আলোচনার বিষয় পাল্টাবার জন্য প্রশ্ন করল, রস্তভঙ্গের কোনো খবর জানেন কি? শুনেছিলাম তারা শীঘ্রই আসছে। আমিও আশা করছি, আন্তু যে-কোনো দিন এসে পড়বে। এখানে সকলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হোক সেটাই আমি চাই।
বুড়ো প্রিন্স সম্পর্কে পিয়ের জানতে চাইল, তিনি এখন ব্যাপারটাকে কি চোখে দেখছেন?
প্রিন্সেস মারি মাথা নাড়ল।
কি যে করি? কয়েক মাসের মধ্যেই তো বছর শেষ হয়ে যাবে। এ যে অসম্ভব। আমি শুধু চাই প্রথম ধাক্কাটা থেকে দাদাকে বাঁচাতে। আমি চাই তারা তাড়াতাড়ি এসে পড় ক। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই। আপনি তো তাদের অনেক দিন থেকে চেনেন। সব কথা আমাকে সত্যি করে বলুন তো : মেয়েটি কেমন, আর তার সম্পর্কে আপনার ধারণাই বা কি-প্রকৃত সত্যই জানতে চাই, কারণ আপনি তো জানেন, বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেক ঝুঁকি নিয়েই আন্তু এ কাজ করছে, আর তাই আমি জানতে চাই…
অকারণেই লজ্জায় লাল হয়ে পিয়ের বলল, আপনার প্রশ্নের কি জবাব যে দেব বুঝতে পারছি না। আমি সত্যি জানি না তিনি কি রকম মেয়ে, তাকে বিশ্লেষণ করা তো দূরের কথা। তবে তিনি মনোহারিণী, কিন্তু কিসের জন্য মনোহারিণী তাও জানি না। তার সম্পর্কে শুধু এইটুকুই বলতে পারি।
প্রিন্সেস মারি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার মুখের ভাবই বলল : হ্যাঁ, আমিও এই আশা করেছিলাম, এই আশংকা করেছিলাম।
মেয়েটি কি চালাক-চতুরঃ প্রিন্সেস মারি শুধাল।
তা মনে করি না, তবে-তাও বটে।…না, না, তিনি শুধুই মনোহারিণী।
প্রিন্সেস মারি পুনরায় অসম্মানিসূচক ঘাড় নাড়ল।
আঃ, তাকে পছন্দ করাটাই তো আমি চাই! আমার আগেই যদি তার সঙ্গে আপনার দেখা হয় তো এই কথাটা তাকে বলবেন।
পিয়ের বলল, শুনেছি তারা খুব শিগগিরই এসে পড়বেন।
প্রিন্সেস মারি পিয়েরকে তার পরিকল্পনার কথা জানাল, রস্তভরা পৌঁছবার পরেই সে ভাবী বৌদির সঙ্গে ভাব জমিয়ে তুলবে এবং বুড়ো প্রিন্সকে তার প্রতি সদয় করে তুলতে চেষ্টা করবে।
.
অধ্যায়-৫
পিটার্সবুর্গে কোনো ধনী যোগাড় করতে না পেরে সেই উদ্দেশ্য নিয়েই বরিস মস্কোতে এসেছে। সেখানে দুই ধনবতী উত্তরাধিকারিণী জুলি ও প্রিন্সেস মারিকে নিয়ে সে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে গেছে। শাদাসিদে আচরণ সত্তেও জুলির তুলনায় প্রিন্সেস মারিকেই তার বিশেষ আকর্ষণীয় বলে মনে হয়েছে, অথচ যে কারণেই হোক তার সঙ্গে ঠিকমতো পূর্বরাগ জাগিয়ে তুলতে সে পারেনি। বুড়ো প্রিন্সের নামকরণ-দিবসে তাদের সর্বশেষ সাক্ষাতের দিনেও বরিস যতই আবেগের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করেছে, প্রিন্সেস মারি যেন তা শুনতেই পায়নি, আর শুনতে পেলেও কালে-ভদ্রে জবাব দিয়েছে।
আর একটু অদুতভাবে হলেও জুলি সঙ্গে সঙ্গেই তার মনোযোগকে স্বাগত জানিয়েছে।
জুলির বয়স সাতাশ বছর। ভাইদের মৃত্যুর পরে সে এখন প্রচুর সম্পত্তির মালিক। দশ বছর আগে সে যখন ছিল সপ্তদশী বালিকামাত্র তখন যে কেউ প্রত্যহ সে বাড়িতে যেতে ভয় পেত পাছে মেয়েটি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং সে নিজেও বাঁধা পড়ে যায়, কিন্তু এখন সে সাহসে ভর করে প্রতিদিনই সেবাড়িতে যেতে পারে এবং তাকে ভাবী বিয়ের কনে হিসেবে না দেখে তার সঙ্গে যৌনসম্পর্কহীন পরিচয় গড়ে তুলতে পারে।
সেই শীতকালটা কারাগিনদের বাড়িটাই ছিল মস্কো শহরের সবচাইতে প্রীতিপদ ও আতিথেয়তার কেন্দ্র। আনুষ্ঠানিক ভোজসভা ছাড়াও অনেক মানুষ, প্রধানত পুরুষ, প্রতিদিন সেখানে জমায়েত হয়, মধ্যরাত পর্যন্ত খানা-পিনা করে এবং সকাল তিনটে পর্যন্ত কাটায়। জুলি কখনো কোনো নাচের আসর, প্রমোদ-ভ্রমণ বা নাটক বাদ দেয় না। তার পোশাকও একেবারে হালফ্যাশনের। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তার মনে কোনো মোহ নেই, সকলকেই সে বলে বেড়ায় যে বন্ধুত্বে বা ভালোবাসায় অথবা জীবনের অন্য কোনো আনন্দে সে বিশ্বাস করে না, তার একমাত্র প্রত্যাশা ওপারের শান্তি। ফলে বাড়িতে যত অতিথি আসে সকলেই তার এই জীবন বৈরাগ্যের গুণকীর্তন করে এবং তার পরে নানা রকম গল্প-গুজব, নাচ-গান, বুদ্ধির খেলা ও কবিতার লড়াইয়ে মেতে ওঠে। কারাগিন-পরিবারে এই শেষোক্ত ব্যবস্থাটির খুব প্রচলন। একমাত্র বরিস এবং অপর কয়েকটি যুবকই জুলির এই বিষণ্ণতাবাদী মনোভাব নিয়ে কথা বলে, জুলিও জাগতিক ব্যাপারের তুচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘ সময় তাদের সঙ্গে আলোচনা করে, নানা শোকসূচক রেখাচিত্র, প্রবাদ-বচন ও কবিতায় ভরা অ্যালবামগুলো তাদের দেখায়।
বরিসের প্রতি জুলি একটু বিশেষ রকমের সদয় : জীবনের প্রথম পর্বেই যেভাবে তার স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছে তা নিয়ে জুলি দুঃখপ্রকাশ করল, নিজে অনেক দুঃখ পেয়েছে বলে সাধ্যমতো বন্ধুত্বপূর্ণ সান্ত্বনা দেবার প্রস্তাব করল এবং নিজের অ্যালবামটা তার হাতে তুলে দিল। বরিস অ্যালবামে দুটো গাছের ছবি এঁকে তার নিচে লিখল : পল্লীবৃক্ষ, তোমার কালো কালো শাখা আমার উপর ছড়িয়ে দিয়েছে বিষণ্ণ অন্ধকার।
আর একটা পাতায় একটা সমাধি একে তাতে লিখল :
মৃত্যু স্বস্তি দেয়, মৃত্যু শান্তিময়।
যন্ত্রণার হাত থেকে অন্য আর কি আছে আশ্রয়!
জুলি বলল, এটা চমৎকার হয়েছে।
একটা বই থেকে লিখে রাখা একটি অনুচ্ছেদের আক্ষরিক পুনরাবৃত্তি করে জুলি বলল, বিষাদের হাসিতে আছে এক মনোহারিণী শক্তি। সে যেন অন্ধকারে আলোর শিখা, দুঃখ ও নৈরাশ্যের মধ্যে ক্ষণিকের অবসর, যা দেখায় সান্ত্বনার সম্ভাবনা।
