তার বোনকে ভালোবাসব, কাজেই তাদের তো আমাকে পছন্দ না করার কোনো কারণ থাকতে পারে না…
পুরনো বাড়িটার গাড়ি-বারান্দায় ঢুকেই কাউন্ট আধা রসিকতা ও আধা আন্তরিকতার সঙ্গে বলে উঠল, প্রভু আমাদের করুণা করুন। কিন্তু নাতাশা লক্ষ্য করল, তার বাবা কেমন যেন ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়েছে, অত্যন্ত ভীরু গলায় জিজ্ঞাসা করল, প্রিন্স ও প্রিন্সেস বাড়ি আছে কি না।
তাদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই চাকরদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। পরপর কয়েকজন পরিচারকের মধ্যে সংবাদ আদান-প্রদানের পরে শেষপর্যন্ত একটি বিরূপদর্শন বুড়ো পরিচারক রস্তভদের জানিয়ে দিল যে প্রিন্স কারো সঙ্গে দেখা করছে না, তবে তাদের এগিয়ে যেতে অনুরোধ করেছে। অতিথিদের প্রথম অভ্যর্থনা করল মাদময়জেল বুরিয়ে। বাবা ও মেয়েকে বিশেষ ভদ্রতা সহকারে স্বাগত জানিয়ে তাদের প্রিন্সেসের ঘরে নিয়ে গেল। প্রিন্সেসকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছিল, মুখের এখানে-ওখানে লালের ছোপ ধরেছে, ছুটে এসে অতিথিদের সঙ্গে দেখা করল। প্রথম দৃষ্টিতে নাতাশাকে প্রিন্সেস মারির ভালো লাগল না। মনে হল, মেয়েটির পোশাক বড় বেশি কেতাদুরস্ত, আচরণ বড় বেশি উচ্ছ্বসিত, একটু বা দাম্ভিকও। নাতাশার রূপ, যৌবন ও সুখের প্রতি নারীসুলভ ঈর্ষা ছাড়াও এই মুহূর্তে তার প্রতি প্রিন্সেস মারির মনোভাব প্রসন্নও ছিল না। কারণ তাদের আসার কথা শুনেই বুড়ো প্রিন্স চিৎকার করে বলে দিয়েছে সে তাদের সঙ্গে দেখা করতে চায় না, প্রিন্সেস মারির ইচ্ছা হলে সে দেখা করতে পারে, কিন্তু তাদের যেন কোনোমতেই হাজির করা না হয়। সে দেখা করাই স্থির করেছে, কিন্তু তার মনে সর্বক্ষণই আশংকা রয়েছে, প্রিন্স রস্তভদের আগমনে এতই চটে আছে যার ফলে যে-কোনো সময়ে সে একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসতে পারে।
লক্ষ্মী প্রিন্সেস, এই নাও, আমার গায়ক পাখিটিকে তোমার কাছে এনে দিলাম, পাছে বুড়ো প্রিন্স এসে হাজির হয় এই ভয়ে চারদিকে তাকাতে তাকাতে মাথা নুইয়ে কাউন্ট বলল। তোমাদের যে পরস্পরের সঙ্গে পরিচয় হতে চলেছে এতে আমি কত যে খুশি হলাম…বড়ই দুঃখের কথা যে প্রিন্স এখনো অসুস্থ। এই ধরনের আরো কিছু মামুলি কথা বলে সে উঠে দাঁড়াল। প্রিন্সেস, তুমি যদি অনুমতি কর তো নাতাশাকে মিনিট পনেরোর জন্য তোমার কাছে রেখে যাই। আমি গাড়িটা নিয়ে একবার আন্না সেমেনভনার সঙ্গে দেখা করে আসব, এই কাছেই, ডগস স্কয়ারে, তারপর ফিরে এসে ওকে নিয়ে যাব…
পরে কাউন্ট মেয়েকে বলেছিল যে তাদের দুইজনকে মন খুলে কথাবার্তা বলার সুযোগ করে দিতেই সে এই চালটি চেলেছিল, কিন্তু আসলে সে যে বুড়ো প্রিন্সের সঙ্গে দেখা হবার ভয়েই কেটে পড়েছিল সে সত্যি কথাটা মেয়ের কাছে বলেনি। যাই হোক, প্রিন্সেস কাউন্টকে জানাল যে আনন্দের সঙ্গে সে নাতাশাকে তার কাছে রাখবে, আর কাউন্ট যেন যতক্ষণ ইচ্ছা আন্না সেমেনভনার সঙ্গে কাটিয়ে আসে। কাউন্ট চলে গেল।
প্রিন্সেস মারি নাতাশার সঙ্গে একটু নিভৃতেই কথাবার্তা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু মাদময়জেল বুরিয়ে সেই ঘরেই বসে রইল এবং মস্কোর আমোদ-প্রমোদ ও থিয়েটার নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিল। নাতাশার মনে হল প্রিন্সেস যেন দয়া করে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছে, তাই তাকে তার মোটেই ভালো লাগল না। হঠা সে যেন নিজের মধ্যে কেমন গুটিয়ে গেল, আর তাতে প্রিন্সেস মারির মেজাজও খিঁচড়ে গেল। মিনিট পাঁচেক বিরক্তিকর আলোচনার পরেই তারা শুনতে পেল চটি পরা পায়ের জোরালো শব্দ। প্রিন্সেস মারি ভয় পেয়ে গেল। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল বুড়ো প্রিন্স, পরনে ড্রেসিং-গাউন, মাথায় শাদা নৈশ-টুপি।
ঢুকেই সে বলতে শুরু করল, আহা, মাদাম!…মাদাম, কাউন্টেস…কাউন্টেস রস্তভা, অবশ্য আমার যদি না হয়ে থাকে…দয়া করে আমাকে ক্ষমা কর…আমি জানতাম না মাদাম। ঈশ্বর সাক্ষী, তুমি যে দর্শন দিয়ে আমাদের সম্মানিত করেছ তা আমি জানতাম না, এ পোশাকে এসেছি শুধু আমার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে…অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা কর…ঈশ্বর সাক্ষী, আমি জানতাম না ঈশ্বর শব্দটার উপর এমন অস্বাভাবিক ও অপ্রীতিকরভাবে জোর দিয়ে সে বার বার কথা বলতে লাগল যে প্রিন্সেস মারি আনত চোখে দাঁড়িয়ে রইলনা পারল বাবার দিকে তাকাতে, না নাতাশার দিকে।
নাতাশা দাঁড়িয়ে অভিবাদন, জানাল বটে, কিন্তু তারপর যে কি করবে তা বুঝতে পারল না। শুধু মাদময়জেল বুরিয়ের মুখে স্মিত হাসির রেখা দেখা দিল।
