নিকলাস ভাবল, জাখার বলছে বাঁদিকে যেতে, কিন্তু বাঁদিকে কেন? আমরা কি মেলিয়ুকভদের বাড়ির কাছে এসে গেছি? এটাই কি মেলিয়ুকভকা? ঈশ্বরই জানেন আমরা কোথায় চলেছি, ঈশ্বরই জানেন আমাদের কপালে কি আছে, কিন্তু যাই হোক না কেন জায়গাটা বড় সুন্দর। মুখ ঘুরিয়ে সে স্লেজের ভিতরে চোখ ফেরাল।
সুন্দর ভুরু ও গোঁফওয়ালা অপরিচিত লোকটি বলে উঠল, দেখ, দেখ, ওর গোঁফ ও চোখের পাতা সব একেবারে সাদা হয়ে গেছে!
নিকলাস ভাবল, মনে হচ্ছে এই নাতাশা, আর উনি মাদাম শোস, কিংবা তা নাও হতে পারে; আর এই। গোঁফওয়ালা সির্কাসিয় যুবকটিকে আমি চিনি না, কিন্তু ভালোবাসি।
তোমাদের ঠাণ্ডা লাগছে না তো? সে প্রশ্ন করল।
কেউ জবাব দিল না; হাসলে লাগল। পিছনের স্লেজ থেকে ডিমলার কিছু একটা বলল–হয় তো কোনো মজার কথা–কিন্তু তারা কেউ সেকথায় মাথামুণ্ডু বুঝতে পারল না।
কয়েকজন হেসে বলে উঠল, ঠিক, ঠিক!
নিকলাস ভাবছে, এ তো দেখছি এক রূপকথার অরণ্য; কালো কালো ছায়ারা চলাফেরা করছে, হীরাগুলি ঝিকমিক করছে, শ্বেত পাথরের সিঁড়ি উঠে গেছে; রূপকথার বাড়িতে রুপোর ছাদ, আর কতরকম জন্তুর কর্কশ ডাক। আর এটা যদি সত্যি মেলিয়ুকভা হয় তাহলে তো কাহা কাহা মুল্লুক ঘুরে শেষপর্যন্ত আমরা মেলিয়ুকভাতেই পৌঁছে গেছি।
জায়গাটা সত্যি মেলিয়ুকভা; দাস-দাসীরা হাসিমুখে মোমবাতি হাতে নিয়ে ফটকে দাঁড়িয়েছে।
এরা কারা? কে একজন শুধাল।
কাউন্টের বাড়ি থেকে বহুরূপীরা এসেছে। ঘোড়া দেখেই আমি চিনতে পেরেছি, কে একজন জবাব দিল।
.
অধ্যায়-১১
পেলাগেয়া দানিলনা মেলিয়ুকভা বেশ শক্তসমর্থ কর্মক্ষম মহিলা; চোখে চশমা। একটা ঢিলে পোশাক পরে মেয়েদের নিয়ে বাইরের ঘরে বসে ছিল। মেয়েরা চুপচাপ বসে মোম গলিয়ে বরফের উপর ফোঁটা ফেলছিল এবং দেয়ালের উপর তার ছায়াগুলি দেখছিল। এমন সময় বারান্দার নবাগতদের পায়ের শব্দ ও গলার স্বর তাদের কানে এল।
অশ্বারোহী, মহিলা, ডাইনি, ভাড় ও ভালুকের দল মুখ থেকে বরফের টুকরো ঝেড়ে ফেলে গলা খাকারি দিয়ে বসার ঘরে ঢুকল। তাড়াতাড়ি সবগুলো মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হল। ভাড়-ডিমলার-একটি মহিলা–নিকলাস-সকলেই নাচতে শুরু করে দিল। ছোট ছেলেমেয়েরা চেঁচামেচি শুরু করে দিল; বহুরূপীরা মুখ ঢেকে, গলার স্বর পাল্টে ফেলে গৃহকত্রীকে অভিবাদন জানাতে জানাতে যার যার জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
কী ব্যাপার! কাউকে যে চিনতেই পারা যাচ্ছে না! আরে নাতাশা! দেখ, ওকে যেন কার মতো দেখাচ্ছে। সত্যি, ওকে দেখে আমার যেন কার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু হের ডিমলার-ইনিও ভালো সেজেছেন! আমি একে চিনি না! আর কী সুন্দর নাচছেন! আর, এ যে এক সির্কাসিয় যুবক। সত্যি, সোনিয়াকে কী সুন্দর মানিয়েছে। আর ও কে? খুব আনন্দ দিলে আমাদের। নিকিতা ও ভানিয়া-টেবিলটা পরিষ্কার করে ফেল। আরে, আমরা এত চুপচাপ কেন? হা, হা, হা!….হুজার, হুজার। ঠিক যেন একটি ছেলে। আর পা গুলি!…আমি তো তার দিকে তাকাতেই পারছি না… নানাজনে নানা মন্তব্য করতে লাগল।
যুবক মেলিয়ুকভের প্রিয়জন নাতাশা সকলকে নিয়ে পিছনের ঘরে চলে গেল। সেখানে নানারকম ড্রেসিং গাউন ও পুরুষের পোশাক আনা হল। দশ মিনিট পরে মেলিয়ুকভ পরিবারের ছেলেমেয়েরাও এসে বহুরূপীদের দলে যোগ দিল। অতিথিদের জন্য ঘরগুলো পরিষ্কার করে দেবার এবং সকলের জন্য জলযোগের ব্যবস্থা করার হুকুম দিয়ে পেলাগেয়া দানিলভনা চশমা না খুলেই বহুরূপীদের মাঝখানে ঘুরে বেড়াতে লাগল; চাপা হাসির সঙ্গে তাদের মুখের উপর তীক্ষ্ণ নজর দিয়েও তাদের কাউকেই চিনতে পারল না। শুধু যে ডিমলার ও রস্তভদের চিনতে পারল না তাই নয়, নিজের মেয়েদের এবং পরলোকগত স্বামীর ড্রেসিং-গাউন ও সামরিক পরিচ্ছদ পর্যন্ত চিনতে পারল না।
একটি মেয়ে কাজান-তাতারের সাজে সেজেছে; তার মুখের দিকে নজর করে মহিলা গভর্নেন্সকে শুধাল, এটি কে? আমার তো মনে হয় রস্তভদের বাড়ির কেউ হবে! আচ্ছা, মি. হুজার, তুমি কোন্ রেজিমেন্টে আছ? সে নাতাশাকে শুধাল। খাদ্য পরিবেশনরত খানসামাকে বলল, এখানে, এই তুর্কিকে খানিকটা ফলের জেলি দাও। ওদের আইনে ওটা নিষিদ্ধ নয়।
তারপর হাসতে হাসতে বলল, আমার ছোট সাশা! সাশাকে দেখ!
রুশ পল্লী-নৃত্য ও সমবেত নৃত্যের পরে পেলাগেয়া দানিলভনা ভূমিদাস ও দ্রজনদের একসঙ্গে গোল করে দাঁড় করিয়ে দিল : একটা চাকা, একটুকরো দড়ি ও একটা রৌপ্য রুবল আনিয়ে দেবার পরে সকলে একসঙ্গে খেলা শুরু করল।
এক ঘণ্টার মধ্যেই সাজপোশাকগুলি এলোমেলো হয়ে পড়ল, পোড়া কর্ক লাগানো ভুরু ও গোঁফ ঘামে গলে যেতে লাগল। তখন পেলাগেয়া দানিলভনা বহুরূপীদের চিনতে পারল, তাদের বহুরূপী সাজার কৌশলের প্রশংসা করল, এবং এমন সুন্দরভাবে সকলকে আনন্দ দেবার জন্য ধন্যবাদ জানাল। অতিথিদের বসার ঘরে নৈশ-ভোজে আমন্ত্রণ করা হল, আর ভূমিদাসদের খাবার দেওয়া হল নাচ-ঘরে।
খাবার সময় মেলিয়ুকভদের এক বুড়ি দাসী বলল, জনশূন্য স্নান-ঘরে কারো ভাগ্য বলে দেওয়াটা খুব ভয়ের ব্যাপার।
মেলিয়ুভকদের বড় মেয়ে শুধাল, কেন?
তোমরা যেতেই চাইবে না, খুব সাহস থাকা দরকার…
আমি যাব, সোনিয়া বলল।
মেজ মেয়ে বলল, সেই তরুণীটির কি হল তা বল!
