.
রেজিমেন্টে নিজের ব্যাপারটা ঠিকঠাক করে নিয়ে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করবে এবং বাড়ি ফিরে সোনিয়াকে বিয়ে করবে–এই দৃঢ়সংকল্প নিয়ে বাবা-মার সঙ্গে মতান্তরের জন্য দুঃখিত ও গম্ভীর চিত্তে নিকলাস জানুয়ারির গোড়ার দিকেই রেজিমেন্টে যোগ দিতে চলে গেল।
নিকলাস চলে যাবার পর থেকে রস্ত পরিবারের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে উঠল, মানসিক উত্তেজনার ফলে কাউন্টেস অসুস্থ হয়ে পড়ল।
নিকলাসের বিরহে সোনিয়ার মনে সুখ নেই, তার উপরে কাউন্টেসের গলার স্বর তার ব্যাপারে মোটেই নরম হয়নি। বিষয়সম্পত্তির ব্যাপার নিয়ে কাউন্ট আগের থেকেও বেশি বিচলিত হয়ে পড়েছে, যাহোক একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। মস্কোর নিকটবর্তী শহরের বাড়ি ও সম্পত্তি বেচে দেওয়া অনিবার্য হয়ে উঠেছে, আর সেজন্য তাদের মস্কো যেতেই হবে। কিন্তু কাউন্টেসের স্বাস্থ্যের জন্য দিনের পর দিন তাদের যাত্রা পিছিয়ে যেতে লাগল।
প্রথম দিকে বাগদত্তা স্বামীর বিরহকে নাতাশা কিছুটা হাল্কাভাবে হাসিমুখেই মেনে নিয়েছিল, কিন্তু যত দিন যাচ্ছে ততই সে উত্তেজিত ও অধৈর্য হয়ে উঠছে। জীবনের যে শ্রেষ্ঠ দিনগুলিকে সে স্বামীর ভালোবাসায় কাটিয়ে দিতে পারত, বৃথাই তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে-এই চিন্তাই তাকে অহরহ যন্ত্রণা দিচ্ছে। তার চিঠি পেলেও নাতাশা বিরক্ত হয়ে ওঠে। একথা ভাবতেও তার কষ্ট হয় যে সে যখন স্বামীর চিন্তাকে সম্বল করেই বেঁচে আছে তখন তার স্বামী সত্যিকারের জীবন কাটাচ্ছে, নতুন নতুন জায়গা দেখছে, নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে মিশছে। চিঠিগুলি যত বেশি মজাদার হয় ততই সে অধিকতর বিরক্তি বোধ করে। স্বামীর চিঠি তাকে সান্ত্বনা তো দেয়ই না, পরন্তু সেগুলিকে তার মনে হয় ক্লান্তিকর ও কৃত্রিম এক দায়ভাগ। সে চিঠিপত্রও লিখতে পারে না, কারণ কথায়, হাসিতে ও চাউনিতে যা সে প্রকাশ করতে পারে তার হাজার ভাগের একভাগও চিঠিতে প্রকাশ করার কথা সে কল্পনাই করতে পারে না। সে তাকে লেখে একঘেয়ে, শুকনো, প্রথামাফিক চিঠি, সে চিঠির উপর সে নিজেই কোনো গুরুত্ব দেয় না, তার চিঠির খসড়াতে যেসব বানান ভুল থাকে কাউন্টেসই সেগুলো শুধরে দেয়।
কাউন্টেসের স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতিই হল না, অথচ মস্কো যাত্রা আর পিছিয়ে দেওয়া চলে না। নাতাশার বিয়ের পোশাক তৈরি করতে দেওয়া হবে, বাড়িটাও বিক্রি করে দিতে হবে। তাছাড়া, বুড়ো প্রিন্স বলকনস্কি মস্কোতেই শীতকালটা কাটাচ্ছে, কাজেই প্রিন্স আন্দ্রুরও সেখানেই থাকবার কথা, নাতাশার নিশ্চিত বিশ্বাস, এর মধ্যেই সে এসে গেছে।
কাজেই কাউন্টেস দেশের বাড়িতে রয়ে গেল, আর সোনিয়া ও নাতাশাকে সঙ্গে নিয়ে জানুয়ারির শেষ দিকে কাউন্ট মস্কো চলে গেল।
০৮. বিয়ের কথা
অষ্টম পর্ব – অধ্যায়-১
নাতাশার সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রুর বিয়ের কথা পাকা হবার পরেই পিয়ের হঠাৎ যেন অকারণেই অনুভব করতে লাগল যে আগের মতো জীবনযাপন করা একেবারেই অসম্ভব। উপকারী লোকটি তার কাছে যে সত্য প্রকাশ করেছে সে সম্পর্কে তার প্রত্যয় যথেষ্ট দৃঢ়, নিজের ভিতরকার মানুষটিকে পরিপূর্ণ করে গড়ে তোলার কাজে যথেষ্ট উৎসাহের সঙ্গেই আত্মনিয়োগ করে সে সুখও পাচ্ছে–তথাপি আন্দ্রু ও নাতাশার বাগদানের পর থেকেই সে জীবনের সব রস যেন শুকিয়ে গেছে, বিশেষ করে ঠিক সেইসময়ে জোসেফ আলেক্সিভিচের মৃত্যু-সংবাদ তাকে আরো বিচলিত করে তুলেছে। এখন অবশিষ্ট রয়েছে জীবনের একটি কঙ্কাল মাত্র : নিজের বাড়ি, জনৈক বিখ্যাত ব্যক্তির প্রণয়ভাজন সুন্দরী স্ত্রী, গোটা পিটার্সবুর্গের সঙ্গে পরিচয়, আর রাজদরবারের চাকরির একঘেয়ে গতানুগতিকতা। সহসা এ জীবন পিয়েরের কাছে অপ্রত্যাশিত রকমের ঘৃণ্য মনে হতে লাগল। সে দিনপঞ্জি রাখা ছেড়ে দিল, গুরুভাইদের কাছে যাওয়া বন্ধ করল, আবার ক্লাবে যেতে শুরু করল, প্রচুর মদ খেতে লাগল এবং অবিবাহিতদের দলে ভিড়ে এমন সব কাণ্ডকারখানা শুরু করে দিল যে কাউন্টেস হেলেন তা নিয়ে কটু কথা শুনানো প্রয়োজন বোধ করল। পিয়ের বুঝল তার স্ত্রী ঠিকই বলেছে, আর তাই তার অসুবিধা না ঘটিয়ে মস্কোতে সরে পড়ল।
মস্কো পৌঁছে সে নিজেদের বিরাট বাড়িটাতে ঢুকল, ম্লান হতে স্নানতর হয়ে যাওয়া প্রিন্সেসরা সখী-দলবল নিয়ে তখনো সেখানে বাস করছে, শহরের ভিতর দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে যখন দেখতে পেল আইবেরিয় তীর্থে দেবমূর্তিগুলির সামনে অসংখ্য মোমবাতি জ্বলছে, ক্রেমলিন স্কয়ারের বরফ গাড়ির চাকায় ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে না, বা সিভৎসেভ ভ্রাঝকের (মস্কোর বস্তি-অঞ্চল) ভাঙা-চোরা বাড়িগুলো তার শান্তি বিঘ্নিত করছে না, যখন সে নতুন করে দেখল মস্কোর প্রাচীন মহিলাদের, দেখল মস্কোর বল-নাচ ও ইংলিশ ক্লাব, তখন যেন একটি নিরাপদ আশ্রয়ে এসে সে বড়ই আরাম বোধ করতে লাগল। মস্কোতে পৌঁছে সেই শান্তি ও আরাম সে পেল যা পাওয়া যায় একটা পুরনো ড্রেসিং-গাউন গায়ে জড়িয়ে, যেটা একাধারে গরম ও নোংরা।
মস্কো সমাজের বৃদ্ধা থেকে ছেলেমেয়ে পর্যন্ত সকলেই পিয়েরকে দীর্ঘপ্রত্যাশিত অতিথি হিসেবেই স্বাগত জানাল। মস্কো সমাজের পক্ষে পিয়েরই সবচাইতে সুন্দর, দয়ালু, বুদ্ধিমান, হাসিখুশি ও দিলখোলা মানুষ : প্রাচীন রুশ ভদ্রসমাজের প্রতিভূস্বরূপ। তার টাকার থলে সর্বদাই শূন্য থাকে, কারণ সেটা সকলের জন্যই খোলা।
