তারপর সোনিয়া… ?
তারপর কি যে দেখলাম বুঝতেই পারলাম না, কিছু নীল, লাল…
সোনিয়া! সে কবে ফিরে আসবে? কবে তাকে দেখতে পাব? হে ঈশ্বর, তাকে নিয়ে আমাকে নিয়ে, সবকিছু নিয়েই যে আমার ভয়ের অন্ত নেই!…. নাতাশা বলতে লাগল, সোনিয়ার সান্ত্বনার কথার কোনো জবাব না দিয়ে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল, মোমবাতিটা নিভিয়ে দেবার পরেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত চুপচাপ শুয়ে থেকে তুষার-ঢাকা জানালার কাঁচের ভিতর দিয়ে চাঁদের আলোর দিকে খোলা চোখে তাকিয়ে রইল।
.
অধ্যায়-১৩
বড়দিনের ছুটির কিছুদিন পরেই সোনিয়ার প্রতি তার ভালোবাসা এবং তাকে বিয়ে করার দৃঢ়সংকল্পের কথা নিকলাস মাকে জানাল। কাউন্টেস অনেকদিন ধরেই তাদের ব্যাপার লক্ষ্য করেছে এবং এইরকম একটা ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করেই ছিল, সে ছেলেকে জানিয়ে দিল, যাকে খুশি সে বিয়ে করতে পারে, তবে সে নিজে বা নিকলাসের বাবা এ বিয়েতে আশীর্বাদ জানাবে না। প্রথমে নিকলাসের মনে হল মা তার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছে এবং তাকে যত ভালোই বাসুক কিছুতেই নিজের মত পাল্টাবে না। অত্যন্ত নির্বিকারভাবে ছেলের দিকে একবারও না তাকিয়ে সে স্বামীকে ডেকে পাঠাল এবং স্বামী এলে ছেলের সামনেই সবকথা তাকে সংক্ষেপে বলতে চেষ্টা করল, কিন্তু নিজেকে সংযত রাখতে না পেলে বিরক্তিতে কেঁদে ফেলে ঘর থেকে চলে গেল। বুড়ো কাউন্ট নিকলাসকে বকুনি দিয়ে এই সংকল্প ত্যাগ করতে বলল। নিকলাস জবাবে জানাল, সে কথার খেলাপ করতে পারবে না, তখন বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল, তারপর কাউন্টেসের কাছে চলে গেল। ছেলের সঙ্গে যখনই কোনো বাদ-বিসম্বাদ দেখা দেয় তখনই বুড়ো কাউন্ট নিজের দোষ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, কারণ তার হাতেই তো পারিবারিক সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে, কাজেই একটি ধনী কন্যাকে বিয়ে না করে ছেলে যদি যৌতুকহীনা সোনিয়াকে পছন্দ করে তো সেজন্য তার প্রতি সে রাগ করতে পারে না। এক্ষেত্রে তো কাউন্ট আরো বেশি সচেতন যে তার বৈষয়িক অবস্থায় এই গোলযোগ দেখা না দিলে নিকলাসের জন্য সোনিয়ার চাইতে ভালো মেয়ের কথা তো তারা ভাবতই না, আর পরিবারের অর্থনৈতিক দুর্গতির জন্য তো সে নিজেই দোষী।
বাবা-মা কেউই আর এ নিয়ে ছেলের সঙ্গে কোনো কথা বলল না, কিন্তু কয়েকদিন পরেই কাউন্টেস সোনিয়াকে ডেকে পাঠাল এবং অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে এই বলে তাকে বকতে লাগল যে সোনিয়াই নিকলাসকে ধরবার জন্য জাল পেতেছে, পরিবারের প্রতি সে অকৃতজ্ঞ। সোনিয়া নীরবে আনত চোখে কাউন্টেসের নিষ্ঠুর কথাগুলি শুনল, কিন্তু সে যে কি করবে তা বুঝে উঠতে পারল না। যারা তার উপকার করেছে তাদের জন্য সবকিছু ছাড়তে সে প্রস্তুত। আত্মত্যাগই তো তার চিরদিনের আদর্শ, কিন্তু এক্ষেত্রে সে বুঝতে পারছে না কি ত্যাগ করবে, কার জন্য ত্যাগ করবে। কাউন্টেসকে, গোটা রস্ত পরিবারকে সে ভালো না বেসে পারে না, আবার নিকলাসকে ভালো না বেসেও তো তার উপায় নেই, সে তো জানে এই ভালোবাসার উপরেই নির্ভর করছে নিকলাসের সব সুখ। বিষণ্ণ চিত্তে সে চুপ করে রইল, কথা বলল না। এই অসহ্য অবস্থার একটা বোঝাঁপড়া করতে নিকলাস মার সঙ্গে দেখা করতে গেল। প্রথমে তাকে ও সোনিয়াকে ক্ষমা করে এ বিয়েতে সম্মতি জানাতে অনুরোধ করল, তারপর ভয় দেখিয়ে বলল, মা যদি সোনিয়ার উপর অত্যাচার করে তাহলে সে এক্ষুণি গোপনে সানিয়াকে বিয়ে করবে।
কাউন্টেস নির্বিকার গলায় বলল, তার বয়স হয়েছে, প্রিন্স আন্দ্রু যেমন বাবার মত ছাড়াই বিয়ে করছে তেমনই সেও তাই করতে পারে, কিন্তু কাউন্টেস কখনো সেই ষড়যন্ত্রকারিণীকে মেয়ে বলে গ্রহণ করবে না।
ষড়যন্ত্রকারিণী কথাটা শুনেই নিকলাস রাগে ফেটে পড়ল, গলা চড়িয়ে বলল, সে কখনো ভাবতে পারেনি যে মা তাকে ভালোবাসা বিক্রি করতে বাধ্য করবে, আর তাই যদি হয় তাহলে এই শেষবারের মতো সে বলে দিচ্ছে..কিন্তু তার মুখের যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মা সভয়ে অপেক্ষা করতে লাগল, যার স্মৃতি চিরদিনের মতো দুই জনের কাছেই এক নিষ্ঠুর স্মৃতি হয়ে থাকত, সেকথা বলার সময় তার হল না। সময় হল না তার কারণ বিবর্ণ কঠিন মুখে নাতাশা ঘরে ঢুকল। দরজায় দাঁড়িয়ে সে সবই শুনেছে।
নিকলাস, তুমি বাজে বক! শান্ত হও, শান্ত হও, আমি বলছি শান্ত হও!… নিকলাসের গলা ছাপিয়ে নাতাশা আর্তকণ্ঠে বলে উঠল।
মাকে বলল, মামণি, লক্ষ্মীটি, ব্যাপারটা মোটেই সেরকম নয়…মিষ্টি মামণি আমার। মা বুঝতে পারছিল যে তারা বিচ্ছেদের একেবারে তীরে এসে দাঁড়িয়েছে, তাই সভয়ে সে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ মনে মনে সেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে কিছুতেই হার মানবে না।
নাতাশা বলল, নিকলাস, পরে সব তোমাকে বুঝিয়ে বলব। এখন চলে যাও! শোন মামণি সোনা।
নাতাশার কথাগুলি অসংলগ্ন হলেও তার উদ্দেশ্য সফল হল।
ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কাউন্টেস মেয়ের বুকে মুখ লুকাল, আর নিকলাস মাথাটা চেপে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নাতাশা একটা মিটমাটের চেষ্টায় লেগে গেল এবং এতটা পর্যন্ত করতে পারল যে, মা নিকলাসকে কথা দিল সোনিয়ার উপর কোনোরকম অত্যাচার করা হবে না, আর নিকলাসও কথা দিল যে বাবা-মার অজ্ঞাতসারে সে কিছু করবে না।
