সম্প্রতি সেই পারিবারিক জীবন প্রিন্সেস মারির পক্ষে খুবই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বল্ড হিলসে থাকতে তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় ও সেখানকার নির্জনতায় তার মন বেশ তাজা থাকত, মস্কোতে এসে জীবনের সেই শ্রেষ্ঠ আনন্দ থেকে সে বঞ্চিত হয়েছে, অথচ শহর-জীবনের কোনো সুখ-সুবিধাই তার নেই। সে সমাজে যায় না, সকলেই জানে, নিজের সঙ্গে ছাড়া প্রিন্স মেয়েকে কোথাও যেতে দেবে না, আর নিজের ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্য প্রিন্সের পক্ষে বাইরে যাওয়াও সম্ভব নয়, কাজেই কেউই প্রিন্সেস মারিকে ডিনারে এবং সান্ধ্য মজলিসে আমন্ত্রণ করে না। বিয়ের আশাও সে ছেড়ে দিয়েছে। তার সম্ভাবিত পাণিপ্রার্থী যেসব যুবক মাঝে মাঝে এ বাড়িতে আসে তাদের প্রতি বুড়ো প্রিন্সের উদাসীনতা ও বিরূপ মনোভাব সে লক্ষ্য করেছে। তার কোনো বান্ধবীও নেই, এবারকার মস্কো ভ্রমণে এসে দুটি ঘনিষ্ঠ বন্ধুই তাকে হতাশ করেছে। মাদময়জেল বুরিয়েকে এখন আর তার ভালো লাগে না, নানা কারণেই প্রিন্সেস মারি তাকে এড়িয়ে চলে। যে জুলির সঙ্গে গত পাঁচ বছর ধরে তার পত্রালাপ চলছিল, মস্কোতে দেখা হবার পরে সেও কেমন যেন তার প্রতি বিরূপ হয়ে পড়েছে। ভাইদের মৃত্যুর ফলে জুলি এখন মস্কোর ধনবতী উত্তরাধিকারিণীদের অন্যতমা, সে এখন উঁচু মহলের সুখের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। সবসময়ই সে যুবকদলপরিবৃত হয়ে থাকে, তার নিজের ধারণা এই যুবকরা এতদিনে তার মূল্য বুঝতে শিখেছে। ফলে মস্কোতে প্রিন্সেস মারির কথা বলার মতো কেউ নেই, চিঠি লিখবার মতো কেউ নেই, দুঃখের কথা বলবার মতো কেউ নেই, আর ঠিক এই সময়েই অনেক দুঃখ নেমে এল তার কপালে, প্রিন্স আন্দ্রুর ফিরে আসা ও বিয়ের সময় ক্রমেই এগিয়ে আসছে, কিন্তু সেজন্য বাবাকে প্রস্তুত রাখতে সে যে অনুরোধ জানিয়েছিল তা তো এখনো কার্যে পরিণত করা হয়নি, বস্তুত অবস্থা খুবই নৈরাশ্যজনক, কারণ কাউন্টেস রপ্তভার কথা উঠলেই বুড়ো প্রিন্স একেবারে ক্ষেপে যায়। সম্প্রতি তার সঙ্গে আর একটা নতুন দুঃখ যোগ হয়েছে। ছয় বছর বয়সের ভাইপোকে পড়াতে বসে সে সভয়ে লক্ষ্য করেছে যে ছোট নিকলাস সম্পর্কে তার মনেও তার নিজের বাবার খিটখিটে মেজাজের লক্ষণগুলি প্রকাশ পাচ্ছে। যতবারই সে মনে করে যে ভাইপোকে পড়াবার সময় কিছুতেই মেজাজ খারাপ করে বসে, ছেলেটির হাত ধরে তাকে ঘরের এককোণে বসিয়ে দেয়। কিন্তু প্রিন্সেস মারির সবচাইতে বেশি দুঃখ বাবার খিটখিটে মেজাজ নিয়ে। বুড়ো প্রিন্স চিরদিনই তার উপর চটা, কিন্তু সম্প্রতি সে মেজাজ যেন নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাবা যদি সারা রাত তাকে মাটিতে শুইয়ে রাখত, তাকে মারধর করত, তাকে দিয়ে জল ও কাঠ বইয়ে আনত, তাহলেও সে নিজের অবস্থাকে কষ্টকর মনে করত না, কিন্তু এই স্বেচ্ছাচারী প্রিয়জনটি শুধু যে তাকে আঘাত করতে ও অপমান করতে জানে তাই নয়, প্রতিটি ব্যাপারে একমাত্র সেই যে দোষী সেটা সাব্যস্ত করতেও জানে। সম্প্রতি বাবার আচরণে এমন একটা লক্ষণ দেখা দিয়েছে যেটা প্রিন্সেস মারিকে সবচাইতে বেশি কষ্ট দিচ্ছে, সেটা হচ্ছে মাদময়জেল বুরিয়ের সঙ্গে বাবার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা। ছেলের বিয়ের অভিপ্রায় জানবার প্রথম মুহূর্তে যে ধারণাটা পরিহাসের সূত্রে তার মনে এসেছিল–অর্থাৎ আন্তু যদি বিয়ে করে তাহলে সেও বুরিয়েকে বিয়ে করবে–সেই ধারণা যেন ক্রমেই সুখের মূর্তি ধরে তার কাছে দেখা দিচ্ছে, সম্প্রতি বুড়ো প্রিন্স বুরিয়ের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে এবং বুরিয়ের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে যেন মেয়ের প্রতি অসন্তোষকেই প্রকাশ করতে চাইছে। অন্তত প্রিন্সেস মারির তাই ধারণা।
মস্কোতে একদিন প্রিন্সেস মারির সামনেই বুড়ো প্রিন্স মাদময়জেল বুরিয়ের হাতে চুমো খেল এবং তাকে কাছে টেনে নিয়ে সাদরে আলিঙ্গন করল। প্রিন্সেস মারির মুখ লাল হয়ে উঠল, সে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কয়েক মিনিট পরে মাদময়জেল বুরিয়ে হাসতে হাসতে প্রিন্সেস মারির ঘরে ঢুকে সুললিত স্বরে মজার মজার কথা বলতে লাগল। প্রিন্সেস মারি অতি চোখের জল মুছে ফেলল, কি করছে না বুঝেই ভাঙা গলায় তারস্বরে চিৎকার করে উঠল : তার দুর্বলতার সুযোগড় নিয়ে…কী সাংঘাতিক, নিচ, অমানুষিক…সেকথা শেষ করতে পারল না, আমার ঘর থেকে চলে যাও, বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
পরদিন প্রিন্স মেয়ের সঙ্গে একটা কথাও বলল না, কিন্তু মেয়ে লক্ষ্য করল যে ডিনারের সময় সে হুকুম দিল, মাদময়জেল বুরিয়েকে সকলের আগে খাবার পরিবেশন করা হোক। ডিনারের পরে কফি পরিবেশন করতে এসে পরিচারক যখন অভ্যাসবশত প্রিন্সেসকে দিয়ে শুরু করল, তখন প্রিন্স হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে ফিলিপকে লক্ষ্য করে হাতের লাঠিটা ছুঁড়ে মারল এবং তক্ষুণি নির্দেশ দিল যে তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে।
প্রিন্স চিৎকার বলে বলল, লোকটা কথার অবাধ্য…দুইবার বলেছি…কিন্তু সে শোনেনি! এ-বাড়িতে এই মহিলাই প্রধানা, সেই আমার শ্রেষ্ঠ বান্ধবী। তারপর এই প্রথম প্রিন্সেস মারিকে সম্বোধন করে বলল, কাল যেমন করেছ আর কখনো যদি ওর সামনে নিজের অবস্থার কথা ভুলে যাও তাহলে আমিই তোমাকে বুঝিয়ে দেব এ-বাড়ির কর্তা কে। চলে যাও! আর যেন তোমাকে দেখতে না হয়, ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও!
