উত্তরে বরিস নিচের পংক্তিগুলি লিখল :
প্রিয় বিষাদ, স্পর্শকাতর মনের কাছে তুমি বিষময় পুষ্টি,
তোমাকে না পেলে আমার কাছে সুখ হত অসম্ভব,
হায়, তুমি আমাকে সান্ত্বনা দাও,
আমার ছায়াচ্ছন্ন অবসরের যন্ত্রণাকে তুমি শান্ত কর,
আমার চোখের জলের স্রোতে মিশিয়ে দাও এক ফোঁটা গোপন মাধুর্য।
আন্না মিখায়লভনা প্রায়ই কারাগিনদের বাড়িতে যায়। জুলির মায়ের সঙ্গে তাস খেলতে বসে হাসতে হাসতে জুলির যৌতুক সম্পর্কে কৌশলে খোঁজখবর নেয় (সে পাবে পেঞ্জার দুটো জমিদারি এবং নিঝেগোরদের জঙ্গল)।
মেয়েকে বলল, প্রিয় জুলি, তুমি সর্বদাই মনোরমা ও বিষাদময়ী। মাকে বলল, বরিস বলে, আপনার বাড়িতে এলে তার আত্মা শান্তি পায়। জীবনে সে অনেক ব্যর্থতা সহ্য করেছে। তার মনটা বড়ই নরম। ছেলেকে বলল, দেখ বাবা, জুলিকে আমি যে কতখানি ভালোবেসে ফেলেছি তা বলতে পারি না। কিন্তু তাকে
ভালোবেসে কি থাকা যায়? সে যে দেবদূত! আহা, বরিস, বরিস! একটু থেমে আবার শুরু করল, তার মাকে দেখে আমার বড় কষ্ট হয়। আজ তিনি আমাকে পেঞ্জা থেকে আসা হিসাব ও চিঠিপত্র দেখালেন। আহা বেচারি, তাকে সাহায্য করবার কেউ নেই, সকলেই তাকে কত ঠকাচ্ছে।
মার কথা শুনতে শুনতে বরিস তার অলক্ষ্যে হাসল। মাঝে মাঝে পেঞ্জা ও নিঝেগোরদ জমিদারি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদও করল।
জুলি আশা করেছিল, বরিস নিজেই তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করবে, আর করলেই সে প্রস্তাব সে গ্রহণ করবে, কিন্তু নানা কারণে বরিস মুখ খুলল না। এদিকে তার ছুটি ফুরিয়ে আসছে। প্রতিটি দিন সারাক্ষণই সে কারাগিনদের বাড়িতে কাটায়, আর প্রতিদিনই মনে মনে সমস্ত বিষয়টা ভেবে নিয়ে নিজেকেই বলে, আগামীকাল বিয়ের প্রস্তাব করবে। কিন্তু জুলির সামনে দাঁড়িয়ে তার লাল মুখ ও থুতনি, তার ভেজা-ভেজা চোখ, বিবাহিত জীবনের উচ্ছ্বসিত আনন্দের মধ্যে ঝাঁপ দেবার উদগ্র বাসনা-এসবকিছু দেখে বরিস কিছুতেই শেষ কথাটি উচ্চারণ করতে পারে না, যদিও অনেক দিন আগে থেকেই সে কল্পনায় নিজেকে পেঞ্জা ও নিঝেগোরদের জমিদারির মালিক বলে ভেবে রেখেছে, এবং তার থেকে আয়ের টাকা কীভাবে কোন কোন খাতে খরচ করবে তাও ঠিক করে রেখেছে। বরিসের এই ইতস্তত ভাব জুলির নজর এড়াল না, কখনো কখনো এ চিন্তাও তার মাথায় এল যে সে বরিসকে আকর্ষণ করতে পারছে না, কিন্তু নারীর সহজাত আত্ম-প্রতারণা সঙ্গে সঙ্গে তাকে এই বলে সান্ত্বনা দিল যে তার প্রতি ভালোবাসার জন্যই কথাটা বলতে বরিস লজ্জা বোধ করছে। কিন্তু যতই দিন যেতে লাগল ততই সে বিরক্ত হয়ে উঠল, তাই বরিসের যাত্রার কিছু দিন আগেই সে একটা সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা স্থির করে ফেলল। বরিসের ছুটি ফুরোবার ঠিক আগেই আনাতোল কুরাগিন মস্কোতে এসে হাজির হল এবং কারাগিনদের বসার ঘরেও দর্শন দিল, আর জুলিও হঠাৎ সব বিষণ্ণতা ঝেড়ে ফেলে হাসিখুশিভাবে কুরাগিনের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী হয়ে উঠল।
আন্না মিখায়লভনা ছেলেকে বলল, দেখ বাবা, আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি, জুলির সঙ্গে বিয়ে দিতেই প্রিন্স ভাসিলি ছেলেকে মস্কো পাঠিয়েছেন। জুলিকে আমি এত ভালোবাসি যে তার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে। তুমি কি বল বাবা?
তাকে এভাবে বোকা বানানো হচ্ছে, একটা মাস জুলির পিছনে ঘোরাটা এভাবে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে, পেঞ্জার জমিদারির সব আয় হাতছাড়া হয়ে গিয়ে উঠছে সেই বোকা আনাতোলের হাতে-এতে বরিসের কষ্টও কম নয়। সে তখনই কারাগিনদের বাড়িতে ছুটে গেল বিয়ের প্রস্তাব করতে। জুলি কেমন যেন গা-ছাড়াভাবে তার সঙ্গে কথা বলল, বরিস কবে রওনা হচ্ছে সে সম্পর্কে খোঁজখবর করল। যদিও নরম সুরে ভালোবাসার কথা বলার ইচ্ছা নিয়েই বরিস এসেছে, তবু বিরক্তিভরা গলায় মেয়েদের চরিত্রের চটুলতার কথাই বার বার বলতে লাগল। জুলিও অসন্তুষ্ট হয়ে জবাব দিল, মেয়েরা সত্যি সত্যি বৈচিত্র্যের পক্ষপাতী, একই জিনিসের পুনরাবৃত্তিতে তারা ক্লান্তি বোধ করে।
জুলিকে আঘাত করার ইচ্ছা মনে জাগলেও বরিস নিজেকে সংযত করে নিল। বলল, তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আমি আসিনি। বরং…
বরিস জুলির মুখের দিকে তাকাল। তার মুখ থেকে কখন সরে গেছে বিরক্তির ছায়া, লোভাতুর প্রত্যাশায় সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বরিসের দিকে। তার মুখের দিকে চোখ তুলে বরিস বলল, তোমার প্রতি আমার মনের কথা তো তুমি জান।
আর কিছু বলার দরকার হল না : জয়ের আনন্দে ও আত্মতুষ্টিতে জুলির মুখখানি জ্বলজ্বল করে উঠল, কিন্তু এক্ষেত্রে যা কিছু বলা হয়ে থাকে সব সে বরিসের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিল-বরিস তাকে ভালোবাসে, অন্য কোনো নারীকে সে কোনোদিন তার মতো করে ভালোবাসেনি। জুলি জানে, পেঞ্জার জমিদারি ও নিঝেগোরদের জঙ্গলের বিনিময়ে এটুকু দাবি সে মিটিয়েই নিল।
বাগদত্তা দুই তরুণ-তরুণী এখন আর বলে না যে গাছেরা তাদের জীবনে অন্ধকার বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দেয়, পিটার্সবুর্গে একটা চমৎকার বাড়ি নেবার পরিকল্পনায় তারা সর্বদা ব্যস্ত থাকছে, নানা নোকজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করছে, আর একটি সাড়ম্বর বিয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
.
অধ্যায়-৬
জানুয়ারির শেষের দিকে বুড়ো কাউন্ট রস্তভ নাতাশা ও সোনিয়াকে নিয়ে মস্কো চলে গেল। কাউন্টেস তখনো অসুস্থ, বিদেশে চলাফেরা করতে অক্ষম, অথচ তার সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করাও অসম্ভব। প্রিন্স আন্দ্রু যে কোনোদিন মস্কো পৌঁছে যাবে, বিয়ের পোশাকের ব্যবস্থা করতে হবে, মস্কোর নিকটস্থ জমিদারিটা বিক্রি করে দিতে হবে, তাছাড়া বুড়ো প্রিন্স বলকনস্কি মস্কোতে থাকতে থাকতেই ভাবী পুত্রবধূটিকে একবার দেখিয়ে দেবার সুযোগটাও হাতছাড়া করা যায় না। সেবার শীতকালে রস্তভদের মস্কোর বাড়িটা গরম রাখার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি, আর যেহেতু তারা খুব অল্প দিনের জ্যই এসেছে এবং কাউন্টেসও তাদের সঙ্গে আসেনি, তাই কাউন্ট স্থির করল মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা অখরসিভার বাড়িতেই উঠবে, অনেকদিন ধরে মহিলা এ নিয়ে পীড়াপীড়ি করছিল।
