দাসী বলতে লাগল, একবার এক তরুণী বাইরে গিয়ে একটা মোরগ ধরে এনে দুজনের মতো একটা টেবিল পেতে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ বসে থাকার পরে হঠাৎ সে শুনতে পেল কে যেন আসছে…ঘণ্টার শব্দ করতে করতে একটা স্লেজ এসে দাঁড়াল; একজনের পায়ের শব্দ শুনতে পেল। ঠিক পুরুষের আকৃতিতে, ঠিক একজন অফিসারের মতো সে ভিতরে এল-ভিতরে এসে টেবিলে বসল।
ভয়ে চোখ গোল-গোল করে নাতাশ চেঁচিয়ে উঠল, আ! আ!
সত্যি? কেমন করে…সে কি কথা বলল?
হ্যাঁ, ঠিক মানুষের মতো। সব ঠিকঠাক চলতে লাগল; লোকটি তাকে প্রভাবিত করতে লাগল; তরুণীটির উচিত ছিল মোরগ ডাকা পর্যন্ত লোকটিকে দিয়ে কথা বলানো, কিন্তু সে ভয় পেয়ে গেল, ভয় পেয়ে দুই হাতে মুখ ঢাকল। আর তখনি সে তরুণীটিকে জড়িয়ে ধরল। ভাগ্য ভালো ঠিক সেই সময় দাসীরা সব ছুটে এল…
পেলাগেয়া দানিলভনা বলল, কেন ওদের ভয় দেখাচ্ছে?
মেয়ে বলল, মামণি, তুমিও তো ভাগ্য জানবার চেষ্টা করেছ… ।
সোনিয়া শুধাল, আচ্ছা, গোলাবাড়িতে এ কাজটা কিভাবে করা হয়?
এই ধর না, তুমি গোলাবাড়িতে গিয়ে কান পাতলে। তুমি কি শুনতে পাও তার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে; হাতুড়ির শব্দ ও দরজার ধাক্কার শব্দ যদি শোন-সেটা খারাপ; ফসল চালার শব্দ শোনাটা ভালো; অনেকসময় তাও শোনা যায়।
মামণি, গোলাবাড়িতে তোমার কি ঘটেছিল আমাদের বল।
পেলাগেয়া দানিলভনা হাসল।
আরে, সেসব ভুলেই গেছি।…কিন্তু তোমরা কেউ সেখানে যাবে না তো?
হ্যাঁ, আমি যাব পেলাগেয়া দানিলনা। আমাকে যেতে দিন। আমি যাব। সোনিয়া বলল।
বেশ তো, তুমি যদি ভয় না পাও…
লুইসা আইভানভনা, আমিও যেতে পারি কি? সোনিয়া শুধাল।
খেলা-ধূলা যখন যাই চলতে থাকুক, নিকলাস কিন্তু সোনিয়ার সঙ্গ ছাড়ল না; একটা নতুন চোখে তাকে দেখতে লাগল। তার মনে হল, পোড়া কর্কের গোঁফকে ধন্যবাদ, এই প্রথম সে সোনিয়াকে পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে। সত্যি, সেদিন সন্ধ্যায় সোনিয়াকে যত উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও সুন্দরী, দেখাচ্ছিল তেমনটি নিকলাস আগে কখনো দেখেনি।
সোনিয়ার চোখ দুটি ঝলমল করছে, গোঁফের নিচে ঠোঁট দুটির উচ্ছ্বসিত হাসির ফলে দুই গালে টোল পড়েছে; এমন হাসি সে আগে কখনো দেখেনি। তার দিকে তাকিয়ে নিকলাস ভাবল, এই তো তার আসল রূপ; এতদিন আমি কী বোকাই ছিলাম!
সোনিয়া বলল, আমি কোনো কিছুতেই ভয় পাই না। আমি কি এখনই যেতে পারি? সে উঠে দাঁড়াল।
তারা বলে দিল, গোলাবাড়িটা কোথায়, কেমন করে তাকে কান পেতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এবং একটা লোমের জোব্বা তার হাতে তুলে দিল। জোব্বাটা মাথা ও কাঁধের উপর ফেলে সে নিকলাসের দিকে তাকাল।
নিকলাস ভাবল, আহা, মেয়েটি কত আপন! অথচ আজ পর্যন্ত আমি কী ধারণা নিয়েই না ছিলাম?
গোলাবাড়িতে যাবার জন্য সোনিয়া বারান্দায় গেল। নিকলাসও তাড়াতাড়ি সামনের ফটকে চলে গেল; বলল, ঘরের মধ্যে বড়ই গরম লাগছে। ভিড়ের জন্য ঘরটা সত্যি গুমোট হয়ে উঠেছে।
বাইরে সেই একই শান্ত নিস্তব্ধতা, সেই একই চাঁদ, বুঝি বা আগের চাইতে উজ্জ্বলতর। আলো এত বেশি এবং তারার আলো পড়ে বরফ এত বেশি ঝিকমিক করছে যে আকাশের দিকে তাকাতে কারো ইচ্ছা করছে না; সত্যিকারের তারাগুলো কারো চোখে পড়ছে না। আকাশ কালো ও বিষণ্ণ, অথচ পৃথিবী আনন্দময়।
আমি বোকা! বোকা! কিসের জন্য অপেক্ষা করে আছি। নিকলাস ভাবল। ফটক থেকে বেরিয়ে একদৌড়ে বাড়িটা ঘুরে সে খিড়কির ফটকে চলে গেল। সে জানত, সোনিয়া এই পথেই যাবে।
খিড়কির ফটক থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামবার হাল্কা পায়ের শব্দ এল। একেবারে নিচের ধাপে বরফ জমেছিল; তার উপর পা পড়ে মচমচ শব্দ হল। সে শুনতে পেল বুড়ি দাসীটা বলছে, সোজা, সোজা পথ ধরে মিস। শুধু পিছন ফিরে তাকিও না।
আমি ভয় পাইনি, সোনিয়া জবাব দিল; পায়ের হাল্কা জুতোর আওয়াজ তুলে সোনিয়া নিকলাসের দিকেই এগিয়ে আসছে।
সোনিয়ার শরীর জোব্বায় ঢাকা। মাত্র দু-পা দূর থেকে সে নিকলাসকে দেখতে পেল; তারও মনে হল যে নিকলাসকে সে চিনত, যাকে সব সময়ই একটু ভয় করত, এ সে নিকলাস নয়। তার পরনে মেয়েদের পোশাক, চুলে বেণি বাধা, মুখে ঈষৎ হাসি। সোনিয়ার কাছে এ সবই নতুন। সে দ্রুত নিকলাসের দিকে এগিয়ে গেল।
চাঁদের আলো পড়েছে সোনিয়ার সারা মুখে; সে মুখ দেখে নিকলাস ভাবল, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, অথচ সেই এক। সোনিয়ার জোব্বার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে নিকলাস তাকে জড়িয়ে ধরল, কাছে টেনে নিল, তার ঠোঁটে চুমো খেল; তার গোঁফে পোড়া কর্কের গন্ধ। সোনিয়াও নিকলাসের ঠোঁট ভরে চুমো খেল, ছোট হাত দু-খানি বের করে নিকলাসের গালের উপর চেপে ধরল।
সোনিয়া!…নিকলাস!…তাদের মুখে শুধু এই দুটি নামই উচ্চারিত হল। তারা গোলাবাড়িতে ছুটে গেল, আবার ফিরে এল; একজন বাড়িতে ঢুকল সামনের ফটক দিয়ে, আর একজন ঢুকল খিড়কির ফটক দিয়ে।
.
অধ্যায়–১২
সবসময় সবকিছুর উপর নাতাশার নজর থাকে। তাই পেলাগেয়া দানিলভনার বাড়ি থেকে ফিরবার পথে ব্যবস্থা করল যে সে নিজে ও মাদাম শোস ফিরবে ডিমলারের সঙ্গে একটা স্লেজে, আর অন্য দাসীদের নিয়ে সোনিয়া ও নিকলাস ফিরবে অন্য স্লেজে।
ফিরবার সময় খুব জোরে না চালিয়ে নিকলাস ধীরেসুস্থে গাড়ি চালাতে লাগল, আর বার বার সেই সব ভুলানো আশ্চর্য আলোয় সোনিয়ার মুখের দিকে তাকাতে লাগল এবং ভুরু ও গোঁফের অন্তরালবর্তী সেই সোনিয়াকে খুঁজতে লাগল যার কাছ থেকে আর কোনো দিন সে দূরে সরে যাবে না বলে মনস্থির করে ফেলেছে। দেখতে দেখতে একসময় সে পুরনো ও নতুন দুই সোনিয়াকেই চিনতে পারল, এবং পোড়া কর্কের গন্ধে চুম্বনের পুলকানুভূতির কথা মনে পড়ায় তুষার-ভেজা বাতাসকে বুক ভরে টেনে নিল; পায়ের নিচের অপসৃয়মান মাটি ও মাথার উপরকার ঝকমকে আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল আবার সে রূপকথার দেশে ফিরে এসেছে।
