সবই নির্ভর করে শিক্ষাদীক্ষার উপরে, অতিথিটা মন্তব্য করল।
কাউন্টেস বলতে লাগল, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আজ পর্যন্ত আমি চেলেমেয়েদের সঙ্গে বন্ধুর মতোই ব্যবহার করেছি আর তারাও আমার উপর পুরোপুরি বিশ্বাস করেছে। এ ভুল তো সব বাবামাই করে যে ছেলেমেয়েরা তাদের কাছে কিছুই লুকোয় না। আমি জানি, আমার মেয়ের যদি কোনো গোপন কথা থাকে তো আমাকেই তা প্রথমে বলবে, আর আবেগের বশে নিকোলাস যদি কোনো ক্ষতি করে বসে (একটি ছেলের পক্ষে সেটা ঘটতেই পারে) তাহলেও সে কখনো ঐ পিটার্সবুর্গের যুবকদের মতো হবে না।
ঠিক, তারা সব চমৎকার ছেলে, চমৎকার, কাউন্টও সুরে সুর মেলাল; যখনই কোনো বিভ্রান্তিকর সমস্যা দেখা দেয় তখনই সবকিছুকে চমৎকার ভেবে নিয়ে সমস্যার সমাধান করাই তার স্বভাব। ভাব তো, ও হতে চায় হুজার। কি আর করা যাবে?
অতিথিটি বলল, আপনার মেয়েটি কিন্তু খুবই মনোরমা; একটি ছোট আগ্নেয়গিরি!
কাউন্ট বলল, হ্যাঁ, একেবারে সত্যিকারের আগ্নেয়গিরি। ঠিক আমার মতোই হয়েছে। আর কী কণ্ঠস্বর; মেয়ে হলেও সত্যি কথাই বলব-ও বড় গায়িকা হবে, দ্বিতীয় সালামনি! ওকে গান শেখাবার জন্য একজন ইতালিয় শিক্ষক রেখে দিয়েছি।
ওর কি সে বয়স হয়েছে? আমি তো শুনেছি, এত অল্প বয়সে রেওয়াজ করলে গলা খারাপ হয়ে যায়।
আহা, না, না, ততটা অল্প বয়স নয়! কাউন্ট বলল। আগে আমাদের মায়েদের তো বারো-তেরো বছরেই বিয়ে হয়ে যেত।
আর ও তো এর মধ্যেই বরিসের প্রেমে পড়ে গেছে। ভাবুন তো! বরিসের মায়ের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসির সঙ্গে কাউন্টেস বলল। তারপর মনের কথাটা খুলেই বলে ফেলল : এখন যদি আমরা খুব কড়া হই, ওদের বাধা দেই…তাহলে ওরা লুকিয়ে কি কাণ্ড করে বসবে তা কে জানে (কাউন্টেসের বক্তব্য যে ওরা চুমো খাবে), কিন্তু ব্যাপার যা চলেছে তাতে মেয়ের সব কথাই আমি জানতে পারি। সন্ধ্যাবেলা ও নিজে থেকেই আমার কাছে ছুটে আসবে আর সব কথা খুলে বলবে। হয়তো আমি ওকে আস্কারা দিচ্ছি, কিন্তু আমার কাছে তো এটাই সেরা পথ বলে মনে হয়। ওর দিদির বেলায় আমি আরো কড়া ছিলাম।
সুন্দরী বড় মেয়ে কাউন্টেস ভেরা হেসে বলল, হ্যাঁ, আমাকে অন্যভাবে মানুষ করা হয়েছিল।
হাসিতে সাধারণত সৌন্দর্য বাড়ে, কিন্তু ভেরার বেলায় তা হল না; বরং একটা অস্বাভাবিক, অপ্রীতিকর ভাব ফুটে উঠল তার মুখে। ভেরা সুদর্শনা, মোটেই বোকা নয়, বেশ বুদ্ধি আছে, ভালো লেখাপড়া শিখেছে, গলাটা মিষ্টি; সে যা বলেছে তাও সত্যি ও সঙ্গত; অথচ কী আশ্চর্য, উপস্থিত সকলেই–অতিথি ও কাউন্টেস পর্যন্ত এমনভাবে ভেরার দিকে তাকাল যে তার কথায় তারা অবাক হয়েছে, বিচলিত বোধ করেছে।
অতিথিটি বলল, প্রথম মেয়েদের বেলায় সকলেই একটু বেশি সতর্ক হয়ে থাকে; তাদের কিছুটা অসাধারণ করে গড়ে তুলতে চায়।
কাউন্ট বলল, সে কথা অস্বীকার করে লাভ কি গো? আমাদের কাউন্টেসও তত ভেরার বেলায় একটু বেশি মাত্রায়ই সতর্ক হয়েছিল। আরে, তাতে কি হয়েছে? সে তো চমৎকার উৎরে গেছে। সে ভেরার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল।
অতিথিরা উঠে দাঁড়িয়ে বিদায় নিল; কথা দিয়ে গেল আহারের সময় আসবে।
কী ভদ্রতা! আমি তো ভেবেছিলাম ওরা কোনো দিনই উঠবে না এখান থেকে, অতিথিরা চলে গেলে কাউন্টেস বলল।
বলায় সকলেই অবাক হয়েছে, বিচলিতঅতিথি ও কাউন্টেস
*
অধ্যায়-১৩
বসার ঘর থেকে বেরিয়ে নাতাশা সবজিঘর পর্যন্ত গিয়েই থেমে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে বসার ঘরে কথাবার্তা শুনতে শুনতে সে বরিসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ক্রমেই সে অধৈর্য হয়ে উঠল, পা ঠুকতে লাগল, বরিস না এলে বুঝি কেঁদেই ফেলবে; এমন সময় তার সতর্ক পায়ের শব্দ কানে এল; না দ্রুত, না ধীরে সে আসছে। নাতাশা তাড়াতাড়ি ফুলের টবগুলোর ভিতরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল।
বরিস ঘরের মাঝখানে এসে থামল, চারদিকে তাকাল, পোশাক থেকে একটু ধুলো ঝাড়ল, তারপর আয়নার কাছে গিয়ে নিজের সুন্দর মুখখানি দেখতে লাগল। সে কী করে দেখার জন্য নাতাশা লুকিয়ে থেকেই সবকিছু দেখতে লাগল। বরিস কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়াল, একটু হাসল, তারপর অপর দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল। নাতাশা তাকে ডাকতে গিয়েও মনের ইচ্ছাটা পাল্টে ফেলল। ভাবল, ওই আমাকে খুঁজে বের করুক। বরিস বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই সোনিয়া এসে হাজির হল। তার মুখ লাল, চোখে পানি, মুখে রাগ-রাগ অস্পষ্ট কথা। প্রথমেই তার কাছে ছুটে যাবার যে ইচ্ছাটা নাতাশার মনে এসেছিল সেটাকে চেপে রেখে সে লুকিয়েই রইল, বাইরে কি ঘটছে তাই দেখতে লাগল। একটা অদ্ভুত নতুন অভিজ্ঞতা তার হচ্ছে। আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে সোনিয়া বসবার ঘরের দরজার দিকেই তাকিয়ে আছে। দরজা খুলে নিকোলাস ঘরে ঢুকল।
সোনিয়ার কাছে ছুটে গিয়ে বলল, সোনিয়া, তোমার কি হয়েছে? তুমি কেমন করে পারলে?
কিছু হয় নি, কিছু হয় নি; আমাকে একলা থাকতে দাও! সোনিয়া ফুঁপিয়ে উঠল।
আঃ, আমি জানি কি হয়েছে।
বেশ তো, জান তো ভালোই, তার কাছেই ফিরে যাও।
সো-নি-য়া! এদিকে তাকাও! বাজে কথা কল্পনা করে কেন তুমি এভাবে আমাকে কষ্ট দিচ্ছ, আর নিজেও কষ্ট পাচ্ছ? তার হাত ধরে নিকোলাস বলল।
সোনিয়া হাতটা সরাল না; তার কান্নাও থেমে গেল। নাতাশা একেবারে চুপ। বুঝি তার নিঃশ্বাসও পড়ছে না। জ্বলজ্বলে চোখ মেলে লুকিয়ে থেকেই সবকিছু দেখতে লাগল। ভাবতে লাগল, এখন কি ঘটবে?
