অল্প কয়েকদিন হল বরিস ছুটি নিয়ে মস্কো এসেছে। প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কির সঙ্গে সাক্ষাতের বাসনা তার খুবই প্রবল, আর সেই উদ্দেশ্যে নানা ছুতোয় প্রিন্সের এত কাছাকাছি আসতে পেরেছে যে নিজের বাড়িতে অবিবাহিতদের আমন্ত্রণ না করার যে নীতি বুড়ো প্রিন্স সর্বদা মেনে চলে তার বেলায় সে নীতির ব্যতিক্রম ঘটানো হয়েছে।
ডিনারে বসে সর্বশেষ রাজনৈতিক সংবাদ নিয়ে আলোচনা চলল : নেপোলিয়ন কর্তৃক ওল্ডেনবুর্গের ডিউকের রাজ্য দখল করা এবং তার বিরুদ্ধে যে রুশ মন্তব্য সব ইওরোপিয় রাজদরবারে পাঠানো হয়েছে তার কথা।
ইতিপূর্বে আরো অনেকবার উচ্চারিত একটি মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে কাউন্ট রস্তপচিন বলল, কোনো জলদস্যু একটা জাহাজ দখল করলে তার প্রতি যে আচরণ করে, নেপোলিয়ন ইওরোপকে নিয়ে সেইরকমই আচরণ করছে। শুধু অবাক হতে হয় মুকুটধারীদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ও অন্ধত্ব দেখে। এবার পোপের পালা এসেছে, ক্যাথলিক গির্জার প্রধানকে গদিচ্যুত করতেও নেপোলিয়নের বিবেকে বাঁধেনি-অথচ সকলেই চুপচাপ! একমাত্র আমাদের সম্রাটই ওন্ডেনবুর্গের ডিউকের রাজ্য দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন…এমন কি, এর বেশি আর কিছু বলা ঠিক হবে না বুঝতে পেরে কাউন্ট রস্তপচিন থেমে গেল।
প্রিন্স বলকনস্কি বলল, ওন্ডেনবুর্গ রাজ্যের পরিবর্তে অন্য রাজ্য দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আমি যেরকম আমার ভূমিদাসদের বল্ড হিলস থেকে বগুচাবোত অথবা আমার রিয়াজান জমিদারিতে বদলি করতে পারি তেমনই বোনাপার্টও ডিউকদের ইচ্ছামতো বদলি করতে চায়।
সসম্মানে আলোচনায় যোগ দিয়ে বরিস বলল, ওল্ডেনবুর্গের ডিউক কিন্তু প্রশংসনীয় চারিত্রিক দৃঢ়তার সঙ্গে তার এই দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়েছেন।– প্রিন্স বলকনস্কি যুবকটির দিকে তাকাল, যেন কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তাকে বড় বেশি ছেলেমানুষ মনে করে সে ইচ্ছা ত্যাগ করল।
ওল্ডেনবুর্গের ব্যাপার নিয়ে আমাদের প্রতিবাদ-পত্রটা আমি পড়েছি। চিঠিটার শব্দ-প্রয়োগ এতই খারাপ যে আমি অবাক হয়ে গেছি, যেন একটা অতিপরিচিত বিষয় নিয়ে কথা বলছে এমনই সুরে কাউন্ট রস্তপচিন মন্তব্য করল।
পিয়ের অবাক বিস্ময়ে রস্তপচিনের দিকে তাকাল, চিঠির খারাপ শব্দপ্রয়োগ নিয়ে তার এত মাথাব্যথা কেন সেটা তার মাথায় ঢুকল না।
মুখে বলল, দেখুন কাউন্ট, চিঠিটার বক্তব্য যখন বেশ জোরালো তখন তার শব্দ-প্রয়োগে কি যায় আসে?
কাউন্ট রস্তপচিন জবাব দিল, না হে মশাই, আমাদের সৈন্যসংখ্যা যখন পাঁচ লক্ষ তখন একজন ভালো লিখিয়ে পাওয়া আরো সহজ হওয়া উচিত।
চিঠির শব্দ-প্রয়োগ নিয়ে কাউন্টের অসন্তুষ্টিটা এবার পিয়ের বুঝতে পারল।
বুড়ো প্রিন্স বলল, ভালো কলমচি গজিয়ে ওঠা উচিত তো ছিলই। পিটার্সবুর্গে তারা তো সর্বদাই লিখে চলেছে–শুধু চিঠিপত্র নয়, নতুন নতুন আইন পর্যন্ত। আমার আন্দু তো সেখানে রাশিয়ার জন্য আইনের একটা গোটা বইই লিখে ফেলেছে। এখন তো তারা সব সময়ই লেখে! কাউন্ট অস্বাভাবিকভাবে হেসে উঠল।
আলোচনায় সাময়িকভাবে ছেদ পড়ল, সেই ফাঁকে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বুড়ো সেনাপতি গলাটা পরিষ্কার করে নিল।
পিটার্সবুর্গে সেনা-পরিদর্শন কালের শেষ ঘটনাটা শুনেছেন কি? নতুন ফরাসি রাজদূতের আচরণটি বড়ই শোচনীয় হয়েছিল।
অ্যাঁ? হ্যাঁ, কিছুটা শুনেছি : সম্রাটের উপস্থিতিতে তিনি বোধহয় অদ্ভুত কিছু বলেছিলেন।
সেনাপতি বলতে লাগল, সম্রাট বোমারু বাহিনীর প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, কিন্তু মনে হল রাজদূতটি সেটা খেয়াল না করে হুট করে বলে ফেললেন; ফ্রান্সে আমরা এসব তুচ্ছ ব্যাপারে মনোযোগ দেই না। সম্রাট কোনো কথাই বললেন না। পরবর্তী সেনা-পরিদর্শনকালে সম্রাট তার সঙ্গে একটা কথাও বলেননি।
সকলেই চুপচাপ। ব্যক্তিগতভাবে সম্রাটকে নিয়ে যেখানে কথা সেখানে কোনোরকম মতামত প্রকাশ করাই অসম্ভব।
প্রিন্স বলল, বেয়াদবের দল! মেতিভিয়েরকে চেনেন তো? আজ সকালেই তাকে আমার বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। রাগত দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, তাদের যেন ঢুকতে না দেওয়া হয় এ অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল।
ফরাসি ডাক্তারটির সঙ্গে তার যেসব কথা হয়েছিল সব সবিস্তারে বর্ণনা করে মেতিভিয়ের যে একজন গুপ্তচর সে ধারণার স্বপক্ষে তার যুক্তিগুলোও শুনিয়ে দিল। যদিও যুক্তিগুলো খুবই অসার এবং অপ্রতুল, তবু তা নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করল না।
খাবার পরে শ্যাম্পেন পরিবেশন করা হল। অতিথিরা দাঁড়িয়ে বুড়ো প্রিন্সকে অভিনন্দিত করল। প্রিন্সেস মারিও তার কাছে এগিয়ে গেল।
ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বুড়ো প্রিন্স চুমো খাওয়ার জন্য তার পরিষ্কার কামানো বলিরেখায় ভর্তি গালটা এগিয়ে দিল। বাবার মুখের ভাব দেখেই মেয়ে বুঝতে পারল, সকালের কোনো কথাই সে ভোলেনি, তার সিদ্ধান্ত বলবই আছে, শুধু অতিথিদের উপস্থিতির জন্য এখন সে-কথাগুলি বলতে পারল না।
সেখান থেকে সকলে বসার ঘরে গেল, সেখানে কফি দেওয়া হল।
প্রিন্স নিকলাস অধিকতর উৎসাহভরে আসন্ন যুদ্ধ সম্পর্কে তার মতামত প্রকাশ করল।
বলল, অস্ট্রিয়ার স্বপক্ষে বা বিপক্ষে আমাদের যুদ্ধ করা উচিত নয়। আমাদের রাজনৈতিক স্বার্থ সবটাই পূর্বাঞ্চলে, আর বোনাপার্টের ব্যাপারে আমাদের একমাত্র কাজ হল একটা সশস্ত্র সীমান্ত রক্ষা করা এবং একটা দৃঢ় নীতি অনুসরণ করা, তাহলে আর ১৮০৭ সালের মতো রুশ সীমান্ত লংঘন করার সাহস তার হবে না!
