মাঝে মাঝেই জিজ্ঞাসা করতে লাগল, সোনিয়া, তুমি ভালো আছ?
হ্যাঁ; আর তুমি? সোনিয়া শুধাল।
বাড়ির অর্ধেক পথে পৌঁছে লাগামটা কোচয়ানের হাতে দিয়ে নিকলাস একমুহূর্তের জন্য ছুটে গিয়ে নাতাশার স্লেজের পাশে দাঁড়াল। ফরাসিতে ফিসফিস করে বলল, নাতাশা! তুমি কি জান যে সোনিয়ার ব্যাপারে আমি মনস্থির করে ফেলেছি!
আনন্দে উল্লসিত হয়ে নাতাশা জানতে চাইল, ওকে বলেছ কি?
আঃ, ওই গোঁফ ও ভুরুতে তোমাকে কিরকম অদ্ভুত দেখাচ্ছে!…নাতাশা-তুমি খুশি হয়েছ?
খুব, খুব খুশি হয়েছি! তোমাকে নিয়ে আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তোমাকে বলিনি, কিন্তু ওর সঙ্গে তুমি খারাপ ব্যবহার করছিলে। নিকলাস, কী অন্তর ওর! সোনিয়া সুখী নয়, অথচ আমি সুখী, এতে মাঝে মাঝে আমি খুব লজ্জা বোধ করতাম। এখন আমি কত খুশি হলাম! যাও, ওর কাছে ছুটে যাও।
না, একটু সবুর কর…আঃ, তোমাকে কী মজার দেখাচ্ছে! নিকলাস চেঁচিয়ে বলল; বোনের মুখে আজ সে এমনকিছু নতুন, অস্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় দেখতে পেয়েছে যা আগে কখনো দেখেনি। নাতাশা, এ যে যাদুর খেলা, তাই নয়?
নাতাশা জবাব দিল, হ্যাঁ। তুমি চমৎকার খেলা দেখিয়েছ।
নিকলাস ভাবল, এই মূর্তিতে ওকে যদি আগে দেখতে পেতাম তাহলে অনেক আগেই ওকে জিজ্ঞাসা করতাম আমার কি করা উচিত, আর ও যা বলত আমি তাই করতাম, তাতে সকলেরই ভালো হত।
তাহলে তুমি খুশি হয়েছ? আমি ঠিক কাজই করেছি?
এক্কেবারে ঠিক! কিছুদিন আগে এ নিয়ে মামণির সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছিল। মামণি বলেছিল, ও তোমাকে খেলাচ্ছে। মামণি যে কেমন করে একথা বলতে পারল! আমি তো মামণির উপর রাগে একেবারে ফেটে পড়েছিলাম। সোনিয়ার সম্পর্কে কেউ খারাপ কিছু বললে আমি তা সহ্য করব না, কারণ ওর মধ্যে খারাপ কিছুই নেই।
তাহলে তো সব ঠিকই হয়েছে। এই বলে সে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল। তার পায়ের নিচে বরফ মচমচ করে উঠল। একদৌড়ে স্লেজে গিয়ে উঠল। সির্কাসিয় যুবকটি গোঁফ নাচিয়ে তেমনই হাসছে; ওড়নার নিচ থেকে চোখ দুটো তেমনই জ্বলছে; ঐ সির্কাসিয় যুবকই তো সোনিয়া, আর ওই সোনিয়াই তো তার সুখী ও প্রেমিময়ী ভাবী স্ত্রী। বাড়িতে পৌঁছে মেলিয়ুকভদের বাড়িতে কিরকম কাটিয়েছে সেকথা মাকে বলে মেয়েরা তাদের শোবার ঘরে চলে গেল। পোশাক খুলল, কিন্তু কর্কের গোঁফ তখনই ধুয়ে ফেলল না; বসে বসে অনেকক্ষণ ধরে নিজেদের সুখের কথাই বলতে লাগল। বিয়ের পরে তারা কিভাবে চলবে, তাদের স্বামীদের মধ্যে কিরকম বন্ধুত্ব হবে, তারা কত সুখী হবে-তাই নিয়েই যত কথা। নাতাশার টেবিলে দুটো আয়না রাখা ছিল; দুনিয়াশা আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল।
আয়নার কাছে যেতে যেতে নাতাশা বলল, সেদিন যে কবে আসবে? আমার তো ভয় হয় কোনোদিন আসবে না…এত ভালো কি সইবে!
বসে পড় নাতাশা; হয় তো তাকেই দেখতে পাবে, সোনিয়া বলল।
আয়নার প্রত্যেক দিকে একটা করে মোমবাতি জ্বালিয়ে নাতাশা সেটার সামনে বসল।
নিজের মুখটা দেখতে পেয়ে বলল, আমি তো গোঁফওয়ালা একজনকে দেখছি।
দুনিয়াশা বলল, হেসো না মিস।
অনেকরকম করে তাকিয়েও কিছু না দেখতে পেয়ে নাতাশা চোখ মিট মিট করে আয়নার কাছ থেকে সরে গেল।
বলল, অন্যরা দেখতে পায়, অথচ আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন? তুমি বস সোনিয়া। আজ রাতে তোমাকে বসতেই হবে! অন্তত আমার খাতিরে….আজ আমার বড় ভয় করছে!
সোনিয়া আয়নার সামনে গিয়ে বসল; ঠিক জায়গামতো বসে তাকাতে লাগল।
দুনিয়াশা ফিসফিসিয়ে বলল, এবার মিস সোনিয়া নিশ্চয় কিছু দেখতে পাবে। আর তুমি তো খালি হাসতেই পার।
সোনিয়া এ কথাটা শুনতে পেল। নাতাশার ফিসফিস কথাও তার কানে এল :
আমি জানি সে দেখতে পাবে। গতবছরও সে কিছু দেখেছিল।
প্রায় তিন মিনিট সকলেই চুপচাপ।
ও নিশ্চয় দেখতে পাবে! নাতাশা ফিসফিস করে বলল, কিন্তু কথা শেষ করতে পারল না… সহসা হাতের আয়নাটা সরিয়ে রেখে সোনিয়া দুই হাতে চোখ ঢেকে ফেলল।
ওঃ নাতাশা! সে কেঁদে ফেলল।
আয়নাটা তুলে নিয়ে নাতাশা বলে উঠল, দেখতে পেয়েছ? দেখতে পেয়েছ? কি দেখলে?
সোনিয়া কিছুই দেখতে পায়নি। সেও চোখ মিটমিট করতে চাইল, কিন্তু দুনিয়াশা বা নাতাশা কাউকেই সে হতাশ করতে চায়নি, অথচ এভাবে চুপচাপ বসে থাকাও শক্ত। চোখ দুটো ঢাকবার সময় কেন যে সে চেঁচিয়ে ওঠেনি তা সে নিজেই জানে না।
তার হাতটা চেপে ধরে নাতাশা শুধাল, তাকে দেখেছ
হ্যাঁ, একটু সবুর কর…আমি…তাকে দেখেছি, সোনিয়া কথাটা না বলে পারল না, যদিও তাকে বলতে নাতাশা কাকে বুঝিয়েছে-নিকলাসকে, না প্রিন্স আন্দ্রুকে-তাও সে এখনো জানে না।
কিন্তু কেন আমি বলব না যে কিছু দেখেছি। অন্যরা তো দেখতে পায়! তাছাড়া, আমি কিছু দেখেছি কি দেখিনি তাই বা কে বলতে পারে? এই সব কথাই সোনিয়ার মনের সামনে ভাসতে লাগল।
হ্যাঁ, আমি তাকে দেখেছি, সোনিয়া বলল।
কেমন দেখলে? বসা, না শোয়া?
না, আমি দেখলাম…প্রথমে কিছুই দেখতে পেলাম না, তারপর দেখলাম সে শুয়ে আছে।
আন্দ্রু শুয়ে আছে? সে কি অসুস্থ? ভয়ার্ত দুটি চোখ বন্ধুর মুখের উপর রেখে নাতাশা শুধাল।
না, না, ঠিক উল্টো, ঠিক উল্টো! তার মুখটা প্রফুল্ল, আমার দিকে ফিরে তাকাল।কথাগুলো বলতে গিয়ে তার কেমন যেন মনে হল সে যা বলছে সত্যি সত্যি তাই দেখেছে।
