জনকল্যাণমূলক অনুষ্ঠান, বাজে ছবি, মূর্তি, জনসেবক প্রতিষ্ঠান, জিপসিদের নাচ, বিদ্যালয়, চাঁদা তোলার ভোজসভা, কৌতুক-অনুষ্ঠান, ভ্রাতৃসংঘ, গির্জা, পুঁথিপত্র-কাউকে বা কোনো কিছুতেই সে ফিরিয়ে দেয় না, দুটি বন্ধু যদি তার কাছ থেকে মোটা টাকা ধার করে তাকে নিজেদের হেপাজতে না রাখত তাহলে হয় তো সব টাকাই সে বিলিয়ে দিত। তাকে ছাড়া কোনো ভোজসভা বা আমোদ-আহ্লাদ অনুষ্ঠিত হয় না। কি বিবাহিতা, কি অবিবাহিতা সব মহিলাই তাকে পছন্দ করে, কারণ কাউকে ভালোবাসা না জানালেও সকলের প্রতিই সে সমান উদারতা দেখিয়ে থাকে, বিশেষ করে নৈশভোজনের পরে। সকলেই বলে, সে কী মনোরম, তার কাছে নারী-পুরুষ ভেদ নেই।
সাত বছর আগে সে যখন প্রথম বিদেশ থেকেই এসেছিল তখন যদি তাকে বলা হত যে কোনো খুঁজে বেড়াবার অথবা কোনো পরিকল্পনা করার কোনো দরকারই তার নেই, চিরন্তন এক পূর্বনির্দিষ্ট পথ তার জন্য অনেক আগেই কাটা হয়ে আছে, শরীরটাকে যতই এদিক-ওদিক করুক না কেন, তাকেও অন্য সকলের মতোই হতে হবে, তাহলে কী সন্ত্রস্তই না সে হত। সে-কথা সে বিশ্বাসই করতে পারত না! একসময় সে সর্বান্তকরণে রাশিয়াতে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি, চায়নি নেপোলিয়ন হতে, একজন দার্শনিক ও কূটনীতিক হতে, এবং তারপরে নেপোলিনবিজয়ী হতে? সে কি একান্তমনে কামনা করেনি পাপী মানবজাতির পুনরভ্যুত্থান এবং নিজের জন্য পরিপূর্ণতা অর্জন? সে কি বিদ্যালয় ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেনি? তার ভূমিদাসদের মুক্তি দেয়নি?
কিন্তু সেসব কিছুর পরিবর্তে–আজ সে কি হয়েছে? এক অবিশ্বাসিনী স্ত্রীর ধনী স্বামী, জনৈক অবসরপ্রাপ্ত ভদ্রলোক, পানে ও ভোজনে বিলাসী, মস্কো ইংলিশ ক্লাবের একজন সদস্য এবং মস্কো সমাজের একজন সর্বজনপ্রিয় মানুষ। সাত বছর আগে যেধরনের মানুষকে সে এত ঘৃণা করত আজ যে সে নিজেই মস্কোর সেই অবসরপ্রাপ্ত ভদ্রজনদের একজন হয়েছে এ-সত্যটাকে সে অনেকদিন পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি।
কখনো কখনো এই বলে সে নিজেকে সান্তনা দিত যে মাত্র সাময়িকভাবেই সে এ জীবন কাটাচ্ছে, কিন্তু তার পরেই যখন তার মনে পড়ে যেত যে তারই মতো আরো যারা এই জীবনযাত্রার পথে ও ইংলিশ ক্লাবে সাময়িকভাবে ঢুকেছিল সবগুলো দাঁত ও চুল নিয়ে, তারাই যখন এখান থেকে বিদায় নিয়েছে তখন কারো না ছিল একটা দাঁত, আর না ছিল একগুলি চুল।
যাই হোক, এ নিয়ে গম্ভীর হতাশা, বিষণ্ণতাবোধ ও জীবনবিতৃষ্ণায় না ভুগলেও আত্ম-অনুসন্ধিৎসার কতকগুলো প্রশ্ন নিয়তই তাকে বিব্রত করে। কিসের জন্য? কেন? এ পৃথিবীতে কি সব চলছে? দিনের মধ্যে অনেকবারই সে নিজেকে এই প্রশ্নগুলি করে এবং জীবনের তাৎপর্য নিয়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করতে থাকে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে যখন বুঝতে পারে যে এসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যাবে না, তখনই সেসব চিন্তাভাবনা ছেড়ে একটা বই নিয়ে বসে, অথবা ক্লাবের দিকে পা চালিয়ে দেয়, অথবা শহরের নানা গুজব নিয়ে অ্যাপলোন নিকলায়েভিচের সঙ্গে আলোচনা করতে বসে।
সে সবরকম সমাজে যাতায়াত করে, প্রচুর মদ খায়, ছবি কেনে, বাড়ি তৈরি করে এবং সবসময় পড়ে।
সে পড়ে, যা হাতে আসে তাই পড়ে। বাড়ি ফিরলে খানসামারা যখন তার পোশাক খুলতে থাকে তখনো সে একটা বই হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে। পড়া শেষ করে ঘুমতে যায়, ঘুম থেকে উঠে ক্লাব-ঘরের গল্প গুজবে মেতে ওঠে, গাল-গল্প শেষ করে মদ ও মেয়েমানুষ নিয়ে মেতে ওঠে, তারপর আবার মদ থেকে গাল গল্প, পড়া। মদ্যপান ক্রমেই তার পক্ষে দৈহিক ও নৈতিক প্রয়োজন হয়ে উঠল। ডাক্তাররা যত সাবধান করছে, ততই তার মদ খাওয়া বাড়ছে।
সকালে যতক্ষণ পর্যন্ত পেটে কিছু পড়ে না ততক্ষণই পুরনো প্রশ্নগুলিকে মীমাংসার অতীত ও ভয়ংকর বলে মনে হয়, তখন পিয়ের তাড়াতাড়ি একটা বই টেনে নেয়, আর তখন কেউ দেখা করতে এলে খুশি হয়।
কখনো তার মনে পড়ে, কোথায় যেন শুনেছে যুদ্ধরত সৈন্যরা যখন শত্রুর গোলাবর্ষণের মুখে ট্রেঞ্চে আটকা পড়ে তখন কোনো কিছু করার না থাকলে সেই বিপদকে সহ্য করতে একটা কাজ খুঁজে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। পিয়েরের মনে হয় সব মানুষই সেই সৈন্যদের মতে, জীবন থেকে সরে এসে একটা আশ্রয় খোঁজে : কেউ উচ্চাকাঙ্ক্ষায়, কেউ তাস খেলায়, কেউ আইন প্রণয়নে, কেউ মেয়েমানুষ, কেউ খেলায়, কেউ ঘোড়ায়, কেউ রাজনীতিতে, কেউ খেলাধুলায়, কেউ মদে, আর কেউ সরকারি কাজকর্মে। পিয়ের মনে করে, কিছুই তুচ্ছ নয়, কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়, সব সমান–শুধু যথাসম্ভব আত্মরক্ষা করে চলা। শুধু জীবনকে, সেই ভয়ংকর জীবনকে না দেখা!
.
অধ্যায়-২
শীতের গোড়াতেই প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কি ও তার মেয়ে মস্কোতে এল। সেসময়ে সম্রাট আলেক্সান্দারের রাজত্বের প্রতি উৎসাহে ভাটা পড়েছে, চারদিকে ফরাসিবিরোধী দেশপ্রেমের হাওয়া বইছে, তার সঙ্গে তার অতীত ইতিহাস, বুদ্ধির প্রখরতা ও মৌলিকতা মিলিয়ে প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কি মস্কোতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সকলের বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র এবং সরকারবিরোধী মস্কোপন্থীদের কেন্দ্রমণি হয়ে উঠল।
এক বছরেই প্রিন্স অনেক বুড়ো হয়ে গেছে। যখন-তখন ঘুমিয়ে পড়া, সাম্প্রতিক ঘটনাকে ভুলে যাওয়া ও দূর অতীতের ঘটনাকে মনে রাখা, এবং শিশুসুলভ গর্বের সঙ্গে মস্কোর সরকারবিরোধী দলের প্রধানের ভূমিকা গ্রহণ করা প্রভৃতি বার্ধক্যের সব লক্ষণই তার মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বৃদ্ধ লোকটি সকলেরই সশ্রদ্ধ অনুরাগের পাত্র হয়ে উঠল। বড় বড় আয়না, প্রাকবিপ্লব যুগের আসবাবপত্র ও সুসজ্জিত পরিচারকদলসহ এই সেকেলে প্রকাণ্ড বাড়ি, এবং মনোরমা কন্যা ও শ্রদ্ধাশীলা সুন্দরী ফরাসি নারীপরিবৃত এই কঠোরদর্শন তীক্ষ্ণবুদ্ধি বৃদ্ধ ভদ্রলোক (সে নিজেও বিগত শতাব্দীর এক ধ্বংসস্তূপ) সকলের চোখেই একটি মহৎ ও প্রীতিপ্রদ দর্শনীয় বস্তু হয়ে দেখা দিল। অতিথিরা একবারও ভাবত না, যে দু-ঘন্টা কাল মাত্র তারা এই গৃহস্বামীটিকে দেখতে পেত, তার বাইরেও প্রতিদিন বাইশটি ঘণ্টা এ বাড়িতে আরো একটি ঘনিষ্ঠ পারিবারিক জীবনধারা বয়ে চলে।
