প্রিন্সেস মারি মাদময়জেল বুরিয়ের কাছে ক্ষমা চাইল এবং নিজের জন্য ও পরিচারক ফিলিপের জন্য বাবার কাছেও ক্ষমা চেয়ে নিল।
সেই সব মুহূর্তে ত্যাগের একটা গর্বের ভাব প্রিন্সেস মারির মনে সঞ্চিত হল। আর হঠা হয় তো সেই বাবা তারই সামনে জোড়া খুঁজেতে লাগল, চশমার কাছেই হাতড়েও সেটাকে দেখতে পেল না, অথবা দুর্বল পায়ে ভুল করে পা ফেলল, অথবা তার চাইতেও যা খারাপ, হয়তো ডিনারে বসে সঙ্গীসাথীর অভাবে সেখানেই হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ল, তোয়ালেটা নিচে পড়ে গেল, আর মাথাটা কাঁপতে কাঁপতে প্লেটের উপরেই এলিয়ে পড়ল। সেইসব মুহূর্তে নিজের উপরেই রাগ করে সে ভাবল, মানুষটি বুড়ো হয়েছে, দুর্বল হয়েছে আর আমি কিনা তাকেই শাস্তি দিচ্ছি।
.
অধ্যায়-৩
১৮১১ সালে মস্কোতে একজন ফরাসি ডাক্তার-মেতিভিয়ের-বাস করত। তখন তার খুব নামডাক। লোকটি অত্যন্ত দীর্ঘকায়, সুদর্শন, ফরাসিদের মতোই অমায়িক, এবং মস্কোসুদ্ধ লোক বলে সে অসাধারণ চতুর। সব বড় বড় বাড়িতেই তার ডাক পড়ে, শুধু ডাক্তার হিসেবেই নয়, সমপর্যায়ের একজন মানুষ হিসেবে।
প্রিন্স নিকলাস চিরকাল শুষুধপত্রকে ঠাট্টা করে এসেছে, কিন্তু ইদানীং মাদময়জেল বুরির্টের পরামর্শক্রমে এই ডাক্তারটিকে তার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করার অনুমতি দিয়েছে এবং তার সঙ্গে চলাফেরায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। মেতিভিয়ের সপ্তাহে দুইদিন প্রিন্সকে দেখতে আসে।
৬ই ডিসেম্বর-সেন্ট নিকলাস দিবস এবং প্রিন্সের নামকরণ দিবস উপলক্ষে গোটা মস্কো প্রিন্সের সদর ফটকে এসে হাজির হল, কিন্তু সে কাউকে ঢুকবার অনুমতি দিল না, শুধু অল্প কয়েকজনকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করার অনুমতি দিল, আর তাদের নামের একটা তালিকা প্রিন্সেস মারির হাতে তুলে দিল।
মেতিভিয়ের সকালেই প্রিন্সকে শুভকামনা জানাতে এসে তার সঙ্গে দেখা করতে গেল। ঘটনাক্রমে নামকরণ দিবসের সেই সকালবেলাটায় প্রিন্সের মেজাজ ছিল ভয়ানক তিরিক্ষি। সারাটা সকাল বাড়িময় ঘুরে ঘুরে প্রিন্স কেবলই সকলের দোষ খুঁজে বেড়াতে লাগল। প্রিন্সেস মারি বাবার এ মেজাজকে ভালোরকমই চেনে-একটা ঝড়ের পূর্বাভাস : যে-কোনো সময় ঝড় উঠতে পারে। সারাটা সকাল প্রিন্সেস মারি যেন একটা গুলি-ভরা কামানের মুখে অনিবার্য বিস্ফোরণের অপেক্ষায় কাটাতে লাগল। ডাক্তার না আসা পর্যন্ত সকালটা ভালোয়-ভালোয়ই কাটল। ডাক্তারকে স্বাগত জানিয়ে প্রিন্সেস মারি একটা বই নিয়ে বসার ঘরের দরজার কাছেই বসল, পড়ার ঘরের সব কথাবার্তাই সেখান থেকে শোনা যায়।
প্রথমে শোনা গেল শুধু মেতিভিয়েরের গলা, তারপর বাবার গলা, তারপর একসঙ্গে দুজনের গলা, দরজাটা হাঁ-হাঁ করে খুলে গেল, আর চৌকাঠের উপর দেখা গেল ভয়ার্ত মেতিভিয়েরের সুদর্শন মূর্তি এবং ড্রেসিং-গাউন ও ফেজ পরা প্রিন্সকে, রাগে তার মুখটা বিকৃত হয়ে গেছে, চোখের মণি দুটো নিচের দিকে ঘুরছে।
প্রিন্স চিৎকার করে বলছে, তোমরা কেন বুঝতে পার না? কিন্তু আমি সব বুঝি! ফরাসি গুপ্তচর, বোনাপার্টের কেনা গোলাম, গুপ্তচর, বোনাপার্টের কেনা গোলাম, গুপ্তচর, আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও! আমি বলছি, চলে যাও… সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
চিৎকার শুনে মাদময়জেল বুরিয়ে পাশের ঘর থেকে একটা ছুটে এসেছে। কাঁধ ঝাঁকুনি দিতে দিতে মেতিভিয়ের তার দিকে এগিয়ে গেল।
বলল, প্রিন্সের শরীরটা ভালো নেই : পিত্তাধিক্য ও রক্তের চাপ। চুপচাপ থাকুন, কাল আমি আবার আসব। ঠোঁটের উপর আঙুল তুলে সে দ্রুত প্রস্থান করল।
পড়ার ঘর থেকে ভেসে এল চটি পায়ে হাঁটার শব্দ ও চিৎকার : গুপ্তচর বিশ্বাসঘাতক, সর্বত্র বিশ্বাসঘাতক। বাড়িতে একমুহূর্তের জন্য শান্তি নেই!
মেতিভিয়ের চলে যাবার পরে প্রিন্স মেয়েকে তার ঘরে ডাকল, আর সব রাগ গিয়ে পড়ল তার ঘাড়ে। একটা গুপ্তচরকে বাড়িতে ঢোকাবার দোষ তো তারই। সে কি মেয়েকে বলেনি, হ্যাঁ, বলেনি যে একটা তালিকা তৈরি করতে হবে, এবং সে তালিকার বাইরে কাউকে ডাকা চলবে না? তাহলে ওই শয়তানটাকে ঢুকতে দেওয়া হল কেন? সব দোষ তার। এই মেয়েটার জন্যই তার একমুহূর্তও শান্তি নেই, সে শান্তিতে মরতেও পারছে না।
নাম ম্যাম’ম! এবার আমাদের আলাদা হতে হবে, হতেই হবে! সেটা বুঝতে পেরেছ, এটা বুঝতে পেরেছ! আমি আর সইতে পারছি না, এই কথা বলে প্রিন্স ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একটু পরেই ফিরে এসে শান্ত ভাব দেখাবার চেষ্টা করে বলল, মনেও করো না যে কথাটা আমি রাগের মাথায় বলেছি। ঠাণ্ডা মাথায় ভেবেচিন্তেই বলেছি, আর সেইভাবেই কাজ হবে-এবার আমাদের ছাড়াছাড়ি হতেই হবে, কাজেই নিজের জন্য একটা জায়গা দেখে নাও।…কিন্তু নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না, হাতের মুঠি পাকিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে-সে তীক্ষ্ণতা শুধু যে ভালোবাসে, ভালোবেসে দুঃখ পায়, তার কণ্ঠেই ফুটতে পারে বলে উঠল : আঃ, যে-কোনো মূর্খও যদি ওকে বিয়ে করত। তারপরেই দরজা বন্ধ করে মাদময়জেল বুরিয়েকে ডেকে পাঠাল।
দুটোর সময় ছজন মনোনীত অতিথি ডিনারের জন্য হাজির হল।
অতিথিরা–বিখ্যাত কাউন্ট রস্তপচিন, প্রিন্স লোপুখিন ও তার ভাইপো, প্রিন্সের সামরিক জীবনের সহকর্মী জেনারেল চাতরভ এবং তরুণদের মধ্যে পিয়ের ও বরিস বেস্কয়–সকলেই প্রিন্সের জন্য অপেক্ষা করছে।
