কাউন্ট রস্তপচিন বলল, কিন্তু প্রিন্স, ফরাসিদের সঙ্গে আমরা যুদ্ধ করব কেমন করে? আমাদের শিক্ষক ও ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে কি আমরা যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে পারি? আমাদের যুবকদের দিকে তাকান, মহিলাদের দিকে তাকান! ফরাসিরা তো আমাদের ভগবান : প্যারিস তো আমাদের স্বর্গরাজ্য!
প্রত্যেককে শোনাবার জন্য সে ক্রমেই গলা চড়িয়ে কথা বলতে লাগল।
ফরাসি পোশাক, ফরাসি ভাবধারা, ফরাসি অনুভূতি! এই তো, আপনি মেতিভিয়েরকে ঘাড় ধরে বের করে দিলেন কারণ সে একটি ফরাসি শয়তান, কিন্তু আমাদের মহিলারা তো নতজানু হয়ে তার পিছনে ছোটেন! গত রাতে আমি একটা পার্টিতে গিয়েছিলাম, সেখানে প্রতি পাঁচজন মহিলার মধ্যে তিনজন রোম্যান ক্যাথলিক, তারা প্রতি রবিবার উল বোনার জন্য পোপের অনুগ্রহ পেয়ে থাকেন। অথচ যদি অনুমতি করেন তো বলি, তারা সকলেই বসে ছিলেন সাধারণ মান-ঘরের সাইনবোর্ডের মতো প্রায় উলঙ্গ হয়ে। উঃ, আমাদের যুবকদের দেখলে কি মনে হয় জানেন প্রিন্স, মনে হয় যাদুঘর থেকে মহান পিতরের পুরনো মুগুরটা তুলে এনে তাদের সবাইকে রুশ পদ্ধতিতে এমন ধোলাই দিই যাতে এইসব দুর্বুদ্ধি তাদের মাথা থেকে পালিয়ে যায়!
সকলেই চুপ। বুড়ো প্রিন্স রস্তপচিনের দিকে তাকিয়ে সমর্থনসূচক ঘাড় নাড়তে লাগল।
রপচিন উঠে দাঁড়াল, প্রিন্সের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা, তাহলে বিদায় ইয়োর এক্সেলেন্সি, ভালোভাবে থাকবেন!
…বিদায় বন্ধু… তার কথাগুলি যেন সঙ্গীত, তার কথা শুনলে কদাপি ক্লান্তি আসে না! হাতটা চেপে ধরে গালটা এগিয়ে দিয়ে বুড়ো প্রিন্স বলল।
রস্তপচিনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্যরাও উঠে পড়ল।
.
অধ্যায়-৪
প্রিন্সেস মারি বসে বসে বুড়ো মানুষগুলির কথাবার্তা ও অন্যের দোষ ধরার ব্যাপারগুলি শুনছিল, কিন্তু যা শুনল তার কিছুই বুঝল না, তার একমাত্র চিন্তা, তার প্রতি বাবার এই বিরূপ মনোভাব অতিথিদের চোখে পড়েছে কি না। ডিনারের সময় বরিস বেস্কয় যে তার দিকে বিশেষভাবে নজর দিচ্ছিল তাও সে খেয়াল করেনি। বরিস বেস্কয় ইতিমধ্যেই তিনবার তাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
বুড়ো ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। অতিথিরাও চলে গেছে। ঘরে শুধু প্রিন্সেস মারি ও পিয়ের। টুপিটা হাতে নিয়ে হাসিমুখে পিয়ের বলল, আমি আরো কিছুক্ষণ থাকতে পারি কি? বলতে বলতেই সে পাশের হাতল চেয়ারটায় বসে পড়ল।
প্রিন্সেস মারি বলল, নিশ্চয়। তার চোখের দৃষ্টি যেন বলতে চাইল, আপনি কি কিছুই দেখেননি?
তখন পিয়েরের মেজাজ খুব ভালো। সোজা সামনে তাকিয়ে একটু হেসে শুধাল, ওই যুবকটি কি আপনি অনেকদিন থেকে চেনেন প্রিন্সেস?
কে?
দ্রুবেৎস্কয়।
না, বেশি দিন নয়…
ওকে আপনার ভালো লাগে?
হ্যাঁ, বেশ ভালো লোক। কিন্তু সে-কথা জিজ্ঞাসা করছেন কেন?
কারণ আমি লক্ষ্য করে দেখেছি কোনো যুবক যখন ছুটি নিয়ে পিটার্সবুর্গ থেকে মস্কোতে আসে তখন সাধারণত কোনো ধনবতী উত্তরাধিকারিণীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে নিয়েই আসে।
আপনি তাও লক্ষ্য করেছেন? প্রিন্সেস মারি বলল।
পিয়ের হেসে জবাব দিল, হ্যাঁ। এই যুবকটিকেও দেখছি যেখানেই কোনো ধনবতী উত্তরাধিকারিণী সেখানেই তিনি। বইয়ের পাতার মতোই তার মনের কথা আমি পড়তে পারছি। বর্তমানে কাকে পাকড়াও করবে তাই নিয়ে সে ইতস্তত করছে-আপনাকে, না মাদময়জেল জুলি কারাগিনাকে। তার দিকেও যুবকটির কড়া নজর পড়েছে।
তিনি সেখানেও যান?
হ্যাঁ, প্রায়ই যান। পূর্বরাগের নতুন বিধির খবর কিছু রাখেন কি? মজার হাসি হেসে পিয়ের বলল।
না, প্রিন্সেস মারি জবাব দিল।
মস্কোর মেয়েদের খুশি করতে হলে আজকাল খুব মন-মরা ভাব দেখাতে হয়! মাদময়জেল কারাগিনার কাছে সে খুবই বিষণ্ণচিত্তে ঘুরে বেড়ায়। পিয়ের বলল।
পিয়েরের সদয় মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, মনের কথা কাউকে বলতে পারলে স্বস্তি পেতাম। সবকিছুই পিয়েরকে বলা দরকার। সে খুব দয়ালু ও উদার। কিছুটা স্বস্তি পাব। সে আমাকে সদুপদেশ দেবে।
আপনি কি তাকে বিয়ে করবেন?
হায় ঈশ্বর, কাউন্ট, এমন অনেক মুহূর্ত আসে যেন মনে হয় যে কোনো লোককে বিয়ে করে ফেলি, অশ্রুসিক্ত গলায় উচ্চস্বরে কথাটা বলে সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। কাঁপা গলায় বলতে লাগল, হায়রে, আপনজন কাউকে ভালোবেসেও যদি বোঝা যায় যে তার জন্য আমি কিছুই করতে পারি না, শুধু তাকে দুঃখ দিতেই পারি, কোনো কিছুই বদলাতেও পারি না, সে যে কী কষ্ট! তখন তো একটিমাত্র পথই খোলা থাকে-কোথাও চলে যাওয়া, কিন্তু আমি যাবই বা কোথায়?
ব্যাপার কি প্রিন্সেস? কি হয়েছে?
কথা শেষ না করেই প্রিন্সেস মারি কেঁদে ফেলল।
আজ যে আমার কি হয়েছে তা আমি নিজেই জানি না। এসব মনে রাখবেন না-যা বলেছি ভুলে যান।
পিয়েরের মনের প্রফুল্লতা সম্পূর্ণ উবে গেল। সাগ্রহে প্রিন্সেসকে নানা রকম প্রশ্ন করতে লাগল, সব কথা খুলে বলে মনের দুঃখ অকপটে জানাতে অনুরোধ করল, কিন্তু প্রিন্সেস মারি বার বার শুধু একই কথা বলতে লাগল : সে যা বলেছে তা যেন পিয়ের ভুলে যায়, সে যে কি বলেছে তাও তার মনে নেই, একটিমাত্র বিপদ ছাড়া আর কোনো বিপদ তার নেই–সেটা হচ্ছে, প্রিন্স আন্দ্রুর বিয়েকে কেন্দ্র করে পিতা-পুত্রে একটা সংঘাতের আশংকা দেখা দিয়েছে।
