একদা সন্ধ্যায় রস্তভদের চারখানি স্লেজ মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার পুরনো কোনিউশেনি স্ট্রিটের বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হল। মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা একলাই থাকে। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে, আর ছেলেরা সকলেই চাকরি করে।
মহিলাটি এখনো বেশ খাড়া আছে, নিজের মতামত সকলকেই স্পষ্ট ভাষায় সোচ্চারে শুনিয়ে দেয়, কারো কোনোরকম দুর্বলতা, আবেগ বা প্রলোভনকে কখনো ক্ষমা করে না।
রস্তভরা যখন এসে পৌঁছল তখনো মহিলাটি শুতে যায়নি। নাকের উপর চশমাটা ঝুলিয়ে মাথাটাকে পিছন দিকে হেলিয়ে হল-ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সে কঠোর, কঠিন দৃষ্টিতে নবাগতদের দিকে তাকাল। তাকে দেখে যে কেউ ভাবতে পারত যে যাত্রীদের উপর সে খুব রেগে গেছে এবং এখনই তাদের তাড়িয়ে দেবে, কিন্তু দেখা গেল সে চাকরদের ডেকে অতিথিদের থাকবার ও তাদের জিনিসপত্র রাখবার ব্যবস্থা করে দেবার নির্দেশ দিল।
কাউকে কোনোরকম স্বাগত না জানিয়ে পোর্টম্যান্টোটা দেখিয়ে বলল, কাউন্টের মালপত্র? ওগুলো এখানে নিয়ে এস। ছোট মেয়েরা তাদের বাঁ দিকে নিয়ে যাও। দাসীদের বলল, এখানে ঘোরাঘুরি করছ কেন? যাও, সামোভারটা তৈরি কর! নাতাশাকে কাছে টেনে বল, তুমি তো বেশ মোটাসেটা হয়েছ, আরো সুন্দরী হয়েছ। কাউন্টকে দেখে চেঁচিয়ে বলল, ফুঃ! আপনি দেখছি ঠাণ্ডা হয়ে গেছেন! তাড়াতাড়ি পোশাক ছেড়ে নিন! এ যে দেখছি অর্ধেক জমে গেছেন। চায়ের সঙ্গে দেবার জন্য খানিকটা রাম নিয়ে এস!…সোনিয়া সোনা, বুজুর!
পোশাক-আশাক পাল্টে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে সকলে যখন চা খেতে এল তখন মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা পর পর সকলকেই চুমো খেল।
নাতাশার দিকে অর্থপূর্ণ চোখে তাকিয়ে বলল, তোমরা যে এখানে এসেছ এবং আমার বাড়িতেই থাক সেজন্য আমি আন্তরিক খুশি হয়েছি। এই আসার মতো সময়!…বুড়ো মানুষটি এসেছেন, তার ছেলেও যে কোনো দিন এসে পড়বে। তার সঙ্গেও তো পরিচয় করতে হবে। এই সময় সোনিয়ার দিকে চোখ পড়ায় তার সামনে এবিষয়ে কথা বলা ঠিক নয় বুঝতে পেরে বলে উঠল, যাক গে, এসব কথা পরে হবে।…কাউন্ট, এবার আপনি শুনুন। কাল আপনি কি চান? কাদের ডাকতে চান? শিনশিন? সে একটা আঙুল বাকাল। নাকে-কাঁদুনি আন্না মিখায়লভনা? তাহলে হল দুই। সঙ্গে তার ছেলেটিও আছে। তার তো বিয়ে! তারপর বেজুখভ, কি বলেন? সেও সস্ত্রীক এখানে এসেছে। সে তত বৌয়ের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছিল, কিন্তু বৌও পিছু পিছু এসে হাজির। বুধবারে সে আমার সঙ্গে ডিনার খেয়েছে। তারপর মেয়েদের দেখিয়ে বলল, আর ওরা–ওদের আমি প্রথমে নিয়ে যাব ঈশ্বর-জননীর আইবেরিয় তীর্থে এবং সেখান থেকে মহাবাটপাড়দের (সম্ভবত দর্জির কথা বলা হয়েছে) যানে। তোমার তো সবকিছুই নতুন চাই। আমাকে দেখে বিচার করো না : আজকাল আস্তিন এই মাপেরই হয়! এই তো সেদিন তরুণী প্রিন্সেস আইরিনা ভাসিলেনা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, সে একখানা দৃশ্য বটে–দেখে মনে হল যেন দুই হাতে দুটো পিপে পরেছে। তোমরা তো জান, প্রতিদিনই একটা না একটা নতুন ফ্যাশান দেখা দিচ্ছে। তারপর কাউন্টকে জিজ্ঞাসা করল, আর আপনি নিজে কি করবেন?
কাজের উপর কাজ চেপে আছে :কাউন্টেসের জন্য কম্বল কিনতে হবে, এদিকে আবার মস্কোর জমিদারি ও বাড়ির একজন ক্রেতা এসে হাজির। আপনি যদি অনুমতি করেন তো মেয়েদের আপনার কাছে রেখে আমি একটা দিনের জন্য জমিদারি থেকে ঘুরে আসব।
ঠিক আছে। ঠিক আছে। আমার কাছে তারা নিরাপদেই থাকবে। যেখানে তাদের যাওয়া দরকার সেখানে নিয়ে যাব, একটু-আধটু বকুনি দেব, আবার ভালোও বাসব।
পরদিন মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা মেয়েদের নিয়ে ঈশ্বর-জননীর পবিত্র স্থানে গেল এবং সেখান থেকে গেল মহাবাটপাড়ের দোকানে, সে লোকটি মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাকে এতই ভয় করে যে তাড়াতাড়ি তার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য লোকসান দিয়েও তার পোশাক বানিয়ে দেয়। বিয়ের পুরো পোশাকটাই সেখানে বানাতে দেওয়া হল। বাড়ি ফিরে অন্য সকলকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে মারিয়া দিমিত্রয়েভনা নাতাশাকে নিজের কাছে রেখে দিল, তারপর নিজের হাতল-চেয়ারে তাকে বসিয়ে দিয়ে বলল, এবার আমরা কথা বলি। তোমার ভাবী বরের জন্য তোমাকে অভিনন্দন জানাই। একটি ভালো ছেলেকেই বঁড়শিতে গেঁথেছ! তোমাকে নিয়ে আমি খুশি, এই এতটুকু বয়স থেকে তাকে আমি চিনি। মাটি থেকে ফুট দুই উঁচুতে হাত রেখে সে বলল। নাতাশার মুখ সুখে আরক্তিম হয়ে উঠল। তাকে এবং তার পরিবারের সকলকেই আমি পছন্দ করি। এবার শোন! তুমি তো জান, বুড়ো প্রিন্স নিকলাস ছেলের বিয়েটা পছন্দ করছে না। বুড়ো একটু গোলমেলে মানুষ! অবশ্য প্রিন্স আন্দ্রু ছেলেমানুষ নয়, তাকে ছাড়াই সে চলতে পারে, কিন্তু বাবার অমতে কোনো পরিবারে ঢোকাটা তো ভালো কথা নয়। লোকে শান্তিতে, ভালোবাসার ভিতর দিয়েই সে কাজটা করতে চায়। তুমি তো বুদ্ধিমতী মেয়ে, কীভাবে কি করতে হয় তাও জান। দয়ালু হও, বুদ্ধি খরচ কর। সব ঠিক হয়ে যাবে।
নাতাশা চুপ করে রইল, প্রিন্স আন্দ্রুকে ভালোবাসার ব্যাপারে অপর কেউ হস্তক্ষেপ করুক এটা সে পছন্দ করে না।
দেখ, প্রিন্স আন্দ্রুকে আমি অনেকদিন থেকে জানি, তোমার ভাবী-ননদ মারিও আমার প্রিয়। ননদিরা কুটিলাই হয়ে থাকে, কিন্তু এটি একটা মাছির গায়েও কখনো হাত তুলবে না। সেই আমাকে বলেছে তোমাদের দুজনকে দেখা করিয়ে দিতে। কাল বাবাকে সঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে যাবে। তার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করো : তুমি তো বয়সে তার থেকে ছোট। পরে সে এসে দেখবে তার বোন ও বাবার সঙ্গে তোমার আগেই পরিচয় হয়েছে, আর তোমাকে তারা পছন্দ করেছে। ঠিক বলছি কি না? সেটাই কি ভালো হবে না?
